গল্পসাহিত্য

মুক্তিযুদ্ধের কথা-আহমেদ রফিক

ভাবতে ভালো লাগে আমরা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক। দেশটির নাম বাংলাদেশ। এর পোষাকি বা রাজনৈতিক নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। দেশটি ছোট এবং জনবসতির। এর আয়তন মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার। আয়তনে ছোট জলে কী হবে, এখানে রয়েছে অনেক অনেক নদীনালা খাল-বিল। আর প্রচুর ঝোঁপজঙ্গল গাছপালা।
প্রধান নদীগুলোর নাম পদ্মা মেঘনা ব্রহ্মপুত্র যমুনা। পলিমাটিতে গড়া বাংলাদেশের ঊর্বর মাটি। তাই দেশটি কৃষিপ্রধান। অবশ্য শিল্প-কারখানাও এখন সংখ্যায় কম নয়। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৬ কোটি ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছে। সে তুলনায় শিক্ষিতের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম।
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। এ যুদ্ধকে স্বাধীনতাযুদ্ধও বলা হয়ে থাকে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের কথাই বলব ছোটদের উপযোগী ভাষায়। তবে তার আগে বাংলাদেশের পূর্ব ইতিহাস সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। তাতে বোঝা যাবে বাংলাদেশের ভ‚-রাজনৈতিক অবস্থান, এর রাজনৈতিক পরিচয়। জানা যাবে, কীভাবে কোন ভৌগোলিক-রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
পূর্ব পরিচয়
এশিয়া মহাদেশের একটি বড়সড় দেশ ভারতবর্ষ। এ ভ‚খÐটি এতই বড় যে, এর একদা-পরিচয় উপমহাদেশ নামে। ভারতবর্ষও একটি কৃষিপ্রধান উর্বর ভ‚মির দেশ। প্রাচীন সভ্যতার দেশ হিসাবে রয়েছে এর খ্যাতি। যুগে যুগে একাধিক জনগোষ্ঠীর মানুষ এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছে। এদের জাতিপরিচয় ও ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন। তাই ভারতবর্ষকে বলা হতো বহুজাতি, বহুভাষী মানুষের দেশ। এখনো সে অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন ঘটে নি।
ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতবর্ষের পূর্ব অঞ্চলের ভ‚খÐটির নাম ছিল বঙ্গদেশ। ধর্ম পরিচয়ে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান প্রভৃতি জনসংখ্যার বসবাস এখানে। এদের মাতৃভাষা বাংলা। জাতি হিসাবে এদের পরিছয় বাঙালি। এ অঞ্চল অতি প্রাচীনকালে বঙ্গ, পুÐ, গৌড়, সমতট, সুরমা, রাঢ় প্রভৃতি ছোট ছোট স্বাধীন জনপদে বিভক্ত ছিল। অধিবাসীরাও ছিল ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের। এদের ভ‚খন্ড পরিচয় সময়ের সাথে অনেক বদলে গেছে।
এমন একটি কথা প্রচলিত আছে যে, এই বাংলাদেশ অঞ্চল অর্থাৎ বঙ্গদেশ একাত্তরের আগে কখনো স্বাধীন ছিল না। এ তথ্য পুরোপুরি ঠিক নয়।
একাধিক সময়ে বা রাজশাসনে স্বাধীন বাংলা অঞ্চলের কথা জানা যায়। বাঙালির আদি ইতিহাস ‘রচয়িতা ড. নীহার রঞ্জন রায় ইতিহাসের অনেক সূত্র তুলে ধরে লিখেছেন যে এ অঞ্চলে ‘গঙ্গারাষ্ট্র’ বা ‘গঙ্গাহৃদি’ নামে একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল। প্রাচীন গ্রীক ইতিহাসে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
রাজা শশাংক থেকে পালবংশ ও সেনবংশের রাজত্বকালেও গৌড়বঙ্গ ছিল স্বাধীন রাজ্য। এমনকি ছিল সুলতানি আমলে। তখন এর সুস্পষ্ট নাম ছিল বাঙ্গালা। ভারতে মুঘল শাসন আমলে ইংরেজ, ফরাসি, পর্তুগীজ প্রভৃতি ইউরোপীয় বণিকরা বাংলাসহ ভারতে বাণিজ্য করতে এসেছে। বাঙ্গালা ভ‚খন্ডকে ইংরেজরা বলতো ‘বেঙ্গল’।

দুই

ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাস বড় বিচিত্র এবং তা কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই। ঊর্বর ভ‚মির সন্ধানে একাধিক জাতির মানুষ ভারতে এসেছে এবং এখানে থেকে গেছে। যেমন আর্যভাষী, দ্রাবিঢ়ভাষী, অষ্ট্রিভাষী জনগোষ্ঠী। এদের মধ্যে আর্যভাষীদের প্রভাব প্রতিপত্তি ও অস্ত্রের জোর ছিল সবার চাইতে বেশি। তাই ভারতে আর্যভাষা ও তাদের সভ্যতা সংস্কৃতির প্রভাব দেখা গেছে সবচেয়ে বেশি। তবে কৃষিজীবী অষ্ট্রিভাষী জনগোষ্ঠীর বসতি ছিল ভারতের পূর্ব প্রান্তে বাংলা অঞ্চলে। এখানে এদের বসবাস দীর্ঘসময় ধরে।
নদী খাল বিল ও ঝোঁপ জঙ্গলে ভরা পূর্ববঙ্গীয় অঞ্চলে আর্যভাষীরা এসেছে অনেক পরে। তবু আর্যভাষা সংস্কৃতের প্রভাব বাংলা ভাষায় সবচেয়ে বেশি। বাংলা ভাষার আদিরূপ চর্যাপদেরন (কবিতার) উদ্ভব ও বিকাশ পাল আমলে। মধ্যযুগে মুঘল আমলে সেনাপতি ইসলাম খাঁ বাংলা দখল করার পরও পরবর্তীকালে নবাবী আমলের বাংলা প্রায় স্বাধীনই ছিল। বিশেষ করে নবাব আলীবর্দী খাঁর আমলের পূর্বে বাংলা।
তবে শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার আমলে সেনাপতি মীর জাফর ও জগং শ্রেঠ প্রমুখ ধনিকদের বিশ্বাসঘাতকতায় ১৭৫৭ জুনে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পরাজয় ও মৃত্যুর পর বাংলা ইংরেজ বণিকের অধিকারে আসে। ক্রমে তারা শাসন ক্ষমতা নিজ হাতে নেয়। ধীরে ধীরে জয় করে গোটা ভারতবর্ষ।
তবে প্রথম দিকে ইংরেজ বণিক শাসক খুব একটা শান্তি ও স্বস্তিতে ছিল না। ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহী দীর্ঘ সময় ধরে ইংরেজ শাসকদের যথেষ্ট ভুগিয়েছে। অবশ্য কৃষক বিদ্রোহগুলো ছিল প্রধানত অত্যাচারী ও শোষক জমিদার শ্রেণি ও মহাজনদের বিরুদ্ধে। নীল চাষীদের বিদ্রোহ ছিল অত্যাচারী নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে। এদের অত্যাচার সম্পর্কে নীলদর্পন, নামে একটি নাটক লেখেন দীনবন্ধু মিত্র যা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। কিন্তু ১৮৫৭ থেকে শুরু সিপাহি বিদ্রোহে বেশ কিছু সংখ্যক রাজা ও নবাব যোগ দেওয়ায় ইংরেজ শাসনের শিকড়ে টান পড়ে। হিন্দু মুসলমানের এই সম্মিলিত লড়াই ‘মহাবিদ্রোহ’ বা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধে হিসাবে স্বীকৃতি। দুপক্ষের রক্তাক্ত লড়াইয়ে অনেক রক্ত, অনেক মৃত্যু। শেষ পর্যন্ত ইংরেজের সমর শক্তির কাছে বিদ্রোহীদের হার।

ইংরেজ শাসকের বিভেদনীতি
এ ঘটনার পর থেকে ইংরেজ শাসক বুঝে ফেলে যে হিন্দু-মুসলমান একত্র তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে সমস্যা বাড়বে বই কমবে না। তাই তাদের নীতি হয়ে দাঁড়ায় ‘ভাগ কর’ ‘শাসন কর’। অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা, কোনো না কোনো উপলক্ষে। ইংরেজ ভারত ছাড়ার আগ পর্যন্ত এই বিভেদনীতিই পালন করে চলেছে।
তাছাড়াও হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ছিল ধর্মীয় আচারের পার্থক্য। আর বঙ্গদেশে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ছিল সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য। জমিদারদের অধিকাংশ এবং মহাজনরাই হিন্দু। আর বিশাল গরিব কৃষকদের প্রায় সবাই মুসলমান। শিক্ষিত মুসলমানের সংখ্যা কম। এই সব কারণে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক খুব একটা ভালো ছিল না। আর বাংলা ভাগ (১৯০৫) উপলক্ষে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গাও দেখা দেয়। তা সত্তে¡ও এরা একদেশে একসঙ্গে বসবাস করেছে।
মূলত ইংরেজদের ক‚টনীতি ও ষড়যন্ত্রের কারণে হিন্দু-মুসলমান রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দুই ভিন্ন পথ ধরে চলতে থাকে। ইংরেজ এ কাজে প্রথম হিন্দুদের এবং পরে মুসলমানদের সাহায্যে করে। তাদের পরামর্শে প্রথম গঠিত হয় হিন্দু প্রধান জাতীয় কংগ্রেস (১৮৮৫)। পরে মুসলমানদের জন্য পৃথক রাজনৈতিক সংগঠন ‘মুসলিম লীগ’ (১৯০৬)। এটি গঠনের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করা।
কারণ শুরুতে হিন্দু-মুসলমান শিক্ষিত শ্রেণি একত্রে বাংলা ভাগের বিরুদ্ধ রুদ্ধে দাঁড়ায়। প্রথমে এই ভাগ কেউ চায় নি। এ উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ অনেক স্বদেশী গান লিখেছিলেন। সেগুলো ছিল সবার খুব পছন্দের। ‘আমার সোনার বাংলা’ সেগুলোর মধ্যে একটি। এ গান পরে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসাবে বেছে নেওয়া হয়।

তিন

হিন্দু-মুসলমানের বিভেদের পেছনে আরো কারণ ছিল। যেমন হিন্দু সমাজের নানা বাদবিচার রক্ষণশীল আচারপ্রথা। আর শাসকদের দুমুখো নীতির কারণে বিশ শতকে ভারতের স্বাধীনতার লড়াইয়ে মুসলমান শিক্ষিত শ্রেণি সামান্যই অংশ নিয়েছে। ইংরেজবিরোধীরা বিপ্লবী তরুণদের প্রায় সবাই হিন্দু সম্প্রদায়ের। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলনে অবশ্য কিছু সংখ্যক মুসলমান নেতা যোগ দিয়েছিলেন। তবে জেল-জুলুম, দীপান্তর, ফাঁসি এসব ঘটেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিন্দু স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ক্ষেত্রে। ব্যতিক্রম কিছু সংখ্য মুসলমান।
মুসলিম লীগ বরাবরই শাসকদের সঙ্গে আপোষরফা করে সুবিধা আদায় করে নিতে চেয়েছে। তাদের নেতারা স্বাধীনতা-লড়াইয়ে বড় একটা অংশ নেয় নি। ইংরেজ তাদের তাই সুবিধা দিয়েছে। যেমন হিন্দু-মুসলমানের জন্য আলাদা নির্বাচন। মুসলিম লীগ এবং ভেদনীতির সবচেয়ে বেশি সুযোগ নিয়েছে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আমলে। অর্থাৎ তিরিশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে, যখন থেকে তিনি মুসলিম লীগের সভাপতি। ১৯৩৫ সালে ইংরেজ শাসক ভারতে সাম্প্রদায়িক শাসন বিধি চালু করে। তাতে ছিল মুসলমানদের জন্য বিশেষ সুবিধা।
এদিকে জিন্নাহর পরিকল্পনায় ১৯৪০ সনে মুসলিম লীগের লাহোর সম্মেলনে ভারতীয় মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর মূল বিষয় হল পশ্চিম ভারতের মুসলমান প্রধান পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে স্বাধীন অঞ্চল গঠন। আর পূর্বে বঙ্গদেশ ও আসাম নিয়ে একই রক মুসলমান প্রধান অঞ্চল বা রাষ্ট্র গঠন। পরে জিন্নাহ সাহেবের নির্দেশে এই দুই স্বাধীন অঞ্চলকে এক করে ফেলা হয়। নাম পাকিস্তান। ‘লাহোর প্রস্তাব’ পরিচিত হয়ে ওঠে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামে।
মুসলমানদের আলাদা রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব বিশেষভাবে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে খুব সাড়া জাগায়। কারণ তারা প্রতিবেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের তুলনায় শিক্ষা, চাকরি এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক পিছিয়ে ছিল। তাই তারা চেয়েছে আলাদাভাবে নিজেদের উন্নতি করতে। কিন্তু পাকিস্তান গঠন করতে হলে ভারতবর্ষকে ভাঙতে হয়। এ প্রস্তাব ভারতীয় হিন্দু সম্প্রদায় মানতে চায় নি। অবশ্য কিছু সংখ্যক মুসলমান নেতাও দেশ ভাগের পক্ষ ছিল না। রাজনৈতিক দিক বিচারে তাদের পরিচয় ‘জাতীয়তাবাদী মুসলমান’। বঙ্গে এদের সংখ্যা ছিল কম।
জিন্নাহর ভারত ভাগ ও পাকিস্তান
জাতীয় কংগ্রেস (১৮৮৫ সনে গঠিত) হিন্দু-মুসলমানের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হলেও এতে ছিল হিন্দুত্ববাদীদের অত্যাধিক প্রভাব। ছিল জমিদারদের যথেষ্ট প্রভাব। তাই তারা কৃষক-প্রজাদের স্বার্থের দিকে বড় একটা নজর দেয় নি। অনেক মুসলমান নেতা এসব কারণে কংগ্রেস ছেড়ে মুসলিম লীগে যোগ দেয়। এভাবে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ বাড়তে থাকে। মাঝে মাঝে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও দেখা দেয়।
আগেই বলা হয়েছে, এ অবস্থায় জিন্নাহ ভারতীয় মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেন। এ প্রস্তাবের পেছনে তার বক্তব্য ছিল, হিন্দু-মুসলমান দুটো আলাদা জাতি। তারা নামাদিক থেকে ভিন্ন। তাদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক স্বার্থও ভিন্ন। তাই তাদের আলাদা বসবাস করাই উচিত। জিন্নাহর এ বক্তব্য নীতি হিসাবে দ্বিজাতিতত্ত¡ নামে পরিচিত।
কিন্তু জাতিবিষয়ক বিধানের বিচারে এ তত্ত¡ ছিল ভুল। কারণ ধর্মীয় সম্প্রদায় ও জাতি এক বিষয় নয়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ও জিন্নাহর প্রচারের কারণে ভারতীয় মুসলমান, বঙ্গীয় মুসলমান এসব আদর্শগত দিক নিয়ে চুলচেরা বিচার করে নি। তারা আপাত বিচারে মুসলমান স্বার্থের দিকটাই বড় করে দেছেছে। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের মতো গুরুত্বর ঘটনাকে তারা গুরুত্ব দেয় নি।
পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির বড় দুর্বলতা হল এর দুই অংশ অর্থাৎ পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে হাজার মাইলেরও বেশি ব্যবধান। তাছাড়া ছিল ভাষার পার্থক্য। খাওয়া-দাওয়া, পোষাক ও আচার ব্যবহারসহ অনেক পার্থক্য। একমাত্র মিল ধর্ম বিশ্বাসে। প্রসঙ্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, মুসলিম লীগের মূল নেতা প্রায় সবাই ছিল উর্দুভাষী। তারা বাঙালিদের পছন্দ করতো না।
কংগ্রেসের আপত্তি সত্তে¡ও ইংরেজ শাসকদের সমর্থনে জিন্নাহর পক্ষে পাকিস্তান প্রস্তাব কার্যকর করা সম্ভব হয়। প্রচন্ড দাঙ্গা হাঙ্গামা ও রক্তপাতের মধ্য দিয়ে অনেকের ইচ্ছা ও অনেকের আপত্তির টানাপড়েনে ইংরেজ শাসকের ক‚টনীতিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়। তাদের আরেক ক‚টচালে এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে পাঞ্জাব এবং বঙ্গদেশকেও ভাগ করা হয় হিন্দু প্রধান ও মুসলমান প্রধান অঞ্চল বিচার করে। বিভক্ত এ দুই প্রদেশের নাম যথাক্রমে পূর্ব ও পশ্চিম পাঞ্জাব, পূর্ব বঙ্গ ও পশ্চিম বঙ্গ।
কিন্তু অদ্ভুত ঘটনা হল এ বিভাগে জিন্নাহর মূলনীতি রক্ষিত হয় নি। পাকিস্তানে শুধু মুসলমানই নয়, থেকেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান। যেমন বিভক্ত ভারতে থেকে গেছে কয়েক কোটি মুসলমান। অথচ জিন্নাহ তাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন যে, তারা সবাই হবে পাকিস্তানের অধিকাসী। বাস্তবে তা সম্ভব ছিল না। এসব নানা কারণে পশ্চিমা পÐিতগণ, বিশেষ করে এক মার্কিন রাষ্ট্র বিজ্ঞানী পাকিস্তানের পরিচয় তুলে ধরেন ‘অদ্ভুত রাষ্ট্র’ হিসেবে। কথাটা মিথা ছিল না।
ভারতবর্ষের এই অদ্ভুত বিভাজনের ফলে দেশের মুসলমান প্রধান পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বে পূর্ববঙ্গ নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান। পরে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয় আসামের সিলেট জেলা। ভারতবর্ষের হিন্দু-প্রধান বিশাল অংশ নিয়ে গঠিত হয় ভারত (পাকিস্তানিদের ভাষায় ‘হিন্দুস্তান’)। প্রথমটির ঘোষণা দেওয়া হয় ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্টে, দ্বিতীয়টির ১৫ আগস্টে। এই তারিখ দুটি দুই দেশের প্রতিষ্ঠা দিবস। এ সময় ভারতের ইংরেজ শাসনকর্তা (ভাইসরা) ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। তিনি ছিলেন অতিশয় চতুর একজন রাজনীতিবিদ ও কুশলী প্রশাসক।
ভাগ হল ভারতবর্ষ। ভাগ হল এর সেনাবাহিনী ও বিষয়সম্পদ। মুসলিম লীগের অবাঙালি নেতারা সবাই চলে গেলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। পশ্চিমবঙ্গে কর্মরত চাকরিজীবী ও শিক্ষিত শ্রেণির অনেকে চলে এলেন পূর্ববঙ্গে। এলো মোহাম্মদের নামে বাস্তুত্যাগী বিহারীরা। করাচি হল পাকিস্তানের রাজধানী আর দিল্লি ভারতের। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ হলেন পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল। আর প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান।
বৈষম্যের হেরফের নেই
বাঙালি মুসলমান স্বপ্ন দেখেছিল পাকিস্তানে তাদের অবস্থার দ্রæত উন্নতি হবে। শিক্ষিত বাঙালির স্বপ্ন দ্রæত আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন। কৃষকের স্বপ্ন জমিদার মহাজনদের শাসন-শোষন থেকে মুক্তি এবং আর্থিক অবস্থার উন্নতি। বাঙালি ব্যবসায়ীদেরও একই রকম স্বপ্ন।
পাকিস্তানে প্রস্তাবের একটি বিষয় এবং ভারতে জিন্নাহর রাজনৈতিক দরকষাকষির প্রধান দিক ছিল প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক স্বায়তশাসন। কিন্তু পাকিস্তান হাতে পেয়ে জিন্নাহ সেসব উল্টে দিলেন। তিনি এবং মুসলিম লীগের বড় বড় নেতা সবাই বলতে শুরু করেন প্রাদেশিকতা পাকিস্তানের জন্য অভিশাপ। যারা প্রাদেশিক স্বায়তশাসনের কথা বলে তারা পাকিস্তানের দুশমন।
অন্যদিকে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে উন্নয়ন, শিল্প কারখানা স্থাপন, শিক্ষা ও অন্যান্য খাতে দেখা দিতে থাকে লাগাতার বৈষম্য। বড় ব্যবসা, বাণিজ্যে ও দেখা গেল অবাঙালিদের একচেটিয়া অধিকার। পশ্চিম পাকিস্তানে তো বটেই ঢাকা-চট্টগ্রামে স্থাপিত নতুন শিল্প কারখানার মালিক প্রায় সবাই অবাঙালি ধনিকশ্রেণি। পূর্ববঙ্গের প্রশাসনের উচ্চপদে অধিকাংশই অবাঙালি, উর্দুভাষী। এসব ঘটনা শিক্ষিত বাঙালি মুসলমানের মনে ক্ষোভ তৈরি করতে থাকে।
বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্যের অধিকাংশই উন্নয়নখাতে ব্যয় করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ববঙ্গের সম্পদ পাট, চা ইত্যাদি থেকে আয়ের বড় অংশ ব্যয় করা হতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের অবস্থান হয়ে ওঠে মৌন। কারিগর শিক্ষায়ও পিছিয়ে পড়ে পূর্ববঙ্গ। গোটা পূর্ববঙ্গে তখন একটি মাত্র মেডিকেল কলেজ, একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানে একাধিক কারিগরি কলেজ। ক্রমে পিছিয়ে পড়তে থাকে পূর্ববঙ্গ। এ প্রদেশটি কার্যত হয়ে ওঠে পাকিস্তানের একটি উপনিবেশ, শোষনের কেন্দ্রস্থল।
প্রথম আন্দোলন : ভাষা আন্দোলন
এমনটি ভাবেনি বাঙালি। বিশেষ করে শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান। তবু পাকিস্তানের প্রতি বাঙালির আস্থা সহজে নষ্ট হয় নি। এর একটি কারণ ধর্মবিশ্বাসের মিলÑ অর্থাৎ আমি মুসলমান, তুমি মুসলমান। কাজেই একে অন্যের ক্ষতি করবে না। স্বার্থ নষ্ট করবে না। রানীতি ও রাষ্ট্র বিভাগের সূত্রমতে এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং শ্রেণিগত স্বার্থই সবচেয়ে বড় বিষয়। পাকিস্তানে বাঙালি অবাঙালি স্বার্থের দ্ব›েদ্ব সেটাই সত্য প্রমাণিত হয়।
বাঙালি আবার খাদে পড়ে। সাহিত্যের ভাষায় ‘কড়াই থেকে উনুনে। এক সময় ক্ষতিপূরণ দিয়ে জমিদার প্রথা তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু জোরদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণ বন্ধ হয় নি। বন্ধ হয় নি বড় ব্যবসায়ীদের মুনাফাবাজি। পূর্ববঙ্গে চাল, চিনি, লবণ, কেরোসিনের বড়সড় ঘাটতি দেখা যায়, দামও বেড়ে যায় বহুগুণ। তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থা ভালোই লক্ষ্য করা যায়।
সবার চোখে সব কিছু ধরা না পড়লেও শিক্ষিত শ্রেণির একাংশে এসব বৈষম্য নজর এড়াই না। তাই অর্থনীতিকরা কেউ কেউ বলতে থাকেন : ‘এক পাকিস্তানে দুই অর্থনীতি সম্পর্কে অবশ্য এসব ঘটেছে অনেক পরে। শুরুতে বৈষম্যের কিছু আলামত শিক্ষিত বাঙালির কারো কারো চোখে পড়ে। তাদের স্বার্থে টান পড়ায় তাদের মনে অসন্তোষ দেখা দিতে থাকে। কারো মনে প্রশ্ন : এ কোন্ পাকিস্তান পেলাম ?
তারা ভাবতে পারে নি আঘাত এত দ্রæত আসবে। এবং আসবে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে, বাঙালির মাতৃভাষা বাংলার উপর। ঘটনা অবশ্য শুরু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিছু সময় আগে। পাকিস্তানি এক নেতা বলেন, যে পাকিস্তান হতে যাচ্ছে তার একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। শুনে ক্ষুব্ধ জনাকয় লেখক-সাংবাদিক। তারা এর বিরুদ্ধে প্রবন্ধ লেখেন। আর ১৯৪৭-এর সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে বেশ কিছু প্রবন্ধ লেখা হয়। তমদ্দুল মজলিম পুস্তিক প্রকাশের মাধ্যমে প্রশ্ন তোলে : ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা, না উর্দু’। নানা উপলক্ষে ছাত্র ও সরকারি কর্মচারীদের একাংশ অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে সভা, সমাবেশ ও মিছিল করে। ¯েøাগান ওঠে : ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’।
রাষ্ট্রভাষা বাংলা নিয়ে এমন এক প্রতিবাদী ধারাবাহিকতায় শুরু হয় ১৯৪৮-মার্চের ভাষা আন্দোলন। পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে ব্যবহারিক ভাষা হিসাবে বাংলাকে গ্রহণ করার প্রস্তাব আনেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। যে প্রস্তাব বাতিল হওয়ায় ঢাকায় শুরু হয় ১১ মার্চে ভাষা আন্দোলন। আর তা ছড়িয়ে পড়ে পূর্ববঙ্গের একাধিক শহরে।
এখানেই শেষ নয়। ১৯৪৮ সালের ১৯-এর মার্চ ডাকায় আসেন জিন্নাহ সাহেব ঢাকা এসে তিনি ২১ ফেব্রæয়ারি রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ কার্জন হলে বক্তৃতায় বলেন যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হবে। কার্জন হলে ছাত্রদের কেউ কেউ প্রতিবাদ জানায়, অন্যরা চুপ করে থাকে।
১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ ফেব্রæয়ারিÑ এ সময়ের মধ্যে নানা উপলক্ষে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সভা-সমাবেশ মিছিলে ¯েøাগান : রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’ পুলিশি জুলুম চলবে না’ ‘আরবি হরফে বাংলা চলবে না’ ইত্যাদি। তার রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সারা পূর্ববঙ্গব্যাপী স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক তীব্র আন্দোলন শুরু হয় বায়ান্নর একুশে ফেব্রæয়ারি থেকে।
একুশে ফেব্রæয়ারি ঢাকায় বিক্ষোভরত ছাত্রজনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের ফলে সেদিন রফিক-জব্বার-বরকতসহ একাধিক জনের মৃত্যু ঘটে। প্রতিক্রিয়া আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে গোটা পূর্ববঙ্গে। পরদিন ঢাকায় ছাত্র আন্দোলনে গণআন্দোলনে পরিণত হয়। সেদিনও গুলিতে নিহত সফিউর-আউয়াল-ওলিউল্লাহ-সিরাজুদ্দিন এরা সবাই ভাষা শহীদ। এদিনের বিশেষ ¯েøাগান : ‘শহীদস্মৃতি অমর হোক’।
শহীদস্মৃতি অমর করে রাখতে ঢাকায় মেডিকেল হোস্টেল প্রাঙ্গণে মেডিকেল ছাত্রদের চেষ্টায় ২৩-এ ফেব্রæয়ারি রাতে তৈরি হয় শহীদস্মৃতি স্তম্ভ। তৈরি হয় রাজশাহীসহ দেশের একাধিক শহরে।

তিন

একুশের ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতিকে অনেক কিছু দিয়েছে। এনেছে সাহিত্য-সাংস্কৃতি ও রাজনীতি ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন। এবং তা ১০৫২ সাল থেকেই। যেমন দেখা যায় ১৯৫২ আগস্টে কুমিল্লা শহরে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনে। দেখা গেল ১৯৫৩-৫৪ সালে রাজনীতি ক্ষেত্রে সরকার বিরোধী যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং নির্বাচনে তাদের একচেটিয়া বিজয় ও হক সাহেবের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা গঠনে।
সাহিত্যে পরিবর্তন ঘটে আধুনিকতায় ও প্রগতিশীলতায়। বিশেষ করে একুশের কবিতা, গান বা নাটক রচনায়। একুশে নিয়ে স্বরনিকা প্রকাশিত হতে থাকে বছরের পর বছর। সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনারও প্রকাশ। ১৯৫৩ ফেব্রæয়ারিতে কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত সংকলন, ‘একুশে ফেব্রæয়ারি’ একটি নমুনা।
আর রাজনীতি ক্ষেত্রে পরিবর্তনটা বেশ বড়, যদিও তা বাস্তব ক্ষেত্রে স্থায়ী হয় নি। কিন্তু এর প্রভাব পড়েছে পরবর্তী সময়ের রাজনীতিতে। অর্থাৎ দেখা দিয়েছে গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, সেই সঙ্গে প্রগতিবাদী চরিত্রও। যেমনটা উপরে বলা হয়েছে।
যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন উপলক্ষে অনেক দাবি দাওয়া নিয়ে তৈরি করা হয় একুশে দফার ইশতেহার। সেই ঐতিহাসিক একুশ দফায় ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি, ছিল বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণার জন্য বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি। তবে বিশেষভাবে ছিল পূর্ববঙ্গের উন্নতির জন্য প্রাদেশিক স্বায়তশাসনের দাবি। আর ছিল সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য অনেক রকম দাবি দাওয়া।
কিশোরদের, তরুণদের জানা দরকার যে অত্যাচারী মুসলিম লীগ দলকে ভোটে হারানোর জন্য যে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয় তার প্রধান দুই নেতা শের-ই-বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তাদের স্বাক্ষরেই যুক্তফ্রন্ট গঠন। তাতে যোগ দেন আরেক প্রধান আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই তিন নেতাকে তখন সংক্ষেপে ডাকা হতো ‘হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী’ নামে।
একুশের আন্দোনের বড় দুটো ঘটনা আমাদের জাতীয় জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে। যে প্রভাব আমরা এখনো দেখি। যেমন একুশে ফেব্রæয়ারির রক্তঝরা আন্দোলনের স্মরণে পালিত হয় প্রতি বছর ওই দিনটি ‘শহীদ দিবস’ হিসাবে। ‘শহীদ দিবস’ একই সঙ্গে শোক দিবস এবং প্রতিবাদের দিবসও। অনেক অনেক পরে (১৯৯৯ সালে) জাতিসংঘের একটি সংস্থা ইউনেস্কো একুশে ফেব্রæয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিেেব ঘোষণা দেয়। তাই এ দিনটি নিয়ে আমাদের অনেক গর্ব ও অহংকার। এখনো শহীদ দিবস একইভাবে পালিত হয়।
আর একুশে ফেব্রæয়ারি পুলিশের গুলিতে নিহতদের স্মরণে তখন ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে শহীদ মিনার তৈরি হয়। সে কথা মনে রেখে ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮’র মধ্যে ঢাকায় তৈরি করা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। অনেক ভাড়া গড়ার মধ্যে দিয়ে এ শহীদ মিনার এখন একটি জাতীয় প্রতীক হিসাবে পরিচিত। মূলত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্রস্থল এখন এই শহীদ মিনার। রাজনীতির ক্ষেত্রে এর অনেক গুরুত্ব।
সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক ঘটনাবলী
একুশে, শহীদ দিবস, শহীদ মিনার, যুক্তফ্রন্ট এসব বিষয় পাকিস্তানি শাসকদের কখনো ভালো লাগে নি। তারা ভেবেছে, বাঙালি বুঝি আলাদা হতে চায়। তাই তারা ১৯৯৪ সালের ৩০ মে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা অন্যায়ভাবে বাতিল করে দিয়ে পূর্ববঙ্গে গর্ভনের শাসন জারি করে। চলে ব্যাপক হারে গ্রেফতার এবং জেল জুলুম।
এসব যখন চলে তখন পূর্ববঙ্গের গভর্নর পদে জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা। ইনি ছিলেন মূর্তি প্রকৃতির সেনা কর্মকর্তা। কিন্তু ছাত্রসমাজ তার শাসনের প্রতিবাদ করতে ভয় পায় নি। ছাত্রদের দেখাদেখি রাজনৈতিক নেতারাও ধীরে সুস্থে প্রতিবাদে মাঠে নামেন।
অগত্যা ১৯৫৫ সালে কেন্দ্রীয় শাসন তুলে নিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার। গঠিত হয় ফজলুল হক সাহেবের দল কৃষক-শ্রমিক পার্টির পক্ষ থেকে আবু হোসেন সরকারকে মূখ্য মন্ত্রী করে নতুন মন্ত্রী সভা। আবার পূর্ববঙ্গে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে। রাজনীতি ক্ষেত্রেও তাই। এ সময়েই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত গড়া হয়।

চার

কিন্তু পূর্ববঙ্গে গণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি শাসকদের ষড়যন্ত্র কখনো বন্ধ হয় নি। তারা নানাভাবে চেষ্টা করেছে পূর্ববঙ্গকে দমিয়ে রাখতে। করেছে নানা ষড়যন্ত্র। সেসব ষড়যন্ত্রের কারণে যুক্তফ্রন্ট ভেবে ঙায়। হক সাহেবের দল কে এমপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হয়। চলে প্রতিযোগিতা।
কেএমপির পর পূর্ববঙ্গে শাসন ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। মুখ্যমন্ত্রী হন আতাউর রহমান খান। এ সময়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার গড়ার কাজ শুরু হয়। কিন্তু তা শেষ করা যায় নি সামরিক শাসনের কারণে।
আবার কেন্দ্রীয় ষড়যন্ত্র, এবার বড়সড় ধরনের। ইস্কান্দার মীর্জা ও পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি আইয়ুব খানের নেতৃত্বে ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে সারাদেশে সামরিক শাসন জারি করা হয়। এ ঘটনার পেছনে অবশ্য মূল নায়ক আইয়ুব খান। আবার শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়, জেলজুলুম ও নির্যাতন।
আইয়ুব খান এ সুযোগে নানা ছলচাতুরির মাধ্যমে দেশ শাসন করে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান আইয়ুব খান। আর পূর্ববঙ্গে গভর্নর আইয়ুবের এক মোসাহেব মোনেম খান। আইয়ুব-মোনেমের শাসন মেনে নেয় নি পূর্ববঙ্গের ছাত্রসমাজ। তারাই প্রথম এবং বরাবর প্রতিবাদ জানাতে থাকে। পরে রাজনৈতিক নেতারা মাঠে নামে।
ধীরে ধীরে শুরু হয় আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন। কিন্তু সেনাবাহিনীর শক্তিতে আইয়ুব খান যথাসাধ্য চেষ্টা চালায় তার শাসন ক্ষমতা ধরে রাখতে। ছলে-বলে কৌশলে। দীর্ঘসময়ে ঘটে অনেক রাজনৈতিক ঘটনা। যেমন আওয়ামী লীগ ভেঙে ভাসানীর সভাপতিত্বে ১৯৫৭ সালে গঠিত হয় নতুন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। মোনেম খাঁ’র কুশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ রাজনীতিতে ঝড় তোলে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনারও দ্রæত বিকাশ ঘটে। সেই সঙ্গে প্রগতিশীল রাজনীতি ও সংস্কৃতি চর্চা।
গণআন্দোলন ও সাধারণ নির্বাচন
ষাটের দশকের দুটো বড় ঘটনা দুই বিখ্যাত রাজনৈতিক নেতা ফজলুল হক ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু। আওয়ামী লীগের তখন হালভাঙা অবস্থা। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ভাসানী চলে গেছেন দল ছেড়ে। অন্যদিকে দ্বিতীয় নেতা সোহরাওয়ার্দীর বিদেশে হঠাৎ করেই মৃত্যু। এ অবস্থায় দলে একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার আবির্ভাব।
আওয়ামী লীগের দুই প্রধান নেতার অবর্তমানে দলের হাল ধরেন তরুণ জননেতা শেখ মুজিবুর রহমান। একুশের প্রভাব, একুশ দফায় প্রাদেশিক স্বায়তশাসন দাবি, ভাসানীর একাধিক স্বাধিকার, ঘোষণার মধ্যে দিয়ে ষাটের দশকে পূর্ববঙ্গে স্বশাসনের দাবিটি সামনে চলে আসে। জাতীয়তাবাদী নেতা শেষ মুজিবুর রহমান এই দাবিটিকে তার ভবিষ্যত রাজনীতির মূল বিষয় হিসাবে বেছে নেন। আর সেই ভিত্তিতে শুরু হয় তার বিখ্যাত ছয় দফার আন্দোলন (১৯৬৬)।
পাকিস্তানি শাসনে সৃষ্ট পূর্বাক্ত বৈষম্যের কারণে ছয় দফা এবার অতি দ্রæত বাঙালি শিক্ষিত সমাজে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফল শাসক পক্ষে শুরু হয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর জেল-জুলুম নির্যাতন। কিন্তু আন্দোলন নামে না। ভয় পেয়ে যায় আইয়ুব সরকর। শুরু করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (১৯৬৮)। এ মামলার প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমান। সেই সঙ্গে নৌবাহিনীর বাঙালি কর্মকর্তা, এমনক জনাকয় বাঙালি আমলা।
এটা ছিল আইয়ুবের সবচেয়ে বড় ভুল। বাঙালি এ মামলা মেনে নেয় নি। বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ তৈরি করে ১১ দফার দাবিনামা। এখানে শিক্ষাবিষয়ক দাবির পাশাপাশি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হয় স্বায়তশাসন বিষয়ক একাধিক দাবি। ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলন একাকার হয়ে জনসমর্থনের কারণে গণঅভ্যুথানের চরিত্র অর্জন করে। ভাসানী আন্দোলন ১৪ দফা দাবিনামা। এক পর্যায়ে ভাসানী গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন। পিছু হটে সরকার। বাতিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। মুক্তি পান শেখ মুজিবসহ অভিযুক্ত বন্দীগণ। শেখ সাহেব জাতীয় নেতার মর্যাদায় অভিষিক্ত হলেন। তাকে দেওয়া ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি। এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়ই আইয়ুব খানের পতন যে কথা ইতিপূর্বে বলা হয়েছে।
সত্তরের নির্বাচন ও সরকারি প্রতিক্রিয়া
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া অবশ্য তার কথা রেখেছিলেন। তার ধারণা ছিল না পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আইয়ুব-মোনেম কুশাসনে কতটা বিস্ফোরক চরিত্র অর্জন করেছে, বাঙালি চেতনার কতটা ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। তাই দ্বিধা না করে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর। পাকিস্তান এমনই এক স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়ায় যে এর শাসকশ্রেণি জনগণের দাবি একটি সাধারণ নির্বাচন দিতে ২৩ বছর সময় কাটিয়ে দেয়।
এ নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে পূর্ব পাকিস্তানের উপক‚লীয় অঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণীঝড় হয়। তাতে বহু লক্ষ লোকের মৃত্যু ঘটে। অসংখ্য ঘরবাড়ি হাওয়ায় উড়ে যায়। এখানে গ্রীন কাজে কেন্দ্রীয় সরকারের উদাসিনতা মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
এ উপলক্ষে পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসভায় ভাসানীর জ্বালাময়ী ভাষণ এবং ‘ওরা কেউ আসে নাই’ এই ঘোষণার বার বার উচ্চারণ উপস্থিত মানুষের মনে দাগ কেটে যায়। গভীর প্রভাব রাখে বাঙালি ভোটারদের মনে। নির্বাচনের ফলাফল মানুষের জন্যেই ছিল। শুধু জানা ছিল না শাসকদের। এ নির্বাচন ছিল প্রাদেশিক আইন সভার এবং জাতীয় পরিষদের। দুই ক্ষেত্রেই আওয়াম লীগের একচেটিয়া বিজয়। পতন মুসলিম লীগের।
আর পশ্চিম পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) জয়ী হয় ৮৮টি আসনে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের মোট আসন সংখ্যা ১৬৭। এবার তাই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা গঠনের ক্ষমতা আওয়ামী লীগের হাতে চলে আসে। তা ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানের ভুট্টোবিরোধী জাতীয়তাবাদী প্রগতিবাদী চেতনার দলগুলোরও সমর্থন ছিল আওয়ামী লীগের প্রতি। কারণ ওরা সামরিক শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।

দুই

কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক শাসকশ্রেণি বাঙালির এ বিজয়, নির্বাচনের এ ফলাফল মেনে নিতে তৈরি ছিল না। বিশেষ করে চরমপন্থী সেনানায়কগণ ছিল এর প্রবল বিরোধী। কারণ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রে ক্ষমতায় এলে প্রাদেশিক স্বায়তশাসনের দাবি (ছয় দফা) সামনে চলে আসবে। তার চেয়েও বড় বিপদ সামরিক বাহিনীর বিলাসী জীবনযাত্রার অনুক‚ল বিশাল বাজেট হ্রাস পেতে পারে।
তাই সেনানায়কেরা, সামরিক রাজনীতিবিদগণ এ বিষয়ে সবাই এমন ষড়যন্ত্রে একমত হয় যে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসতে দেওয়া যাবে না। থাকে না শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দেওয়া। আরও একজন এ বিষয়ে কয়েক পা এগিয়ে। উচ্চাকাক্সিক্ষ এ রাজনীতিকের নাম সংক্ষেপে ভুট্টো। তার বড় স্বপ্ন, যদি কোনো কায়দায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া যায়। থাকুক না সেখানে ষড়যন্ত্র ও প্রতারণা।
তাই সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত মেলাতে ভুট্টোর পক্ষে অসুবিধা ছিল না। ক‚টবুদ্ধিতেরও চতুর চক্রান্তে ভুট্টোর কোনো তুলনা ছিল না। তাই জেনারেলগণ তার চতুর হাতের মুঠোয় চলে আসে। এমনকি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানও ভুট্টোর চালে মাত হয়ে যান। কারণ নতুন সরকারে ইয়াহিয়াকে প্রেসিডেন্ট পদে রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া শেখ সাহেবের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াও আওয়ামী লীগ বিরোধী ষড়যন্ত্রের জালে জড়িয়ে পড়েন। নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে বাঙালিদের আনন্দ-উল্লাস শাসক ও সমরনায়কগণ ভালো চোখে দেখে নি।
এবার শুরু হয় প্রকাশ্যে এবং প্রধানত গোপনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের খেলা। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এ খেলার মধ্যমনি। পেছনে থেকে কলকাঠি নাড়া এবং প্রকাশ্যে নানা আইনি চতুরতার খেলায় ভুট্টো সিদ্ধ হস্ত। একই সঙ্গে তাকে এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে টেক্কা দেওয়া আওয়ামী লীগ নেতাদের পক্ষে সহজ ছিল না। বিশেষ করে শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রকাশ্য ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে। গোটা বিষয়টিই ছিল এক ধরনের চতুর, নির্মম খেলা, যাতে সামরিক শাসক ও স্বৈরাচারী বেসামরিক শাসকগণ অভ্যস্ত।
ইতিপূর্বে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ঘোষণা ছিল তেসরা মার্চ (১৯৭১) ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে প্রাথমিক আলোচনার উদ্দেশ্য। এর মধ্যে কোনোরকম ইঙ্গিত ছাড়াই হঠাৎ করে পয়লা মার্চ প্রেসিডেন্টের ঘোষণা : রাজনৈতিক নেতাদের মতভেদ দূর করে আরও আলাপ-আলোচনার সুযোগ করে দিতে জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হল।
প্রতিক্রিয়া প্রতিবাদী দিনগুলো
অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণায় বাঙালি জনতার প্রতিক্রিয়া কতটা তীব্র হতে পারে সে সম্বন্ধে ইয়াহিয়াদের কোনো ধারণা ছিল না। দূরে ঠাÐাঘরে বসে জনগণের মেজাম মর্জির সঠিক খবর রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে দূরত্ব যদি হাজার মাইলেরও অধিক হয়। আর গোয়েন্দা সংস্থা যদি জনতার নাড়ীর খবর ঠিকঠাক মতো খবর রাখতে না পারে।
ঘটনা দুই পক্ষে এমনই ছিল। কারণ আওয়ামী লীগের মূল নেতাদেরও বোধ হয় জন-উম্মাদনা সম্বন্ধে সঠিক ধারণা ছিল না। ছাত্র ও জনতা রাজপথে মিছিলে শরিক হয়ে যে উত্তাপ সঞ্চয় করেছিল তার প্রকাশ ঘটে অনেকটা বিস্ফোরণের মতো করেই। বেতারে ঘোষণাটি শোনার পরপরই মানুষের প্রতিক্রিয়ার ধরনটি ছিল অবিশ্বাস্যরকম উন্মাদনার।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *