পদ্মবউ

চন্দ্রমশায়ের পাঠশালা। শীতকালের সকালবেলা খোলা আঙিনায় তালপাতার চাটাই বিছাইয়া ছেলেরা সারি দিয়া বসিয়া গিয়েছে। উঠানের কোণে প্রকাÐ বড় একটা নিমগাছ। তাহারই গোড়ায় মাটি-দিয়া বাঁধানো একটা বেদীর উপর চন্দ্রমশায়ের আসন। বেদীতে বসিয়া চন্দ্রমশায় একখানা সংস্কৃত বই পড়িতেছিল। বীভৎস মূর্তি! দেখিলে শরীর শিহরিয়া উঠে; কেমন মমতাও হয়, আবার রোগের নির্মমতায় রূপের বিকৃত পরিণতি দেখিয়া ভয় হয়।
চন্দ্রমশায়ের সর্বাঙ্গে কুষ্ঠব্যাধির নিষ্ঠুর আক্রমণ। নাক মোটা হইয়া ফুলিয়া বাঁকিয়া গিয়েছে; চোখের নিচের পাতা দুইটি কেমন ঝুলিয়া উলটাইয়া পড়িয়াছে, সে পাতার ভিতরের বিবর্ণ রক্তিমা সর্বদা ক্লেদসিক্ত; সমস্ত শরীর বন্ধুর ধারায় ফুলিয়াছে; সাদা-কালো দাগে দেহচর্ম ছাইয়া গিয়াছে।
সেরূপ বিকৃতি দেখিয়া শিশুদের আতঙ্ক হয়। বালক-কিশোরদের শঙ্কা হয় রোগবিকৃতি দেখিয়া।
তবুও চন্দ্রমশায়ের পাঠশালা চলে। চন্দ্রমশায়ের শিক্ষাপদ্ধতির খ্যাতি আছে, তাহার জ্ঞানস্পৃহা অসীম। তাহার অবলম্বন শুুধু এই পাঠশালা, পুস্তক আর তাহার স্ত্রী। পরিণতসমাজের মধ্যে সে বহুকাল বাহির হয় নাই। কেহ আসিলে দেখা হয়, কিন্তু চন্দ্রমশায় কথা বলে যেন কত অপরাধী।
যাক, ছেলেরা নিজ নিজ পড়া পড়িতেছিল। একজন হাঁ করিয়া দেখিতেছিল, বাড়ির পুকুরের পাড়ের বড় বিশুলগাছটার মাথায় টিয়াপাখির ঝাঁকের খেলা। ¯েøট আড়াল দিয়া একজন আর একজনকে ভেংচি কাটিতেছিল। আর দুইজনে ¯েøটে দাগ দিয়া খেলিতেছিল ‘দাগামিল’-খেলা।
বৎসর-আষ্টেকের একটি ছেলে পার্শ্ববর্তীর উপর অকম্মাৎ লাফাইয়া পড়িয়া এক থাবায় নাকটা তাহার রক্তাক্ত করিয়া দিল। পাঠশালার শান্তিভঙ্গ হইয়া গেল। ছেলেরা চঞ্চল হইয়া উঠিল। চন্দ্রমশায় মুখের বইখানা নামাইয়া নিমের ডালের ছড়িগাছটা আস্ফালন করিয়া বলিল, ছাড় ছাড়, এই চারু, ছেড়ে দাও।
চন্দ্রমশায়ের স্ত্রী ছিল রান্নাশালে, সে দ্রæতপদে আসিয়া ছেলে দুইটিকে পৃথক করিয়া দিল এবং অতি মৃদুস্বরে দীর্ঘ অবগুণ্ঠনের মধ্য হইতে বলিল, ছি, ঝগড়া করে না। পড়নি-‘কদাচ কাহারও সহিত বিবাদ করিও না?
মশায়-গিন্নীর স্বভাব-দীর্ঘ অবগুণ্ঠন দিয়া থাকা, আর ওই মৃদুস্বরে কথা। মশায়গিন্নীর মুখ ছেলেরাও ভাল করিয়া কখনও দেখে নাই, উচ্চকণ্ঠের কথাও কখনও শুনে নাই। চারু রাগে ফুলিতেছিল, সে বলিল, ও আমার বাবাকে কোলাব্যাঙ বলবে কেন?
আহত নিশাকর শুধু কাঁদিতেছিল, অ্যাঁ-অ্যাঁ- আমার নাকে-অ্যাঁ অ্যাঁ-রক্ত-অ্যাঁ মশায়-গিন্নী বলিল, চারু, তুমি তো ব’লে দিলেই পারতে, নিজে মারলে কেন?
চারু বলিল, আমার বাবাকে কেন বলবে ও?
চন্দ্রমশায় বলিল, সমস্যার কথা পদ্মবউ-পিতৃভক্তির পুরস্কার দিই না, সাজা দিই? মশায়-গিন্নী অভ্যাসমত মৃদুস্বরে বলিল, চারু, তুমি আজ ছুটি পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাক। আর নিশাকর, তুমি যাও চারুর বাপের কাছে, তাঁকে সব ব’লে তাঁর মাফ চেয়ে এস। চন্দ্রমশায় বলিল, ভাল বিচার হয়েছে, বাঃ!-বলিয়া সে বইখানা মুখের কাছে তুলিয়া ধরিল।
মশায়-গিন্নী বলিল, আবার বই নিয়ে বসলে কেন? ছেলেদের পড়া নিয়ে ছুটি দিয়ে দাও। জল গরম হয়ে গেছে. স্নান ক’রে ফেল।
আকাশের দিকে চাহিয়া আবার বলিল, কিন্তু বেলা যে শেষ আর হ’ল না পদ্মবউ, আর যে পারি না।
মশায়-গিন্নী কোনও উত্তর দিল না, ছোট ছেলেদের ডাকিয়া বলিল, আয়, তোদের পড়া ধরব আয়।
মশায়-গিন্নী ছাত্রবৃত্তি-পাস-করা মেয়ে-স্বামীর পাঠশালে সে ছোট ছেলেদের পড়াইয়া থাকে।
ছেলেরা তাহাকে ডাকে-সেকেন-মাস্টার। চন্দ্রমশায় তাহাদের হেড-মাস্টার। বড় ছেলেরা থাকিয়া থাকিয়া চন্দ্রমশায়ের সম্মুখে ¯েøট ধরিয়া দাঁড়ায়, চন্দ্রমশায় তাহাদের অঙ্কের উপর চোখ বুলাইয়া কাহাকেও বলে, রাইট; কাহাকেও বলে , ভুল হয়েছে।
চন্দ্রমশায় ছেলেদের খাতা কাগজপ ¯েøট কি পেন্সিল স্পর্শ করে না, সমস্ত দেখা হইয়া গেলে নিমগাছে ঝোলোনো বোর্ডখানায় নিজে অঙ্কটা কষিয়া দিয়া যায়, আর বুঝাইয়া দেয়-ছোট বন্ধনীর কাজ সকলের আগে শেষ করতে হয়, এই নিয়ম; সুতরাং ছয়ের পাঁচ যুক্ত-
মশায়-গিন্নী তখন প্রশ্ন করিতেছিল, বল দেখি, সবুজ রঙের কি কি আছে আমাদের বাড়িতে ?

ছুটি হইয়া গিয়েছে। রাস্তায় ছেলেদের কলরব তখনও শোনা যাইতেছিল। মশায়-গিন্নী এতক্ষণে ঘোমটা খুলিল। দেখিতে নিতান্ত সাধারণ মেয়ে, বরং কালোই বলা যায়। মশায়-গিন্নী ঝাঁটাগাছটা লইয়া উঠানটা পরিস্কার করিতে লাগিল। ঝাঁট দিতে দিতে বলিল, ওসব কথা তুমি কেন আমায় বল ?
চন্দ্রমশায় বইখানা হাতে উঠিয়া দাঁড়াইয়াছিল, বলিল, কি বললাম ? কিছু তো বলিনি! মশায়-গিন্নী স্বামীর মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, বললে না, বেলা যে আর-?
চন্দ্রমশায় ব্যথিত কণ্ঠে বলিল, সত্যি পদ্মবউ, আর যে পারছি না !
পদ্মবউয়ের চোখ ছল-ছল করিয়া উঠিল। সে নীরবেই উঠানটা ঝাঁট দিতে লাগিল। ঝাঁট দেওয়া শেষ হইলে সে উঠানে একটা জলচৌখি, গামছা ও বালতি পাতিয়া দিল। নিমের তেলের শিশিও গামছা নামাইয়া দিয়া বলিল, মাখ, তেল মাখ।
চন্দ্রমশায় তেল মাখিতে বসিল; পদ্মবউ লইয়া আসিল জলের হাঁড়ি-নিমপাতা-ফুটানো গরম জল। হাঁড়ির মুখে গামছা দিয়া গামলায় জল ঢালিয়া সে হাতের তালু স্বামীর সম্মুখে পাতিয়া বলিল, দাও দেখি একটু, পিঠে দিয়ে দিইমালিশ ক’রে।
গল্প তো জান!
পদ্ম কাঁদিতেছিল, সে ঘাড় নাড়িয়া প্রতিবাদ করিল, না না, সে পারিবে না। বাপ বলিল, নিতান্ত মন্দভাগ্য, পূর্বজন্মের বহু দুষ্কৃতি না থাকলে এ রোগ কারও হয় না মা। কিন্তু তুমি কেন এ জন্মে সে দুষ্কৃতি সঞ্চয় করবে ? পরজন্মের কর্মও তো করে রাখতে হবে। ছি, ঘৃণা ক’রে যদি তুমি স্বামীকে পরিত্যাগ কর, পরজন্মে কে বলতে পারে যে, তোমার এই ব্যাধি হবে না! পরজন্ম কেন, এই জন্মের কথাÑ
বিরক্তিভরে পদ্মার মা বলিয়া উঠিল, কি যে তোমার কথার ছিরি, ওইগুলো খুব ভাল কথা বঝি?
সমস্ত রাত্রি মনের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া পদ্মা পরদিন প্রভাতে পিতাকে প্রণাম করিয়া কহিল, আমার সঙ্গে তুমি চল বাবা।
তারপর পদ্ম আসিয়া যে নিষ্ঠার সহিত স্বামীসেবা আরম্ভ করিল, সত্যই তাহার তুলনা হয় না। গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা শুধু বিষ্মিতই হইল না- যে বিপুল শ্রদ্ধা তাহাকে অঞ্জলি দিল, সেও অতুলনীয়।
পদ্ম কিন্তু সেদিকে ভ্রƒক্ষেপও করিল না।
অকস্মাৎ কিন্তু জীবনে একটা বিপর্যয় ঘটিয়া গেল। চন্দ্রমশায়ের পাঠশালাটি উঠিয়া গেল। অধিকাংশ ছাত্রই পাঠশালা পরিত্যাগ করিল। কোথা হইতে আসিল এক নূতন পাস-করা ডাক্তার, সে চন্দ্রমশায়কে পাঠশালার শিক্ষকরূপে দেখিয়ে শিহরিয়া উঠিল। সে বাবুদের বৈঠকখানায় বলিল, এ করেছেন কি মশায়? এই সব নীরোগ শিশু, এদের দেহে এই বয়স থেকে লেপ্রসির বীজ ঢুকলে আর রক্ষে আছে? কুষ্ঠরোগ যে ছোঁয়াচে।
একজন বলিল, তা-আমাাদের চন্দ্রমশায় খুব সাবধানী লোক, উনি ছেলেদের কখনও ছোঁন না, নাড়েন না। বই-কলম-¯েøট পর্যন্ত না। মশায়ের বোর্ড পর্যন্ত মুছে দেন ওঁর স্ত্রী।
ডাক্তার বলিল, আরে মশাই, ওর ইনফেক্শন হয় নিশ্বাসের সঙ্গে। নাকের মধ্যেই রোগটার প্রথম সূত্রপাত।
একজন বলিল, তা বটে, নাকই তো প্রথম ফোলে বাপু।
চন্দ্রমশায় শুধু নীরব হইয়া রহিল। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল না, দুঃখ করিল না, ভবিষ্যতের জন্য কোন আকুলতা তাহার হইল বলিয়াও বোধ হইল না।
সে শুধু যে কয়টি ছাত্র আসিয়াছিল তাহাদিগকে বলিল, পাঠশালা আর হবে না, তোরাও আর আসিস না।
মশায়-গিন্নী কিন্তু ডাক্তারের উপরে ক্রোধে সারা হইল। চন্দ্রমশায় বলিল, ওর ওপর রাগ করে ফল কি পদ্ম? সে তার জ্ঞানমত সত্যি কথাই বলেছে।
পদ্ম বলিল, কি জ্ঞানী লোক সে ডাক্তার! জ্ঞান থাকলে এ কথা সে বলত না। আজ আমি এতদিন অহরহ তোমার সঙ্গে বাস করছি, তা হ’েল তো আমারই আগে হওয়া উচিত ছিল।
চন্দ্রমশায় বলিল, দুঃখ বা রাগ ক’রো না পদ্ম, ভগবানকে স্মরণ কর। তোমার ভগবানই আজ আমার ভরসা।
পদ্ম এবার কাঁদিয়া ফেলিল।
অনেকক্ষণ কাঁদিয়া সে চোখ মুছিয়া বলিল, দেখো মুতি, তিনি কোন কষ্ট আমাদের দেবেন না।
তারপর আরম্ভ হইল ভীষণ জীবন-সংগ্রাম। পদ্ম ধান ভানিয়া, চাল কুটিয়া জীবিকা সংস্থানের ব্যবস্থা করিল।
চন্দ্রমশায় কঠোর পরিশ্রমপরায়ণা পদ্মার দিকে নীরবে চাহিয়া থাকে, কোন কথা বলে না। সেদিন পদ্ম অকস্মাৎ ঢেঁকিশাল হইতে বহির হইয়া আসিয়া দাওয়ার উপর শুইয়া পড়িল।
চন্দ্রমশায় জিজ্ঞাসা করিল, এমন করছ যে পদ্মা?
হাঁপাইতে হাঁপাইতে পদ্ম বলিল, বুকটা কেমন ক’রে উঠল গো!
চন্দ্রমশায় কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া বলিল, তুমি রাগ ক’রো না পদ্ম। ভগবানের কাছে আর তোমার আয়তি কামনা তুমি ক’রো না। আমার মুক্তি কামনাই কর।
পদ্ম প্রতিবাদ করিল না, সে শুধু কাঁদিল মাত্র।
অপরাহে“র দিকে পদ্মর অল্প জ্বর দেখা ছিল। সকালে সে যখন উঠিল, তখন শরীর যেন কত দুর্বল! বাড়িতে চাল ছিল না। সে ভাবিয়া চিন্তিয়া প্রতিবেশী মুখুজ্জেদের বাড়ি চালিল চাল ধার করিতে।
মুখুজ্জে-গিন্নী বলিল, এস, ব’স।
পদ্ম বলিল, না দিদি, বসব না। কাল থেকে আবার জ্বর। ঘরে চাল নেই, তাই-এমন সময় হুলুধ্বনি দিয়া মুখুজ্জে-বাড়ির বধূরা আসিয়া বাড়ি ঢুকিল। কোন মানসের জন্য ‘ঠারগুয়া’ মানত ছিল, তাই আজ দেওয়া হইল। মুখুজ্জে-গিন্নী বলিল, ওগো বড়বউমা, পদ্মাকে সিঁদুর ঠেকিয়ে দাও-সাক্ষাৎ সতীল²ী; পান দাও, সুপুরি দাও, দিয়ে পেন্নাম কর, পায়ের ধুলো নাও।
ঠারগুয়ার রেকাবি হাতে বড়বউ সিঁদুর পরাইয়া দিয়া পদ্মার হাতে পান-সুপারি তুলিয়া দিল।
মুখুজ্জে-গিন্নী বলিল, থাক, আর পেন্নাম করতে হবে না, পেসাদী হাত আবার তোমার। মনে মনে কর, তা হ’লেই হবে। আর চাল দাও তো পদ্মকে সের চারেক বউমা।
বড়বউ চলিয়া গেল। মুখুজ্জে-গিন্নী পদ্মকে বলিল, এ তোর কবে থেকে হ’ল পদ্মবউ?
পদ্ম সবিস্ময়ে প্রশ্ন করিল, কি দিদি?
বড় রোগ?
পদ্ম সবিস্ময়ে মুখুজ্জে-গিন্নীর মুখের দিকে চাহিয়া রহিল, সম্স্ত শরীর থরথর করিয়া কাঁপিতেছিল।
মুখুজ্জে-গিন্নী বলিল, দেখি, তোর হাত-পা দেখি!
পদ্ম সভয়ে হাত দুইটি মেলিয় ধরিল নিজের চোখের সম্মুখে। চোখে যাদুর অঞ্জন দিয়া কে যেন প্রেতলোকের দ্বার তাহার দৃষ্টির সম্মুখে খলিয়া দিল। স্ফীত করাঙ্গুলি রৌদ্রসস্পাতে তৈলাক্তের মত চকচক করিতেছে। পদ্মার মনে হইল, অসংখ্য কৃমিকীট প্রতি লোমক‚পের মধ্যে কিলবিল করিয়া বেড়াইতেছে। পা দেখিতে আর তাহার সাহস হইল না।
বাড়িতে আসিয়া সে নিবিষ্টচিত্তে পা দুইটি বাহির করিয়া দেখিতে বসিল। পায়ের আঙুল ও ফুলিয়াছে। চেটোর উপর বার বার আঙুল টিপিয়া দেখিল, প্রত্যেক স্থানটি বীভৎস গহŸর সৃষ্টি করিতেছে।
মুখ দেখিবার জন্য সে তাড়াতাড়ি আয়না আনিয়া বসিল। আয়নার ঢাকনাটা খুলিয়াই কিন্তু সভয়ে সেটাকে বন্ধ করিয়া রাখিয়া দিল। তারপর অকস্মাৎ ধূলার উপর লুটাইয়া পড়িল। কিন্তু আশ্চর্য, চোখে তাহার জল ছিল না।
চন্দ্রমশায় প্রাতঃকৃত্যের বাহিরে গিয়াছিল। সে ফিরিয়া আসিয়া ডাকিল, পদ্ম! পদ্মর মাথার কাপড় খুলিয়া উন্মত্তার মত বলিল, দেখ, দেখ, হ’ল তো!
তাহার মুখের দিকে চাহিয়া চন্দ্রমশায় একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া নীরবে মাথা নত করিয়া রহিল।
সমস্ত দিন পদ্ম উঠিল না, চন্দ্রমশায়ও ডাকিল না। নিমতলায় একখানা বই লইয়া সে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। সন্ধ্যার সময় বাহির ইহয়া গেল; যাইবার সময় বলিল, পদ্ম, ওঠ, উঠে মুখে-হাতে জল দাও।
বাড়ি যখন ফিরিল, তখন পদ্ম আলো জ্বালিয়া সম্মুখে আয়না ধরিয়া নিবিষ্টবিত্তে আপনার প্রতিবিম্ব দেখিতেছে।
চন্দ্রমশায় ডাকিল, পদ্ম!
অস্বাভাবিক দৃষ্টিতে পদ্ম স্বামীর দিকে চাহিয়া বলিল, সরে যাও বলছি, স’রে যাও তুমি আমার সামনে থেকে।
কোনরূপে চারটি মুড়ি চিবাইয়া চন্দ্রমশায় দাওয়ার উপরেই শুইয়া রহিল। পদ্ম তখনও তেমনই আয়না সম্মখে রাখিয়া বসিয়া ছিল। সম্মুখের লণ্ঠনটা অপরিমিতবর্ধিত শিখার কালিতে রাঙা হইয়া উঠিয়াছে। পদ্ম শিখাটাকে আরও বাড়াইয়া দিল।
নিশীথরাত্রে ঝনঝন শব্দের চন্দ্রমশায়ের ঘুম ভাঙিয়া গেল। গাঢ় অন্ধকার রাত্রি; সম্মুখে লণ্ঠনটার কাচ ভাঙিয়া গিয়াছে, তাহারই মশালের মত লাল আলোয় খানিকটা শুধু দেখা যাইতেছিল। পদ্ম সেখানে ছিল না। চন্দ্রমশায় উঠিয়া চারিদিক চাহিয়া দেখিল।
গৃহাভ্যন্তরে আবার শব্দ উঠিল, ঝনঝন-ঝনঝন
চন্দ্রমশায় ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া দেখিয়, পদ্ম নির্মম আক্রোশে দেওয়ালের দেবদেবীর ছবিগুলি চুরমার করিয়া দিতেছে। ঘরখানা কাচের টুকরায় ভারিয়া গিয়াছে।
পদ্মর মুখ রক্তাক্ত।
সে সময়ে ডাকিল, পদ্ম-পদ্ম।
পদ্ম দৃক্পাত করিল না। সে আর একটা ছবিতে আঘাত করিল। চন্দ্রমশায় এবার তাহার বাহু ধরিয়া ডাকিল, পদ্ম-পদ্মবউ!
পদ্মবউ একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ স্বামীর দিকে চািহয়া হা-হা করিয়া কাঁদিয়া উঠিয়া মাটির উপর ভারকেন্দ্রচ্যুত মাটির প্রতিমার মতই সশব্দে পড়িয়া গেল।
সে মূর্ছা পদ্মার আর ভাঙিল না।
ডাক্তার খানিকক্ষণ নিবিষ্টচিত্তে পরীক্ষা করিয়া বলিল, নিউট্রিশনের অভাবে এঁর বেরিবেরি হয়েছিল।

