হুমায়ূন আহমেদ, ‘জোছনার প্রতি ভালোবাসা’

কিংবদন্তি শিল্প¯্রষ্টা হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন একজন চাঁদে পাওয়া মানুষ। জোছনা তাকে প্রবলভাবে গ্রাস করেছিল। চাঁদের আলো উপভোগ করার জন্য তিনি সারাটা জীবন নানা পাগলামি করেছেন। পানিতে জোছনা কেমন ফোটে সেটা দেখার জন্য এক রাতে বিলের ওপর বানানো টংঘরে ছিলেন। মাঝরাতে সেই টংঘর পানিতে পড়ে গিয়ে প্রায় জীবনসংশয় হয়েছিল তার। সমুদ্রের জলে জোছনার খেলা দেখার জন্য সেন্টমার্টিনে বাড়ি কিনেছিলেন। গাজীপুরে নিজের তৈরি নন্দনকাননে বহুবার জোছনা উৎসব করেছেন। বিদেশেও জোছনা উপভোগ করার জন্য বহু কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন। এমনকি হুমায়ূন মৃত্যু কামনা করেছেন চান্নি পসর রাইতে। সংগত কারণেই তার শিল্পসৃষ্টিতেও নানাভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে জোছনা। অন্য কথায়, হুমায়ূন আহমেদের গল্প-উপন্যাস, নাটক, চলচ্চিত্র এবং গানে জোছনার প্রবল উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এই বিষয়টিই এই রচনায় উঠে আসবে।
১.
শুরুতে হুমায়ূনের জীবনের কথা বলা যাক। তার মাঝে জোছনা প্রোথিত করেছিল তার নানাজানের একজন কামলা। আলাউদ্দিন। চাঁদনি পসর রাত তার অত্যন্ত প্রিয় ছিল।এই প্রসঙ্গে হুমায়ূনের ভাষ্য হলো: “আমাকে জোছনা দেখাতে শিখিয়েছে আলাউদ্দিন। রূপ শুধু দেখলেই হয় না। তীব্র অনুভূতি নিয়ে দেখতে হয়। এই পরম সত্য আমি জানতে পারি মহামূর্খ বলে পরিচিত বোকাসোকা একজন মানুষের কাছে।”( এই আমি, হুমায়ূন আহমেদ, কাকলী প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৬, পৃ.২৯)
আলাউদ্দিন এক জোছনা রাতে নৌকা করে হুমায়ূনকে বড় গাঙে নিয়ে গিয়েছিল। তখন অবশ্য নদীর ওপর চাঁদের ছায়া দেখে তেমন অভিভূত হন নি হুমায়ূন। কিন্তু আলাউদ্দিনকে দেখা গিয়েছিল মহাখুশি। সে আকাশের দিকে চেয়ে চাঁদের আলো খাওয়ার ভঙ্গি করছিল।
অবশ্য জোছনা হুমায়ূনের অবচেতনে গেঁথে গিয়েছিল শৈশবেই। সেটিও নানাবাড়ি থাকা অবস্থায়। একদিন রাতে তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। মাকে ডেকে তুলে জানিয়েছিলেন তার ঘুম আসছে না। কোলে করে মাঠে হাঁটলে ঘুম আসবে। শুনে মা তো ভীষণ বিরক্ত। পাখা দিয়ে মার দিতে উদ্যত হলেন। খালারা ওই যাত্রায় তাকে বাঁচালেন। তিন মামা তখন কোলে করে মাঠে নিয়ে গেলেন। হাঁটতে হাঁটতে গল্প বলতে লাগলেন। সেই সময় আকাশভরা ছিল ফকফকা জোছনা। মাঠভর্তি জোছনার ফুল।
সেই জোছনার ফুল সত্যিকার অর্থে হুমায়ূনকে মুগ্ধ করেছিল আরও কিছুদিন পরে, যখন তিনি বালক। পরিবারের সঙ্গে থাকেন সিলেটের মীরাবাজারে। তখন এক গভীর রাতে তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। দেখেছিলেন, মশারির ভেতর ঠিক তার চোখের সামনে একটি ফুল ফুটে আছে। বিস্ময়, ভয় ও আনন্দে তখন তিনি চেঁচিয়ে উঠেছিলেনÑএটা কী ? তার চিৎকারে বাড়িসুদ্ধ মানুষ জেগে উঠেছিল। তারপর ? হুমায়ূন লিখেছেন: “বাবা আমার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, জোছনার আলো ঘরের ভেন্টিলেটর দিয়ে মশারির গায়ে পড়েছে। ভেন্টিলেটরটা ফুলের মতো নকশা কাটা। কাজেই তোমার কাছে মনে হচ্ছে মশারির ভেতর আলোর ফুল। ভয়ের কিছুই নেই, হাত বাড়িয়ে ফুলটা ধরো।” (আমার ছেলেবেলা, হুমায়ুন আহমেদ রচনাবলী, ১ম খÐ, পৃ. ৫১২)
এর পরে হুমায়ন জোছনার মুখোমুখি হয়েছিলেন একাত্তরের আগুন-ঝরা এক সময়ে, যখন তার বাবাকে পাকিস্তানি মিলিটারিরা মেরে ফেলেছে, তাকে এবং তার ছোটভাই জাফর ইকবালকে খুঁজে বেড়াচ্ছে তারা। সেই ভয়ংকর সময়ে পিরোজপুর শহর থেকে পনের-ষোল মাইল দূরে গোয়ারেখা গ্রামে রাতে জোছনা তাদের সামনে স্বপ্নদৃশ্য রচনা করে। অথচ তখন তাদের মধ্যে কোনো স্বপ্ন ছিল না।
চাঁদে-পাওয়া মানুষেরা পৃথিবীর যেখানেই যাক না কেন, চাঁদ তাদের পিছু ছাড়ে না। হুমায়ূনও বিদেশের নানা প্রান্তে জোছনাকে উপভোগ করেছেন। যেমন প্রথম যৌবনে আমেরিকার আইওয়া থেকে ট্রেনে চড়ে তিনি যাচ্ছিলেন সানফ্রান্সিসকো। সেই ট্রেন আবার দোতলা ট্রেন। দোতলায়ই বসার ব্যবস্থা। সেখানে দুটি বিশাল কামরা ছিল অবজারভেশন ডেক। পুরো দেয়াল কাচের। চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। হুমায়ূনও দেখেছিলেন। সেদিন ছির জোছনা রাত। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। প্রেইরির প্রান্তর ভেদ করে ট্রেনটি ছুটছিল ঝড়ের গতিতে। নিঝুম রজনীতে হুমায়ূনের সামনে ছিল আদিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। মাঠের ওপর ফিনিক ফোটা জোছনা।

আরেকবার আমেরিকার নর্থ ডাকোটা থেকে গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন সিয়াটলে। পথে রাত্রি যাপনের জন্য মন্টালায় থামলেন। চারদিকে পাহাড়ঘেরা সমতলভূমি। হোটেলে পৌঁছে বাচ্চাদের শুইয়ে বাইরে এসে দাঁড়াতেই তিনি ধাক্কা খেলেন। দেখলেন আকাশে রুপার থালার মতো পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। অপূর্ব জোছনা। সেই জোছনা ভেঙে আলো-আধারির অপূর্ব নকশা তৈরি হয়েছে পাহাড়ের গায়ে। সেই সুন্দরের মুখোমুখি হয়ে তিনি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
এভাবে এক জীবনে বহুভাবে জোছনাকে তিনি দেখেছেনÑশান্ত পানিতে জোছনা, ভয়ংকর সমুদ্রে জোছনা, বনের ভেতর জোছনা, বরফঢাকা প্রান্তরে জোছনা, পাহাড়ের গায়ে জোছনা…। শুধু বাকি ছিল মরুভূমিতে জোছনা। সেই জোছনা দেখার জন্য একবার ভারতের রাজস্থানে গেলেন, গোবি মরুভূমিতে। কিন্তু চাঁদের দিন-ক্ষণ হিসাব করে যান নি বলে জোছনা দেখা হলো না। তবে মরুভূমিতে জোছনা হুমায়ূন ঠিকই দেখলেনÑ আমেরিকার নাভাদা স্টেটের মাহজি ডেজার্টে, যেখানে রয়েছে ‘ভ্যালি অব ডেথ’। সেই মৃত্যু উপত্যকায় ভয়াবহ মরুভূমির মধ্যে তিনি দেখলেন জোছনা। অন্য ধরনের জোছনা। সম্পূর্ণ আলাদা এক জোছনা। যে জোছনা মানুষের ভেতর শূন্যতা ও হাহাকার জাগিয়ে তোলে। তীব্র ভয়ের এক অনুভূতি হয়। নিজেকে অসহায় লাগে। মরুভূমির সেই জোছনার কথা হুমায়ূন বলেছেন এভাবে: “আমি মাহজি ডেজার্টে জোছনা দেখছি। এই রূপের বর্ণনা করি সেই ক্ষমতা আমার নেই। কিছু কিছু দৃশ্য আছে যা বর্ণনায় ধরা পড়ে না, যাকে ধরতে হয় চেতনার উপলব্ধিতে। আমার সঙ্গে দামি ক্যামেরা আছে। হাজার চেষ্টাতেও আমি যেমন সেই রূপকে ধরতে পারব না, ঠিক তেমনি আমার সঙ্গে যেসব কলম আছে, তা দিয়েও আমি এই জোছনার বর্ণনা করতে পারব না। এত ক্ষমতা আমাকে দেওয়া হয় নি।…আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছি। চারদিকে চকচক করছে বালি। জোছনা বালিতে প্রতিফলিত হয়ে এক ধরনের বিভ্রম সৃষ্টি করছে। সমুদ্রসম বালুকারাশিতে আছে বিচিত্র সব ক্যাকটাস। ক্যাকটাসের গায়ে জোছনা পড়েছে। এদের গায়ের কাঁটাগুলো দিনের আলোয় এত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না, জোছনায় দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া উঠল। হাওয়ার সঙ্গে বালি উড়ছে, বলির সঙ্গে বালির গায়ে গায়ে জোছনা উড়ছে। যেন মরুভূমির হাওয়া এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় জোছনা উড়িয়ে নিযে যাচ্ছে।এই দৃশ্য পৃথিবীর নয়। এ এক অলৌকিক দৃশ্য।” (যশোহা বৃক্ষের দেশে. হুমায়ূন আহমেদ রচনাবলী, সপ্তম খÐ, অন্যপ্রকাশ. ঢাকা, পৃ. ৪৫০)
জোছনা যে সব সময় একা একা হুমায়ূন উপভোগ করেছেন তা নয়, কখনো দলবেঁধে সবাইকে নিয়ে জোছনা উৎসবে মেতে উঠেছেন, গাজীপুরে নিজের তৈরি নন্দন কাননে। তখন সেলিম চৌধুরীসহ তার পছন্দের শিল্পীরা গান গেয়েছে আর জোছনা গায়ে মেখে সেই গানের সঙ্গে তাল দিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ।
চাঁদে-পাওয়া এই মানুষটি চাঁদের মাটি দেখেন ১৯৭০ সালে, ঢাকায়, বাংলাদেশে। আমেরিকান অ্যাম্বেসিতে। আর সেই চাঁদের মাটি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখেছেন আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসির মিউজিয়ামে। যখন তিনি সেই চাঁদের পাথরে হাত রাখলেন, তার রোমাঞ্চ বোধ হলো। গভীর আবেগে চোখে পানি এসে গেল। কত না পূর্ণিমার রাতে মুগ্ধ চোখে চাঁদের দিকে চেয়ে তিনি বিস্ময় ও আবেগে অভিভূত হয়েছেন। সেই চাঁদের মাটি হুমায়ূন স্পর্শ করলেন। তার মনে হলো, ‘আমার এই মানবজীবন ধন্য’। ( মে ফ্লাওয়ার, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৮৩)

২.
এবার হুমায়ুনের সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া যাক, দেখা যাক সেখানে জোছনা কীভাবে রূপায়িত হয়েছে।
শুরুতে উপন্যাস প্রসঙ্গ। হুমায়ূনের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ বা উপন্যাস হলো ‘নন্দিত নরকে’। এখানে ‘নরক’ বলতে নি¤œমধ্যবিত্ত জীবনকে বলা হয়েছে এবং সেই জীবন মোটের ওপর খারাপ নয়। উপন্যাসের কথক খোকা। যে পরিবারের কথা বলা হয়েছে, সেই পরিবারের বড় ছেলে। তার জবানিতেই তার বাবা-মা, মানসিক প্রতিবন্ধী বড় বোন রাবেয়া এবং ছোট ভাই-বোনদের কথা উঠে এসেছে। উপন্যাসে হুমায়ূন জোছনার প্রসঙ্গ এনেছেন শেষ পর্যায়ে, যখন সৎ ভাই মন্টুর ফাঁসি হচ্ছে, যে নাকি বাবার বন্ধু মাস্টার কাকাকে হত্যা করেছে। কেননা সে টের পেয়েছিল মাস্টার কাকার দ্বারাই রাবেয়া গর্ভবতী হয়েছে।
জেলখানায় খোকা আর তার বাবা অপেক্ষা করছে মন্টুর জন্য, যখন তাদের জেলার মন্টুকে তুলে দেবেন। তারা মন্টুকে ঘরে নিয়ে যাবে।
তখন গভীর রাত। তাই খোকা দেখতে পাচ্ছেÑ“গাছের নিচে ঘন অন্ধকার। কী গাছ ওটা ? বেশ ঝাঁকড়া। অসংখ্য পাখি বাসা বেঁধেছে।…পেছনের বিস্তীর্ণ মাঠে ¤øান জ্যোৎ¯œার আলো। কিছুক্ষণের ভিতরই চাঁদ ডুবে যাবে।” (নন্দিত নরকে, হুমাযূন আহমেদ রচনাবলী, প্রথম খÐ, অন্যপ্রকাশ, ঢাকা, পৃ. ৬৫)
¤øান জোছনার আলোর মাঝে ঠান্ডা মেঝেতে বাবার সঙ্গে পাশাপাশি বসে খোকার মনে পড়ে, তাদের পরিবারের সবাই মাঝে মাঝে এমনই ঠান্ডা মেঝেতে বসে বাইরের জোছনা দেখত। তখন হা¯œাহেনা গাছে কী ফুলই না ফুটত! তাদের বাসার সামনে মাঠে একটি কাঁঠাল গাছ আছে। সেখানে অসংখ্য জোনাকি জ্বলত আর নিবত।
হ্যাঁ, সেই জোছনা দেখার মাঝে আনন্দ ছিল, যা এই জোছনায় নেই। এ যে রাতের মর্মান্তিক প্রহর।
এক সময় বাবা-ছেলের মাথার উপরের ঝাঁকড়া গাছ থেকে আচমকা অসংখ্য কাক কা কা করে ডেকে জেলখানার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। তখন পাঠকের আর বুঝতে বাকি থাকে না যে ম্টুর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। তখন “চাঁদ ডুবে গেছে। বিস্তীর্ণ মাঠের উপরে চাদরের মতো পড়ে থাকা ¤øান জ্যোৎ¯œাটা আর নেই।” ( নন্দিত নরকে, পূর্বোক্ত, পৃ. ৬৬)
হুমায়ূনের লেখা প্রথম উপন্যাস, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, যা পরে প্রকাশিত হয়েছিল। এই উপন্যাসটিও নি¤œমধ্যবিত্ত জীবন-কেন্দ্রিক। এখানে কথক আরেক খোকা। আর ওর বড় বোন রাবেয়া। এখানেও রয়েছে অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু। ছোট বোন রুনুর আত্মহত্যা। কেননা যার সঙ্গে তার প্রেম ছিল, বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, সে তাকে বিয়ে না করে ওর ছোট ঝুনুকে বিয়ে করে। রাবেয়াও এক স্কুলের চাকরি নিয়ে বাড়ি ছাড়ে ( কালো বলে তার বিয়ে হয় নি)। সেখান থেকে সে খোকাকে চিঠি লিখে। খোকা জানতে পারে রাবেয়া তার সৎ বোন। মায়ের আগের পক্ষের মেয়ে। রাবেয়া তার প্রকৃত বাবার কাছ থেকে কিছু দিন আগে অনেক টাকা পেয়েছে। মোটা অঙ্কের সেই টাকাটা রাবেয়া চেক মারফত খোকাকে পাঠাচ্ছে, যা কিছু দিন পরেই সে পেয়ে যাবে। তখন আর খোকার কোনো অভাব থাকবে না। টাকার জন্য ভাবতেও হবে না। এই পর্যায়ে জোছনার প্রসঙ্গ এনেছেন হুমায়ূন, যে জোছনার সঙ্গে খোকার কোনো সম্পর্ক নেইÑ“কোনো কোনো রাতে অপূর্ব জোছনা হয়। সারা ঘর নরম আলোয় ভাসতে থাকে। ভাবি, একা একা বেড়ালে বেশ হতো। আবার চাদর মুড়ি দিয়ে নিজেকে গুটিয়ে ফেলি। যেন বাইরের উথাল পাথাল চাঁদের আলোর সঙ্গে আমার কোনো যোগ নেই।” (শঙ্খনীল কারাগার, হুমায়ূন রচনাবলী, ১ম খÐ, পূর্বোক্ত, পৃ.১৩৪)
হ ুমায়ূনের আরেকটি হৃদয়স্পর্শী উপন্যাস ‘নির্বাসন’। এখানেও আমরা জোছনার করুণ ব্যবহার লক্ষ করি। এই জোছনা আনন্দ নয়, বিষাদে আক্রান্ত করে।
এই উপন্যাসের নায়ক আনিস। আর্মির লেফটেন্যান্ট ছিল। মুক্তিযুদ্ধে পাক আর্মির সঙ্গে যুদ্ধ সে আহত হয়। মেরুদÐে গুলি লাগে। সেই থেকে এক সময়ে পেরাপ্লেজিয়া হয়। কোমরের নিচ থেকে অবশ হয়ে পড়ে। চাচাত বোন জরিকে সে ভালোবাসে। জরিও। দুজনে ঘর বাঁধতে চেয়েছিল। কিন্তু আনিস পঙ্গু হয়ে পড়ায় তা আর সম্ভব নয়। সেই জরির আজ বিয়ে হয়ে গেল। অল্প বয়সে বিধবা হওয়া মারও অন্যত্র বিয়ে হয়েছে। সেই মাও তার সঙ্গে আজ দেখা করতে এসেছে। এক পর্যায়ে আনিস অসুস্থ হয়ে পড়ে। ইনজেকশন দিয়ে তাকে ঘুম পাড়ানো হয়। ঘুম থেকে এক সময় আনিস জাগে। একটি শিশু, টিংকুমণি, তার কাছে আসে। আনিসের গলা জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে। রাত গভীর হয়। বিয়ে বাড়ির আলোগুলি নিভে যেতে থাকে। বাগানের গোলাপ আর হা¯œুহেনা ঝাড় থেকে ভেসে আসে ফুলের সৌরভ। অনেক দূরে একটি নিশি পাওয়া কুকুর কাঁদতে থাকে। তারও অনেক পরে জোছনাকে দেখা যায়Ñ“আকাশে এক ফালি চাঁদ উঠল। তার আলো এসে পড়ল নিদ্রিত শিশুটির মুখে। জ্যো¯œালোকিত একটির শিশুর কোমল মুখ, তার চারপাশে কী বিপুল অন্ধকার! গভীর বিষাদে আনিসের চোখ জল এল। যে জীবন দোয়েলের, ফড়িংয়ের মানুষের সাথে তার কোনোকালেই দেখা হয় না”
( নির্বাসন, পূর্বোক্ত, পৃ.২১৬)
‘অন্যদিন’ উপন্যাসটি শেষ হয় জোছনার মধ্য দিয়ে। স্বপ্নের ভেতর জোছনা এবং বাস্তবেও জোছনা। অন্যদিকে আমেরিকার পটভূমিতে লেখা ‘সবাই গেছে বনে’-র শেষেও দেখা যায় জোছনার প্রসঙ্গ। তখন ভয়ংকর শীত। বরফে বরফে চারদিক ঢাকা। জনশূন্য পথঘাট। কিন্তু ঔপন্যাসিক জানাচ্ছেনÑ“একদিন এই দুঃসহ শীত শেষ হবে। আসবে উজ্জ্বল রোদ সামার। ছুটি কাটানোর জন্যে আমেরিকানরা গাড়ি নিয়ে আসবে হাইওয়েতে। মন্টানা, সল্ট লেক, ইয়েলো স্টোন পার্ক। কত কিছু আছে দেখবার। সামারের রাতগুলো এরা বনের ধারে তাঁবু খাটিয়ে কাটাবে। প্রচÐ জ্যোৎ¯œা হবে রাতে। যুবক-যুবতীদের বড্ড বনে যেতে ইচ্ছা করবে।” (সবাই গেছে বনে, হুমায়ূন আহমেদ রচনাবলী, দ্বিতীয় খÐ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৯৮)
‘ফেরা’ উপন্যাসে দেখতে পাই, ভাটি অঞ্চলের একটি গ্রামে বৃষ্টি মুখর এক রাতে সরকার বাড়িতে ঢুকে মতি মিয়া কানা নিবারনের গানে মগ্ন হয়ে গেল। সে ভুলে গেল অসুস্থ স্ত্রী শরিফা এবং তাকে ডাক্তার দেখানোর কথা। গান যখন থামল তখন অনেক রাত হয়েছে। মেঘ কেটে গিয়ে আকাশে পরিষ্কার চাঁদ উঠেছে। গাছের ভেজা পাতায় চকচক করছে জোছনা। মতি মিয়া ঘর থেকে উঠোনে নেমে অবাক হয়ে গেল। তার কাছে এই জোছনাকে অদ্ভুত লাগল। কিন্তু নিবারন সরকারকে জোছনা কোনো প্রভাবিতই করতে পারল না।
‘দূরে কোথায়’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ওসমান সাহেব। লেখক মানুষ। এক রাতে বারান্দায় হাঁটতে হাঁটতে আকাশে বিশাল চাঁদ দেখে তিনি বিষণœ হলেন। ভাবলেন, “শহরে জ্যো¯œা হয় না কথাটা ঠিক নয়। শহরের জ্যো¯œায় অন্য এক ধরনের বিষণœতা আছে। শহরের জ্যো¯œা পুরনো দুঃখের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।” ( দূরে কোথায়, হুমায়ূন আহমেদ রচনাবলী, চতুর্থ খÐ, পূর্রোক্ত, পৃ. ২২০)
এই ওসমান সাহেব কয়েক দিন পরে যখন গ্রামে গেলেন, তখন এক রাতে তার ঘুম ভেঙে গেল। প্রবল জোছনা তাকে বিভ্রান্ত করল। তার কাছে মনে হলো, চাঁদের আলো ওঠানামা করছে। ঘরের বন্যার জলের মতো থৈ থৈ জোছনা দেখে তার এটাও মনে হলো যে আকাশে দুটি চাঁদ উঠেছে। ওসমান একেবারে অভিভূত হয়ে গেলেন। এই জোছনাই আবার আরেক দিন ওসমান সাহেবের স্ত্রী রানুকে অদ্ভুত কষ্টে আক্রান্ত করল। কেন ? চাঁদের আলোয় ভেজা ছোট বোন অপলার সুন্দর মুখ এবং তাকে ঘিরে থরথর করে কাঁপা জোছনা দেখে ? নাকি বোনের হৃদয়ঘটিত সমস্যার স্বরূপ অনুভব করে? কে জানে!
‘শ্রাবণ মেঘের দিন’-এর কুসুমের গালেও জোছনা চকচক করে বিয়ের দিন। ফারাক হলো, অপলার হৃদয়ব্যথার উৎস কী তা রানু জানে। তবে কুসুমের কথা কেউ জানে না।
জোছনা অনেক সময় মানুষের মনকে দ্রবীভূত করে। তখন সাধারণ মানবীকেও মনে হয় দেবীর মতো। এক জোছনা রাতে ‘সাজঘর’-এর আসিফের তেমনটিই মনে হয়েছিল লীনাকে দেখে। এখন সেই লীনা তার স্ত্রী।
‘চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক’-এ জোছনার আবহ। এক জোছনা রাতে মাহিন, মজিদ এবং আলম নামের তিন যুবকের নানা কাÐকারখানার গল্প। অবশ্য শহরের মানুষেরা যে পূর্ণিমা-অমাবশ্যা নিয়ে মাথা ঘামায় না সেটিও লেখক জানান দেয়। পাঠকেরাও বুঝতে পারে ভালোভাবে যখন আলম সেদিন সন্ধ্যায় পূর্ণিমার ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে যথারীতি টিউশনি করতে যায়। জোছনা মজিদকেও প্রভাবিত করে না। তবে মাহিনকে করে। সে মজিদের দিকে চেয়ে বলে, কী মারাত্মক চাঁদ উঠেছে দেখেছিস নাকি রে মজিদ ? সে আরও বলে, সুকান্ত বেঁচে থাকলে এই চাঁদ দেখে আরেকটা বিপ্লবী কবিতা লিখে ফেলত। তবে জোছনা মজিদকে প্রভাবিত না করলেও এক অজানা-অচেনা-অদেখা বালিকার বিপদে মনে মনে বিচলিত হয়ে পড়ে। তার ধর্ষণকারীকে খুন করে সে। তারপর মজিদ ও আমেরিকা প্রত্যাগত মীর্জা সাহেব জোছনা-প্লাবিত শহরের রাস্তায় হাঁটতে থাকে। সেই সময় হুমায়ূন আহমেদ লিখছেনÑ“তারা হাঁটছে। ঘুমন্ত শহরের পথে জোছনার আলো। এই চাঁদের আলো বড় অদ্ভুত জিনিস। এই আলোয় চেনা পৃথিবী অচেনা হয়ে যায়। পিচঢালা কালো কঠিন রাজপথকে মনে হয় ভাদ্র মাসের শান্ত নদী।…তারা হাঁটছে। পায়ের নিচে নদী। মাথার ওপর অন্য এক রকম আকাশ। চারপাশে থই থই জোছনা। যে জোছনা মানুষকে পাল্টে দেয়। যে জোছনায় সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য বলে ভ্রম হয়।” ( চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক, হুমায়ূন আহমেদ রচনাবলী, সপ্তম খÐ, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৭৯)
এমনিভাবে মানুষের আনন্দ-বেদনা,মনস্তাত্তি¡ক ব্যাপার-স্যাপার এবং মানব মনের ওপর জোছনার প্রভাবসহ নানা অনুষঙ্গে হুমায়ূন জোছনাকে ব্যবহার করেছেন তাঁর গল্প-উপন্যাসে। এখানে হুমায়ূনের লেখা আরও কয়েকটি জোছনার বর্ণনা তুলে ধরছি :
ক.জোছনা প্রবল হয়েছে। বাড়ির পেছনের কামরাঙা গাছের ছায়া তাঁর গায়ে পড়েছে। কামরাঙা গাছের চিড়ল-বিড়ল পাতার ছায়া জোছনায় সুন্দরভাবে এসেছে। বাতাসে গাছ কাঁপছে। সিদ্দিকুর রহমান নিজের গায়ের ছায়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। (লীলাবতী, হুমায়ূন আহমেদ, অন্যপ্রকাশ, ঢাকা, পৃ, ৮১)
[এ উপন্যাস পাঠে পাঠক আরও একটি জিনিস জানতে পারেÑগৌতম বুদ্ধ আষাঢ়ি পূর্ণিমায়, এক জোছনা রাতে গৃহত্যাগ করেছিলেন। কেননা মানুষ যখন খুব সুন্দর জিনিস দেখে তখন বিচিত্র কারণে সবকিছু থেকে তার মন উঠে যায়।]
খ. বৈশাখ মাসের এক রাতের কথা। আকাশে নবমীর চাঁদ উঠেছে। শশী মাস্টারের টিনের চালে চাঁদের আলো পড়েছে। টিনের চাল ঝলমল করছে। বনভূমির ঝাঁকড়া সব গাছ মাথায় জোছনা মেখে দুলছে। সৃষ্টি হযেছে এক অলৌকিক পরিবেশ। (মধ্যাহ্ন, হুমায়ূন আহমেদ, অন্যপ্রকাশ, ঢাকা, পৃ. ৪৯)
গ. দিঘির ঘাটে হোসনা এবং নাদিয়া বসে আছে। তাদের গায়ে চাঁদের আলো পড়েছে। দিঘির ্এব কোনায় অনেকগুলি শাপলা ফুল ফুটেছে। এই ফুলগুলি বড় বড়। চাঁদের আলোয় ফুলের প্রতিবিম্ব পড়েছে পানিতে। বাতাসে ফুল কাঁপছে, প্রতিবিম্বও কাঁপছে। ( মাতাল হাওয়া, হুমায়ূন আহমেদ, অন্যপ্রকাশ, ঢাকা, পৃ. ১৭৫)
[জোছনার আলোর ভেতর বসে নাদিয়া হোসনা ওরফে পদ্মকে ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’ এই গানটি গাইতে বলে। কিন্তু পদ্ম সেই অনুরোধ রাখে না। এখানে হুমায়নের ভাষ্য হলো, মানুষের আবেগের সঙ্গে জোছনার কোনো সম্পর্ক নেই।]
এবার হুমায়ূনের একটি বিখ্যাত উপন্যাস ‘জোছনা ও জননীর গল্প’-এর কথা বলা যাক। এখানে জননী বলতে যে লেখক দেশ বা মাতৃভূমিকে বুঝিয়েছেন তা পাঠকরা সহজেই বুঝতে পারে। কিন্তু এখানে জোছনা কীভাবে প্রাসঙ্গিক ? এই প্রশ্নের উত্তর পায় সে বইটির শেষাংশে। যেখানে লেখক জানান কীভাবে এই ভূখÐ মুক্তিযোদ্ধাদের কবরে জোছনার মায়াবী পরশ বুলিয়ে দেয়: “বাংলার মাটি পরম আদরে তার বীর সন্তানদের ধারণ করেছে। জোছনার রাতে সে তার বীর সন্তানদের কবরে অপূর্ব নকশা তৈরি করে। গভীর বেদনায় বলে, আহারে! আহারে!” ( জোছনা ও জননী, হুমায়ূন আহমেদ, অন্যপ্রকাশ, ঢাকা, পৃ. ৫০৫)

৪.
হুমায়ূন আহমেেেদর মিসির আলি উপাখ্যানমালায় জোছনা খুব একটা নেই। কেননা মিসির আলি যুক্তিবাদী মানুষ। তিনি সব কিছুই যুক্তি দিয়ে বিচার করেন; ব্যাখ্যা করেন। ‘আমি এবং আমরা’ উপন্যাসটির কথাই ধরা যাক। এখানে চাঁদের আলোয় এক নগ্ন মানুষকে মিসির আলি দেখতে পান, যে নাকি মারা গেছে। তাহলে মিসির আলি যে দেখছেন! তিনি তখন নিজেকে বোঝান, এ তার দৃষ্টিবিভ্রম। হেলুসিনেশনের ফল। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, জোছনা কিন্তু মিসির আলিকে মুগ্ধও করে। কামরাঙা গাছের ফাঁক দিয়ে গলে পড়া জোছনা দেখে তার মনে হয় অসহ্য সুন্দর! তার এই মুগ্ধতার প্রকাশ দেখি আমরা ‘অন্যভুবন’ উপাখ্যানেও: “আকাশে চাঁদ থাকায় চমৎকার জোছনা হয়েছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে জোছনা ভেঙে ভেঙে পড়ছে। কী অপূর্ব দৃশ্য!” (জন্মদিনের উপহার, হুমায়ূন আহমেদ, অনন্যা, ঢাকা, পৃ, ৪০)
৫.
এবার হুমায়ুনের ছোটগল্পে দৃষ্টি দেওয়া যাক। আমরা দেখি সেখানে জোছনা কীভাবে এসেছে।
গল্পের নাম ‘নিশিকাব্য’। গল্পটি শুরুই হয়েছে জোছনার প্রসঙ্গ দিয়েÑ“পরী মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে বাইরে এসে দেখে চমৎকার জোছনা হয়েছে। চিকমিক করছে চারদিক।” এই জোছনা দেখে কিন্তু পরীর মন খারাপ হয়। কেন ? এর উত্তর গল্পে প্রচ্ছন্ন থাকলেও পাঠক বুঝতে পারে যে স্বামী আনিস তার কাছে থাকে না। চাকরির কারণে তাকে শহরে থাকতে হয়। কালেভদ্রে সে বাড়িতে আসে। যেমন এই জোছনার রাতে হঠাৎ সে উপস্থিত হয়ে সবাইকে চমকে দেয়। তখন তার স্বজনদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। সবাই ভীষণ খুশি হয়।
আনিসের বিদায় বেলায দেখা যায়, জোছনা ফিকে হয়ে এসেছে। আর পরীর গায়ে বিয়ের শাড়ি দেথে যখন তার ননদ ঝুনু হঠাৎ প্রশ্ন করে , তখন পরীকে অহেতুক লজ্জার হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই যেন একখÐ মেঘের আড়ালে নিজের সকল জোছনা লুকিয়ে ফেলে চাঁদ।
চিঠির আঙ্গিকে লেখা একটি গল্প ‘কল্যাণীয়াসু’। এখানেও জোছনার প্রসঙ্গ নানাভাবে এসেছে। জোছনা যে মানুষের মনে গভীর আবেগ সৃষ্টি করে, সেটিও উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তম পুরুষে লেখা গল্প ‘শঙ্খমালা’। এই গল্পের পটভূমি গভীর রাত। আর সেই রাতে ছিল জোছনা। জোছনার আলোয় নিজেদের বাড়িঘর দেখে গল্পের কথক ছোটনের মনে হয়, কত দিনের চেনা ঘরবাড়ি কেমন অচেনা। সেই জোছনা রাতে ছোটন মায়ের মুখে পরীর আসার খবর পেয়ে তার বাড়ি যায়, যে নারীকে ওর বড়ভাই ভালবাসত, যার কারণে সে আত্মহত্যা করেছে। ছোটন বাড়ি ফিরলে মা যখন জানে, পরী কিছু বলে নি। তখন মৃত ছেলের শোক আবার নতুন করে জেগে ওঠে তার। তখন ছোটনের বাবা স্ত্রীকে কাছে টেনে কপালে চুমু খান। সান্ত¦না জোগান। আর ভালোবাসার এই অপূর্ব দৃশ্য দেখে ছোটন জোছনার দিকে চেয়ে মনে মনে পরীকে ক্ষমা করে দেয়।
‘ফেরা’ গল্পে দেখা যায়, বাড়ির গৃহকর্তা রাতে ফিরে একটি বড় রুই মাছ নিয়ে। উপলক্ষ অফিসে তার বেতন বেড়েছে। সেই রুই মাছ রান্না হয়। আর সেটি নিয়ে পরিবারটি গভীর রাতে উৎসবে মেতে ওঠে।…খাওয়া-দাওয়া শেষে কলতলায় বাসন-কোসন রাখতে গিযে বাড়ির কর্ত্রী দেখেন, “মেঘ কেটে অপরূপ জ্যোৎ¯œা উঠেছে। বৃষ্টিভেজা গাছপালায় ফুটফুটে জ্যোৎ¯œা। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। অকারণেই তার চোখে জল এসে যায়।” ( ফেরা/ নিশিকাব্য, হুমায়ূন আহমেদ রচনাবলী, প্রথম খÐ, পূর্বোক্ত, পৃ, ৩৬৫)
‘এইসব দিনরাত্রি’-তে জোছনা প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। গ্রামের একজন শিক্ষক প্রণব বাবু লটারিতে দু’লক্ষ টাকা পেয়েছেন। স্কুলের অন্য শিক্ষকদের মন খারাপ। কারণ তিন মাস ধরে কেউ বেতন পান না। প্রণব বাবুও খুশিতে টগবগ করছেন না। বরং পত্রিকায় খবরটি পড়ে তিনি মরার মতো পড়ে ছিলেন।…বাড়িতে আসার কিছুক্ষণ পরে তার ছেলে সুবল এসে হাজির। তার কিছু টাকার দরকার। দু’মাস আগেও সে চিঠিতে টাকার প্রয়োজনের কথা লিখেছিল। কলকাতায় বিয়ে হওয়া প্রণব বাবুর মেয়ে অঞ্জুও চিঠিতে এক হাজার টাকা চেয়েছিল। এই মেয়ের অনেক কষ্টে বিয়ে হয়েছে। তার বর পছন্দ হয়েছে কিনা কেউ অবশ্য জিজ্ঞেস করে নি। মেয়েও কিছু জানায় নি। সেই মেয়েকে অনেক দিন ধরে দেখেন না বলে লক্ষপতি প্রণব বাবু নিঃস্ব মানুষের মতো কাঁদতে থাকেন। সুবল কিছু বুঝতে না পেরে বলে, সব ঠিক হযে যাবে। প্রণব বাবু ধরা গলায় বলেন, কিছুই ঠিক হয় না রে। এই কথা সমর্থন করেই যেন একটি তক্ষক ডেকে ওঠে। চারদিকে তখন মাছের মতো মরা জোছনা।
৬.
শিশুতোষ রচনায়ও হুমায়ূন তাঁর জোছনা-প্রীতির স্বাক্ষর রেখেছেন। ‘নীল হাতি’ নামে তার একটি ছোটদের উপন্যাস আছে। এখানে নীলু নামের এক বালিকার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে ওর বাবার বন্ধু আজীজ চাচার কথা। তিনি বেশ অদ্ভুত মানুষ। একবার নীলুর মা’র হাতে একটি তাবিজ দিয়ে জানিয়েছিলেন, এটি বালিশের নিচে রেখে ঘুমালে পূর্ণ চন্দ্রের জোছনা দেখতে পাবেন নীলুর মা। দেখবেন আকাশ পরীর দল নাচছে আর গান গাইছে।…আজীজ চাচা নানা রকম গল্পও জানেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের একজস বড় লেখক বিভূতিভূষণের গল্প করলেন, বললেন তিনি পরী দেখেছিলেন। আজীজ চাচা জোছনা রাতে আকাশ পরীদের দেখার উপায়ও বলে দিলেন নীলুকে। আরও বললেন আকাশ পরীরা এসে যখন নাচে আর গান গায়, তখন তাদের গান শুনে বাগানের সব ফুল ফুটতে থাকে। কিন্তু নীলুর ভাগ্যটাই খারাপ্ জোছনা রাতে তার অনেক ঘুম পেয়ে গেল। তাই আকাশ পরীদের দেখা হলো না। তবে বাগানে গিয়ে নীলু অবাক হলো। দেখল, অনেক ফুল ফুটে রয়েছে সেখানে। তাহলে কি নীলুর আমন্ত্রণে আকাশ পরীরা এসেছিল!
‘রানী কলাবতী’ গল্পে হুমায়ূন এক রানীর কথা বলেছেন। নাম তার কলাবতী। তিনি ভীষণ সুন্দরী। এই জন্য তার অহংকারও রয়েছে। একদিন জোছনা রাতে পুকুরের জলে চাঁদের প্রতিবিম্ব দেখে ‘বিশ্রী’ বলে সম্বোধন করলেন রানী। আরও বললেন, তার গায়ে এমন দাগ হলে তিনি জলে ডুবে মরতেন। এই কথা শুনে চাঁদের মন কারাপ হলো। আর রানীর সুন্দর মুখে দেখা গেল চাঁদের কলঙ্কের মতো বিশ্রী দাগ। এই দাগ দূর করার উপায় কেউ বের করতে পারল না। অবশেষে এক জ্ঞানবৃদ্ধ মন্ত্রীকে জানালেন, রানী যদি কখনো নিজের মন থেকে কখনো বলেন, তার মুখের দাগ যেমন আছে তেমন থাকুক. তাহলে দাগ আপনাআপনি মুছে যাবে। তারপর এক জোছনা রাতে রানী আবার গেলেন পুকুরের দিকে। এবার চাঁদের সৌন্দর্য দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন। আবিষ্কার করলেন, চাঁদের গায়ে কোনো দাগ নেই। বুঝতে পারলেন, চাঁদের কলঙ্কগুলো তার মুখে এসেছে। কিন্তু তারপরেও রানীর মন খারাপ হলো না। বরং তিনি চাইলেন, চাঁদ যেন এমন সুন্দরই থাকে। আর তার কলঙ্কগুলো রানীর মুখেই থাকুক। এ কথা শুনে চাঁদ তার কলঙ্ক আবার ফিরিয়ে নিল। পুকুরের জলে চেয়ে রানী দেখলেন, কী সুন্দর তার মুখ! আর তার পাশেই রুপার থালার মতো চাঁদ।
৭.
হুমায়ুন আহমেদের মঞ্চ ও টিভি নাটকেও প্রভিাত হয়েছে জোছনা। যেমন তার ‘নৃপতি’ মঞ্চনাটকের নৃপতি অর্থাৎ রাজা শীতকালে বসন্ত উৎসব করতে চায়। তখন আনন্দ-উল্লাস-গান হবে। আকাশভরা থাকবে জোছনা।…এই সময় হাজার হাজার মানুষ রাজপ্রাসাদের দিকে ছুটে আসে। তারা ভাত চায়, কাপড় চায়। অথচ রাজা প্রজাদের সেই শীতের রাতে পাঠিয়ে দেয় ভূষÐির মাঠে। রাজার মতে, “শীত হলেও ভূষন্ডির মাঠের দৃশ্য্র বড় চমৎকার। আকাশে চাঁদ আছে। ফুলে সৌরভ আছে। পাখির গান আছে। চারদিকে আনন্দ চিকমিক করছে। ওদের ভালোই কাটবে।” (নৃপতি, হুমায়ূন আহমেদ রচনাবলী, প্রথম খÐ, পূর্বোক্ত, পৃ.৫২৫)
রাজা প্রজাদের সমস্যার সমাধান করেন না। তাদেন দাবি মানেন না। অথচ এক চোরকে দেন এক শ’ একর জমি।
হুমায়ূন ‘নৃপতি’-তে এক জনবিচ্ছিন্ন স্বৈরাচারী শাসকের প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। উল্লেখ্য, নাটকটির মঞ্চায়ন ও গ্রন্থাকারে প্রকাশ কাল ১৯৮৬। তখন এদেশে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার ক্ষমতায় ছিল।
এক পর্বের এবং ধারাবাহিক বহু নাটকেও মূর্ত হয়ে উঠেছে হুমায়ূনের জোছনা প্রেম। ‘এইসব দিনরাত্রি’ ধারাবাহিকে দেখা যায়, জোছনা রাতে এক একান্নবর্তী পরিবারের সদস্যরা ছাদে জড়ো হয়েছে। নীলু ভাবি গান গাইছে, ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে।’ এমনিভাবে ‘অয়োময়’সহ বিভিন্ন টিভি নাটকে জোছনা রূপায়িত হয়েছে।
৯.
গানেও হুমায়ূন প্রকাশ করেছেন তার জোছনা-প্রীতি। আর তিনি প্রথম গান লিখেন ‘অয়োময়’ ধারাবাহিকের জন্য। কেননা ভাটি অঞ্চলের গান খুঁজে পাওয়া যায় নি। তখন হুমায়ূন গানের আঙ্গিক অর্থাৎ স্থায়ী, সঞ্চারি এবং অন্তরা কী বুঝতেন না। কিন্তু তিনি সব কিছুই দ্রæত শিখে ফেলতে পারতেন। গানের ব্যাকরণও আয়ত্ত করেন তাড়াতাড়ি।
‘অয়োময়’-এর জন্য হুমায়ূন বহু গান লিখেছিলেন। এর মধ্যে দুটি গানে রয়েছে জোছনার প্রকাশ। গান দুটি হলো, ‘আসমানে উইঠাছে চান্দি’ এবং ‘তোমার কাছে একটা জিনিস/ চাই গো দয়াময়,/ আমার মরণ চান্দি পসর/ রাইতে যেন হয়।’
সুন্দর অর্থাৎ জোছনা কখনোই ধরা দেয় না। এটি বড় সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে হুমায়ূনের লেখা এই গানে: ‘আমার ভাঙা ঘরের ভাঙা চালা ভাঙা বেড়ার ফাঁকে/ অবাক জোছনা ঢুইকা পড়ে হাত বাড়াইয়া ডাকে।’
জোছনার অনুষঙ্গে মৃত্যুদূতের কথা বলেছেন হুমায়ূন একটি গানেÑ‘চাঁদনি পসরে কে আমারে স্মরণ করে/ কে আইসা দাঁড়াইছে গো আমার দুয়ারে।’ তবে তিনি নিজের লেখা একটি গানকে অভিহিত করেছিলেন ‘মৃত্যুসঙ্গীত’ হিসেবে। গানটি হলো, ‘ও কারিগর, দয়ার সাগর, ওগো দয়াময়/ চান্নি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়।’ বলাই বাহুল্য, এইসব গানে নান্দনিকভাবে জোছনার প্রসঙ্গটি এসেছে।
লেখক: মোমিন রহমান

