সর্বশেষ

যিনি পরিচিত সবচেয়ে প্রথাবিরোধী লেখক হিসেবে

হুমায়ূন আজাদ, যিনি পরিচিত সবচেয়ে প্রথাবিরোধী লেখক হিসেবে, অত্যন্ত স্পষ্টবাদী, বাদকক্ষ, অবিরল তিনি উত্তর দিতে পারেন প্রশ্নের বিব্রত না হয়ে। তিনি এক সময় ছিলেন শুধুই কবি ও পÐিত, দূরে ছিলেন জনপ্রিয়তা থেকে; ১৯৯২ সালে তাঁর বিখ্যাত বই ‘নারী’ প্রকাশের পর তিনি হয়ে ওঠেন জনপ্রিয়, এবং আধুনিক বাংলা নারীবাদের প্রধান পুরুষ; ১৯৯৫-এ সরকার নিষিদ্ধ করে ‘নারী’। যদিও নারীঘটিত ব্যাপারে তাঁর নাম শোনা যায় না, তবু তিনি নারী সম্পর্কে আমাদের শ্রেষ্ঠ তাত্তি¡ক; নারী সম্পর্কে তাঁর থেকে আর কেউ গভীর কথা বলতে পারেন না।
ফরিদ কবির : ঠিক আছে নারীদের সম্পর্কে আপনার কী ধারণাÑএ প্রশ্ন দিয়ে শুরু হোক। নারীদের সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী ?
হুমায়ূন আজাদ : বলতে পারি দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ মানবিক। জন্ম থেকেই সকলের মতো আমিও বেড়ে উঠেছি নারীর সংস্পর্শে; তারা আমার মা, বোন, বান্ধবী, সহপাঠী, অনুরাগী ও আরও নানারুপে আমার সঙ্গে জড়িত হয়েছে। নারী মানুষ, আমার মতোই একজন মানুষ, পার্থক্য শুধু লিঙ্গের। জেনক্রোমোসমের কারণে একজন মানুষ নারী হয় এবং আমি পুরুষ হয়েছি। নারীকে আমি বাল্যকাল থেকে নানারুপে দেখেছি; একটু ভিন্ন মনে হয়েছে, আমার থেকে একটু কম স্বাধীন মনে হয়েছে; ছেলেবেলায় তার কারণ বুঝতে পারি নি, এখন বুঝি। আর নারীর যে বিখ্যাত সৌন্দর্য, নারীর কথা উঠলেই পুরুষের চোখে যা ভেসে ওঠে, তাও আমার চোখে পড়ে, মুগ্ধ করে আমাকে, আমি ধারাবাহিকভাবে মুগ্ধ হয়েছি তাতে; তবে নারী শুধু সৌন্দর্য নয়, তার একটি ামাজি অবস্থান, বেশ নিম্ন অবস্থানে আছে, তাও আমার চোখে পড়ে; সারা পৃথিবীতে সমাজের নিম্ন অবস্থানে তারা রয়েছে; তাদের অধিকার অনেক কম। আমরা যে সভ্যতা সৃষ্টি করেছি, তাতে নারীদের নিম্ন অবস্থানে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে চলছি আমরা কয়েক হাজার বছর ধরে; এবং তাতে আমরা কিছুটা সমর্থও হয়েছি। তবে নারী এবং পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, শরীরের পার্থক্য ছাড়া, লৈঙ্গিক পার্থক্য ছাড়া। আমরা যে সামাজিক পার্থক্য তৈরি করেছি, তা সম্পূর্ণ বানানো।
তুষার দাশ : মানুষ হিসেবে দু’জনই সমান এই হচ্ছে আপনার বক্তব্য ?
হুমায়ুন আজাদ : জৈব একটা পার্থক্য রয়েছে; এর জন্যই নারী হচ্ছে নারী এবং পুরুষ হচ্ছে পুরুষ। নারীপুরুষের চলা উচিত ছিল সমতালে, কিন্তু পুরুষ নারীকে নিচে রাখতে গিয়ে সৃষ্টি করেছে বিরোধ; তবে তারা গভীরভাবে আকর্ষণও বোধ করে পরস্পরের প্রতি। আমি অবশ্য দ্ব›েদ্বর অবসান চাই; আকর্ষণের অবসান চাই না। আমি চাইব, আকর্ষণ আরও তীব্র, আরও গভীর হবে। এখন সারা পৃথিবী জুড়েই নারীপুরুষ একটা অসুস্থ সম্পর্কের শেকলে বাঁধা পড়ে আছে; ভালোবাসা বা প্রেমের খুব সংক্ষিপ্ত সময় ছাড়া তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে লিপ্ত থাকে। পরস্পরের বিরুদ্ধে যাওয়ার চেয়েও যেটা মারাত্মক, সেটা হচ্ছে, তারা পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলছে।
ফরিদ কবির : কী কারণে আকর্ষণ হারাচ্ছে ?
হুমায়ুন আজাদ : মানুষের শক্তির একটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আকর্ষণ বোধ করা হচ্ছে সারাক্ষণ আবেগের মধ্যে থাকা; কিন্তু মানুষের পক্ষে সব সময় তীব্র আবেগের মধ্যে থাকা সম্ভব নয়; যেমন ভূমিকম্প দিনের পর দিন চলতে পারে না বা ঝড় দিনের পর দিন চলতে পারে না। তীব্র আবেগ অনেকটা ভূমিকম্পের মতো বা প্রচÐ ঝড়ের মতো। আমরা আশা করতে পারি না যে ঝড় দু’মাস ধরে চলবে; তীব্র আবেগও মানুষ বছরের পর বছর ধরে রক্ষা করতে পারে না। যখন নারীপুরুষ প্রেমের ঋতুতে থাকে, তখন তারা থাকে আবেগের ঋতুতে; ওই ঋতুর অবসান ঘটে বিয়েতে, এক সময় যখন বিয়েটা যায়, তারা বড় বেশি কাছাকাছি আসে, বাস্তবে ও শারীরিক ক্লান্তিতে আসে, তখন আবেগের অবসান ঘটতেথাকে, তারা দূর থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। প্রেমিকপ্রেমিকারা যেমন পরস্পরের জন্য সারাক্ষণ উৎকণ্ঠিত থাকে স্বামী-স্ত্রীরা তেমন থাকে না। প্রেম হচ্ছে প্রচÐ উদ্বেগের নাম, গভীর অনিশ্চয়তা; আর বিয়ে হচ্ছে প্রাপ্তির অপরিসীম ক্লান্তি।
পারভেজ হোসেন : এই ব্যাপারে আমার একটি বক্তব্য আছে। সেটি হচ্ছে একটি আবেগকে একটি ঝড়ের মতো যমন দুমাস বা এক বছর ধরে রাখা যায় না একটি নারীর সঙ্গে প্রেমের যে আবেগ সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কিন্তু এ আবেগ কি বারবার ঘুরে ফিরে আসতে পারে না?
ন্ডমায়ুন আজাদ : মানুষ কয়েকটি ব্যাপাওে দÐিত। নারী ও পুরুষ পরস্পরের প্রতি আবেগ আকর্ষণ বোধ করবে, এটা তাদের দÐ; তারা আরও দÐিত যে তাদের আবেগ চিরস্থায়ী হবে না। আবেগ বারবার জাগতে পারে বিভিন্ন নারীর জন্য, বিভিন্ন পুরুষের জন্য; এটা তো আমরা নিয়মিতই দেখছি, বারবার জাগা আবেগে সমাজ নিয়মিতই কাঁপছে। আমাদেও যে সমাজব্যবস্থা তাতে বিভিন্ন পুরুষ নিয়মিতভাবে নতুন নতুন নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়; কিন্তু সমাজ ব্যবস্তা বাধ্য করে তাকে সেটা প্রকাশ না করতে। প্রথম প্রেম, দ্বিতীয় প্রেম, তৃতীয় প্রেম বা চতুর্থ-পঞ্চম প্রেম বলে কিছু নেই; প্রতিটি নতুন প্রেমই প্রথম প্রেম।
ফরিদ কবির : যদি বলা হয় যে একটা নারীর হৃদয় এবং শরীর দুটির মধ্যে একটা বেছে নিতেহবে। আপনি কোনটা নেবেন ? হৃদয়, না শরীর ?
হুমায়ুন আজাদ : এমন প্রতারক বাছাবাছি আমার ভালো লাগবে না, এমন বললে আমি হয়তো একটাও নেব না। তবে তোমার সন্তোষের জন্যে বলতে পারি হৃদয় বলতে যদি হৃৎপিÐ বোঝায়, যা অনেক মাংস ও হাড়ের ভেতরে থাকে, তাহলে সেটা ঠিক টেনে বের করা কঠিন হবে (হাসি)। আমি দুটোই পছন্দ করি। আমি হৃদয় নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারি; আবার শরীর নিয়েও সন্তুষ্ট থাকতে পারি, সব কিছু তো একসঙ্গে পাওয়া যায় না; তবে একসঙ্গে হৃদয় এবং শরীর দুটো পেলেই আমি তৃপ্তি পাব।
ফরিদ কবির : কিন্তু পার্টিকুলারলি কোনো মেয়ে যদি আপনাকে দুটোর যে কোনো একটি দিতে চায়, আপনি কোনটা নেবেন ?
হুমায়ুন আজাদ : এমন মেয়ে দেখা দিলে আমি প্রথম তার কাছে চাইব যে তোমার হৃদয়টা আমার সামনে রাখ, আমি একটু নেড়েচেড়ে দেখি, সেটির ওজন কেমন, রঙ কী, কতোটা নরম দেখি। সে পারবে না। দেহ সহজে দেয়া যায়, হৃদয় অতো সহজে দেয়া যায় না; শরীর সহজে পাওয়া যায়, কিনতেও পাওয়া যায়, কিন্তু সব শরীর নেয়ার মতো নয়। আমি শরীর ও হৃদয় নেয়ার জন্যে সব সময় প্রস্তুত হয়ে থাকি না।
ফরিদ কবির : আপনি যদি শৈল্পিক প্রেমিক হন, তাহলে তো শরীরের বদলে নারীর হৃদয়ের গুরুত্ব আপনার বেশি দেয়া উচিত।
হুমায়ুন আজাদ : তবে হৃদয়ে ঢুকতে হয় শরীরের অপার্থিব সিঁড়ি দিয়েই। কাউকে দেখলেই আমরা প্রথম হৃদয়ের খোঁজ করি না; আমরা প্রথম মোহিত হই শরীর দেখেই, কারও মুখ, কারও চুল, কারও ঠোঁট, কারও হাসি, কারো উত্তাল ঝড় দেখেই। যখন কেউ এসে দাঁড়ায় আমি ভাবতে বসি না তার মনটা কেমন ? অপূর্ব সুন্দর কি না ? নারী ও পুরুষের শরীর ও সৌন্দর্যই আমাদের মনে উপর প্রথম ছাপ ফেলে, তারপর ক্রমশ আমরা মন জানি এবং মন যদি চমৎকার হয়, অনেক ভালো। যার শরীরটা দেখলাম, যেটি অনির্বচনীয় সুখ দিল, তার ভেতরে থাকতে পারে একটি নিকৃষ্ট অসুন্দর মন। মানুষের মনের সৌন্দর্যের পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে কুৎসিত মনের সংখ্যা ৯৯%।
পারভেজ হোসেন : আমাদের মূল বিষয়ের শুরুর দিকে আপনাকে নিয়ে যাই। কারণ আমরা অনেক দূর এগিয়ে এসেছি। আপনি বললেন, প্রেম হচ্ছে একটা ঝড়ের মতো। আমার প্রশ্ন, আপনার জীবনে প্রথম ঝড় কখন কীভাবে এল ?
হুমায়ুন আজাদ : এটা এখনো বলার সময় আসে নি, চারপাশ ক্ষেপে ্ঠবে, মনে রেখ আমাদের চারপাশ বাঙালি (ও মুসলমান)। আমার এখনো নড়বড় আশি বছর হয়নি।
তুষার দাশ : সেটা তো প্রথবাদীদের ব্যাপার। প্রথাবাদীরা আশি বছরের আগে কিছু বলতে পারে না। আপনি তো প্রথাবিরোধী লোক। আপনাকে বলতে হবে এখনই। জীবনে প্রথম নারীর অনুভূতি কী বা কীভাবে আসে একজন নারীÑএ কথা আপনি ছাড়া আর কে বলবে ?
ন্ডমায়ুন আজাদ : আমি প্রথাবিরোধী বলে ভেতরের সব কিছু এখনই বলে দিতে পারি না, এটা ইউরোপ নয়। নারীর প্রতি আমাদের আকর্ষণ শুরু হয় সেই বাল্যকাল থেকে, আমিও আকর্ষণ বোধ করেছি। প্রতিটি বালকই বাল্যকালে তার চেয়ে বয়স্ক কোনো আপার প্রতি আকর্ষণ বোধ করে; কারণ চারপাশে সে তার সে সঙ্গিনীদের দেখে, সেই সঙ্গিনীদের মুগ্ধ করার মতো কোনো শক্তি থাকে না। আপাদের কী রকম আঁকাবাঁকা শরীর, তারা হাঁটলে বালকের কী রকম যে লাগে। অধিকাংশ বালকই কিন্তু প্রথম গোপন প্রেমে পড়ে তার থেকে বড় কোনো আপার। তবে এই প্রেম ভেতরেই থেকে যায়, সাধারণত প্রকাশ পায় না; বালকটি একা একা সুখ আর যন্ত্রণা যাপন করে।

নাসরীন জাহান : সেই আপাদের কেন্দ্র করে আপনার বেদনার কোনো অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা যদি থাকে, বলুন।
হুমায়ুন আজাদ : ‘ছাপ্পানো হাজার বর্গমাইল’-এ এ-ধরনের বর্ণনা আছে। আমার নানা বাড়িতে একটা খালের পারের এক বাড়িতে অপূর্ব এক রূপসী আপা থাকতেন। এত রূপসী পরে আমি কমই দেখেছি বা দেখি নি। তিনি সেজেগুঁজে বিকেলে তার চুল কাঁধের ওপর ফেলে দাঁড়িয়ে থাকতেন; দেখে মনে হতো কেউ বুঝি আসবে তাকে উদ্ধার করতে। আমার এই সুন্দরী আপা খালের ওপারে একটা নারিকেল গাছ ঘেরা বাড়িতে বন্দি জীবন যাপন করতেন; তাকিযে থাকতেন দূরের দিকে। আমাকে খুব আদও করতেন এবং আমি মুগ্ধ হতাম। পরে এক ডাক্তারের সঙ্গে তার বিয়ে হয়, ডাক্তার দেখতে সুন্দর ছিরেন না, এবং ওই ঘটনায় আমি খুব মর্মাহ হই। সেই ডাক্তার অবশ্য খুব ভালো মানুষ ছিলেন।
নাসরীন জাহান : আপার ধাপ পেরোনেরা পর যখন সত্যি সত্যি আপনি বুঝতে পারলেন যে, নারী-পুরুষ সমান তখন রোমাঞ্চিত হতে কি কখনো কোনো অসুবিধা বোধ করেছেন ?
হুমায়ুন আজাদ : বাল্যকালে আমার প্রচুর বান্ধবী ছিল; একসঙ্গে খেলেছি, সাঁতার কেটেছি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বউছি খেলেছি। আমার প্রাথমিক স্কুলে এবং গ্রামের পাড়ার বান্ধবীরা ছিল আমার বয়সী বা আমার থেকে কিছুটা ছোট। প্রথম কোনো পার্থক্য বুঝি নি, পরে ধীরে ধীরে বুঝতে পারি; তারা সবাই আমাকে পছন্দ করত, দেবতার মতো পুজোও করত কেউ কেউ।
তুষার দাশ : আপনার জীবনে বাল্য, কৈশোর ও যৌবনকালে নারী কীভাবে এসেছে ?
হুমায়ুন আজাদ : খুব সুন্দরভাবে, সুখকরভাবে, পার্থিব ও অপার্থিবভাবে এসেছে। ওই আসার কোনো তুলনা নেই; কবিতার থেকেও শিল্পিতভাবে এসেছে। তবে দুঃখ তা কবিতা নয়্ তবে জীবন যে উপভোগ্য, যাপন করার মতো; তার একটি বড়ো কারণ হলো পৃথিবীতে পুরুষ ও নারী রয়েছে; আর আমি পুরুষ বলে নারীর শিল্পকলায় মুগ্ধ হয়েছি; তার শরীর ও হৃদয় দুটোই পান করেছি।
পারভেজ হোসেন : তীব্রভাবে যখন আপনি রোমাঞ্চিত হতে শিখলেন, বুঝলেন, সেই সময়ে কি আপনার জীবনে কোনো নারী আসেনি যে আপনার জীবনে নতুন এক উপলব্ধি দিয়েছে, নতুনভাবে ?
হুমায়ুন আজাদ : কিশোর বয়সে আমার এক গভীর অনুরাগিনী ছিল। ঘর থেকে বেরুলেই দেখতাম সে তাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি পথে দাঁড়িয়ে দেখতাম, সে-ও দাঁড়িয়ে আছে এবং আমাদের মধ্যে অত্যন্ত সুন্দর সম্পর্ক ছিল। কিছুদিন আগে তার সাথে দেখা হলো, চিনতে পারি নি। তার সমস্ত চুল ধবধবে সাদা। আমি যখন ভাবি, ভাবি সেই চৌদ্দ বছরের বালিকাটিকে। আমি যে বয়স্ক হয়েছি একটা কল্পনা করতে পারি না। তবে প্রাজ্ঞ বুড়ো হতে আমার আপত্তি নেই।
ফরিদ কবির : এই সমযের একজন লেখিকার সঙ্গে আপনার গভীর সম্পর্ক চলছে, এ রকম একটা রটনা বাজারে চালু আছে।
হুমায়ুন আজাদ : এটা রটনা নয়। এটা কিংবদন্তি, পাঁচশো বছর চলবে।
পারভেজ হোসেন : এই কিংবদন্তির কিয়দংশ তো উনি লিখেই ফেলেছেন।এখন বাকিটা যদি আপনি বলেন।
হুমায়ুন আজাদ : কে লিখেছেন ?
পারভেজ হোসেন : নাম তো আমরা বলতে চাই না।
হুমায়ুন আজাদ : লিখেই ফেলেছেন ?
পারভেজ হোসেন : হ্যাঁ, অধিকাংশ তো লিখেই ফেলেছেন।
হুমায়ুন আজাদ : তাই
তুষার দাশ : কিন্তু স্যার ঘটনার পাত্র-পাত্রীরা যদি কিছু না বলে, না লেখেÑতবে অন্যরা কীভাবে লিখবে ?
ন্ডমায়ুন আজাদ : পাত্রপাত্রীরা হয়তো এক সময় বলবে।
উরিদ কবির : যখন আপনি যুবক হলেনÑনারীকে নারী হিসেবে উপলব্দি করতে পারলেন…
ন্ডমায়ুন আজাদ: নারীর যে একটি ভিন্ন শরীর রয়েছে, তাতে কৈশোরেই আমি মুগ্ধ হয়েছি এবং তার চোখে কী রকম যাদু, তার কণ্ঠস্বর অন্যরকমÑআমাকে মুগ্ধ করছে। আমার ‘সবকিছু ভেঙে পড়ে’ উপন্যাসে বাল্যকালের একটা দীর্ঘ উপাখ্যান রয়েছে। এর দুটো অংশ রয়েছে। কিছুটা আমার ব্যক্তিগত জীবন থেকে উঠে এসেছে। বাকিটা আমাদের তথাকথিত নি®প্রাণ বালক নায়কদের। লিঙ্গহীন বালক।
নাসরিন জাহান : ধরুন আপনার বাড়িটা খালি, আপনার স্ত্রী বাইরে গেছেন, সেখানে কেউ বেড়াতে এলÑওটা কিন্তু অসম্ভব। কিন্তু আপনি দেশের বাইরে, সেখানে কেউ এল, এটা কিন্তু সহজ। আমি বোধ করি একজন মেয়ের সম্পর্ক এত গোপন থাকে যে কেউ জানতে পারে না।
তুষার দাশ : সেটা কিন্তু স্যার কিছুক্ষণ আগে বলেছেন।
হুমায়ুন আজাদ : আমি বলেছি তো নারীরা একনিষ্ঠ থাকে বাধ্য হয়ে, পুরুষরা একনিষ্ঠ থাকে না, তাদের বাধ্য করা যায় না। একনিষ্ঠতাই নারী-পুরুষের প্রধান সমস্যা। পুরুষ আধিপত্যশীল বলে সে এটা মানে না। নারীকে মানতেহয়, তবে গোপনে অনেকে বিধান অমান্য করে। অনেক বিবাহিত নারী আমাকে ফোন করেন। অনেককে আমি বলি, টেলিফোনে কথা বলে আপনার কি কামনা তৃপ্ত হয় ? হয়, হয়; এর চেয়ে বেশি তারা চায় না, সাহস নেই। স্বামীদের শক্তি আছে টাকা আছে, তারা ব্যভিচারের ব্যবস্থা করতে পারে। নারীরা পারে না। একনিষ্ঠতার ব্যাপারে, ‘আমার অবিশ্বাস’-এ দীর্ঘ আলোচনা করেছি। আমি বলেছি একনিষ্ঠতা নারী-পুরুষকে পরস্পরের শত্রæতে পরিণত করে।
নাসরীন জাহান : আমার মনে হচেছ মেয়েদের আপনি একটু বেশিই বিশ্বাস করেন।
তুষার দাশ : স্যারের মধ্যে বিশ্বাসের চেয়ে অবিশ্বাসই বেশি।
নাসরিন জাহান : পঞ্চাশোর্ধ একজন মহিলা লম্পট হতে পারে সেটা আপনি জানেন না কেন ?
তুষার দাশ : স্যার জানেন, বলছেন না।
নাসরীন জাহান : আপনি ধরে নিচ্ছেন বয়সী নারীকে কেবল নিরামিষ দিয়েই ভরিয়ে রাখা যায় যাবে।
হুমায়ুন আজাদ : না, আমি চাই তারা আরও বেশি শক্তি অর্জন করুক। আমি যখন ‘নারী’ লিখছিলাম, তখন একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কি ঋতুচক্র হিসাব করতে জানেন ? তিনি বললেন, ‘পারি; যেদিন শেষ হয় সেদিন থেকে গণনা করি। তার চার-পাঁচটি বাচ্চা হয়েছে, প্রফেসর; কিন্তু নিজের সম্পর্কেই জানেন না।
তুষার দাশ : বর্তমানে কোন নারী কি আপনার কাজে কর্মে জীবন উৎসাহ যোগাচ্ছে ?
ন্ডমায়ুন আজাদ : আমিএখন মহানিস্কাম জীবন যাপন করছি। আমার ইচ্ছে কছে যে পৃথিবীতে যদি কোনো কামনা না থাকত, বাসনা না থাকত, শুধু জ্ঞান এবং শিল্পকলা থাকত তাহলে সবচেয়ে ভালো হত। এ মুহূর্তে আমি অত্যন্ত জ্ঞান এবং শিল্পকলার মধ্যে আছি; এবং একা আছি। একটা প্রাচীন ভারতীয় অরণ্যের মাঝে বাস করার মধ্যে যে সুখ তা আমি এ ঢাকা নগরীতেই উপভোগ করছি।
তুষার দাশ : আপনি অনেক স্বনামধন্য লোক। অনেক নারী আপনার প্রতি আকৃষ্ট, স্যার,আপনার বক্তব্যের কারণে। আপনি নিজেকে গুটিয়ে রাখলেও কেউ কি আপনার দরজায় করাঘাত করছে না, স্যার ?
হুমায়ুন আজাদ : কেউ যে আমার দরজায় করাঘাত করে না, তা নয়।
নাসরিন জাহান : একজন নারীকে নিয়ে আপনার স্বপ্নটা কী ? একাশি অথবা আটাত্তর বয়সে আপনি যখন উপনীত, সেই সময়ে আপনার স্বপ্নটা কী ? কল্পনাটা কী ? যেখানে আপনার স্ত্রী থাকতে পারে, না-ও থাকতে পারে। মনে করুন আপনি একাকী। সেই সমযে অর্থাৎ একাশিতে আপনার বোধটা কী নারী সম্পর্কে ?
হুমায়ুন আজাদ : ওই বয়সে আমি সঙ্গী চাইব। তরুণী সঙ্গী হলে ভালোই; তবে তখন আমি নিঃসঙ্গ থাকতেও পছন্দ করব।
তুষার দাশ : ভারতীয় ঋষিদের মতো ?
হুমায়ুন আজাদ : ভারতীয় ঋষিদের মতো নয়; তাঁদের চেয়েও বেশি। তাঁরা ছিলেন মহাকামুক; আমি তা নই। তাঁদের লক্ষ বছরের সাধনাÑএকটি নারী এলÑঅমনি শেষ। আমার ওরকম অবস্থা নয়। আমি অবশ্য এখন নিজেকে গুটিয়ে আনছি, সম্পূর্ণ একা হয়ে যেতে পারলে বেশ হতো, কিন্তু একা হতে গিযে দেখি ইন্দ্রিয়রা কেঁপে ওঠে, বলে, দ্যাখো, চারদিকে জীবন;…পৃথিবী থেকে চলে যাব এটা ঠিক; সব বাসনা যে পূর্ণ হবে তা নয়; কিছু বাসনা অপূর্ণ থেকে যাবেই, আমি চাই অপূর্ণ থাকুক কিছুÑবেশি কাজ বাকি নেই, যেটুকু বাকি শেষ করে উঠতে হবে বেলা পড়ার আগেই, শেষ না হলেও দুঃখ থাকবে না।

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua.

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *