উপন্যাসসাহিত্য

গৃহদাহ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


মহিমের পরম বন্ধু সুরেশ। একসঙ্গে এফ.এ পাস করার পর সুরেশ গিয়া মেডিকেল কলেজে ভর্তি হইল; কিন্তু মহিম তাহার পুরাতন সিটি কলেজেই টিকিয়া রহিল।
সুরেশ অভিমান-ক্ষুণœকণ্ঠে কহিল, মহিম, আমি বার বার বলছি, বি.এ; এম.এ পাস করে কোন লাভ হবে না। এখনও সময আছে, তোমরারও মেডিক্যাল কলেজেই ভর্তি হওয়া উচিত।
মহিম সহাস্যে কহিল, হওয়া উচিত, কিন্তু খরচের কথাটাও ত ভাবা উচিত।
খরচ এমনই কি বেশী যে, তুমি দিতে পারি না ? তা ছাড়া তোমার স্কলারশিপও আছে।
মহিম হাসিমুখে চুপ করিয়া রহিল।
সুরেশ অধীর হইয়া কহিল, না নাÑহাসি নয় মহিম, আর দেরি করলে চলবে না, তোমাকে এরই মধ্যে এ্যাডমিশন নিতে হবে, তা বলে দিচ্ছি। খরচপত্রের কথা পর বিবেচনা করা যাবে।
মহিম কহিল, আচ্ছা।
সুরেশ বলিল, দেখ মহিম, কোনটা যে তোমার সত্যকারের আচ্ছা, আর কোনটা নয়Ñতা আপ পর্যন্ত আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। কিন্তু পথের মধ্যে তোমাকে সত্য করিয়ে নিতে পারলুম না, কারণ, আমার কলেজের দেরি হচ্ছে। কিন্তু কাল-পরমুর মধ্যে এর যা-হোক একটা কিনারা না করে আমি ছাড়ব না। কাল সকালে বাসায় থেক, আমি যাব। বলিয়া সুরেশ তাহার কলেজের পথে দ্রæতপদে প্রস্থান করিল।
দিন-পনের কাটিয়া গিয়াছে। কোথায় বা মহিম, আর কোথায় বা তাহার মেডিক্যাল কলেজে এ্যাডমিশন লওয়া! একদিন রবিবারের দুপুরবেলা সুরেশ বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর একটা দীনহনি ছাত্রাবাসে আসিয়া উপস্থিত হইল। সোজা উপরে গিয়া দেখিল, সুমুখের একটা অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরের মেঝের উপর ছিন্ন-বিছিন্ন কুশাসন পাতিয়া ছয়-সাতজন আহরে বসিয়াছে। মহিম মুখ তুলিয়া অকস্মাৎ বন্ধুকে দেখিয়া কহিল, হঠাৎ বাসা বদলাতে হলো বলে তোমাকে সংবাদ দিতে পারি নি; সন্ধান করলে কি করে ?
সুরেশ তাহার কোন উত্তর না দিয়া থপ্ করিয়া চৌকাঠের উপর বসিয়া পড়িল এবং একদৃষ্টে ছেলেদের আহার্যের প্রতি চাহিয়া রহিল। অত্যন্ত মোটা চালের অন্ন, জলের মতো কি একটা দাল, শাক, ডাঁটা, এবং কচু দিয়া একটা তরকারি এবং তাহারই পাশে দু’টুকরা পোড়া পোড়া কুমড়া ভাজা। দধি নাই, দুগ্ধ নাই, কোনপ্রকার মিষ্ট নাই; একটুরা মাছ পর্যন্ত কাহারও পাতে পড়িল না।
সকলের সঙ্গে মহিম অ¤øান মুখে, নিরতিশয় পরিতৃপ্তির সহিত এইগুলি ভোজন করিতে লাগিল। কিন্তু চাহিয়া চাহিয়া সুরেশের দুই চক্ষু জলে ভরিয়া উঠিল। সে কোনোমতে মুখ ফিরাইয়া অশ্রæ মুছিয়া উঠিয়া দাড়াইল। সামান্য কারণেই সুরেশের চোখে জল আসিয়া পড়িত।
আহারান্তে মহিম তাহার ক্ষুদ্র শয্যার উপর আনিয়া বন্ধুকে যখন বসাইল, তখন সুরেশ রুদ্ধস্বরে কহিল, বার বার তোমার অত্যাচার সহ্য করতে পার না মহিম।
মহিম নিরীহভাবে জিজ্ঞাসা করিল, তার মানে ?
সুরেশ কহিল, তার মানেÑএমন কদর্য বাড়ি যে শহরের মধ্যে থাকতে পারে, এমন ভয়ানক বিশ্রী খাওয়াও যে কোনো মানুষ মুখে দিতে পারে, চোখে না দেখলে আমি কোনোমতে বিশ্বাস করতে পারতুম না। তা যাই হোক, এ জায়গার তুমি সন্ধান পেলেই বা কি রূপে, আর তোমার সাবেক বাসাÑতা সে যত মন্দই হোক, এর সঙ্গে তুলনাই হয় নাÑতাই বা পরিত্যাগ করলে কেন ?
বন্ধু-স্নেহ বন্ধুর বুকে আঘাত করিল। মহিম আর তাহার নির্বিকার গাম্ভীর্য বজায় রাখিতে পারিল না, আর্দ্রস্বরে কহিল, সুরেশ, তুমি আমার গ্রামের বাড়ি দেখনি; তা হলে বুঝতে, এ বাসায় আমার কিছুমাত্র ক্লেশ হ’তে পারে না। আর খাওয়াÑআরও পাঁচজন ভদ্রসন্ধান যা স্বচ্ছন্দে খেতে পারে, আমি পারব না কেন ?
সুরেশ উত্তেজিত হইয়া বলিল, এ কেনর কথা নয়। ভালোমন্দ জিনিস সংসারে অবশ্যই আছে। ভালো ভালোই লাগে, মন্দ যে মন্দ লাগে, তাতে আর সংশয় নেই। আমি শুধু জানতে চাই, তোমার এত দুঃখ করবার প্রয়োজন কি হয়েছে ?
মহিম চুপ করিয়া মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিলÑকথা কহিল না।
সুরেশ কহিল, তোমার প্রয়োজন তোমার থাক, আমি জানতে চাই না। কিন্তু আমার প্রয়োজন তোমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া। আমি গাড়ি ডেকে তোমার জিনিসপত্র এখনই আমাদের বাড়ি নিয়ে যাব। এখানে তোমাকে ফেলে রেখে যদি যাই, চোখে আমার ঘুম আসবে না, মুখে অন্ন রুচবে না। তোমাদের বাসার চাকরকে ডাক, একটা গাড়ি নিয়ে আসুক। এই বসিয়া সুরেশ মহিমকে টানিয়া তুলিয়া স্বহস্তে তাহার বিছানা গুটাইতে প্রবত্ত হইল। মহিম বাধা দিয়া টানা-হেঁচড়া বাধাইয়া দিল না। কিন্তু শান্ত গম্ভীরস্বরে বলিল, পাগলামি করো না সুরেশ।
সুরেশ চোখ তুলিয়া কহিল, পাগলামি কিসের ? তুমি যাবে না ?
না। কেন যাবে না ? আমি কি তোমার কেউ নেই ? আমার বাড়ি যাওয়ায় কি তোমার অপমান হবে ?
না।
তবে ?
মহিম কহিল, সুরেশ, তুমি আমার বন্ধু। এমন বন্ধু আমার আর নেই; সংসারে এমন আর কয়জনের আছে, তাও জানি না। এতকাল পরে এ বস্তু আমি একটুখানি দেহের আরামের জন্য খুইয়ে বসব, আমাকে কি তুমি এত বড়ই নির্বোধ পেয়েছ।
সুরেশ কহিল, বন্ধুত্ব জিনিসটি তোমার ত একার নয় মহিম। আমারও ত তাতে একটা ভাগ আছে। খোয়া যদি যায়, সে ক্ষতি যে কত বড়, সে বোঝবার সাধ্য আমার নেইÑআমি কি এতই বোকা ? আর এত সতর্ক-সাবধান, এত হিসাবপত্র করে না চললেই এ বন্ধুত্ব যদি নষ্ট হয়ে যায় ত যাক না মহিম! এমই কি তার মূল্য যে, সেজন্য শরীরের আরামটাকে উপেক্ষা করতে হবে ?
মহিম হাসিয়া বলিল, না, এবার হেরেছি। কিন্তু একটা কথা তোমাকে নিশ্চয় জানাচ্ছি সুরেশ। তুমি মনে করেছÑশখ করে দুঃখ সইতে আমি একানে এসেছি, তা সত্য নয়।
সুরেশ কহিল, বেশ ত, সত্য নাই হল। আমি কারণ জানতেও চাই নাÑকিন্তু যদি টাকা বাঁচানই তোমার উদ্দেশ্য হয়, আমাদের বাড়িতে এসে থাক না, তাতে ত তোমার উদ্দেশ্য মাটি হয়ে যাবে না।
মহিম ঘাড় নাড়িয়া সংক্ষেপে কহিল, এখন থাক সুরেশ। কষ্ট যদি সত্যই হয়, তোমাকে জানাব।
সুরেশ জানিত, মহিমকে তাহার সঙ্কল্প হইতে টলান অসাধ্য। সে আর জিদ না করিয়া একরকম রাগ করিয়াই চলিয়া গেল। কিন্তু বন্ধুর এই থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থাটা চোখে দেখিয়া তাহার মনের মধ্যে সূচ বিঁধিতে লাগিল।
সুরেশ ধনীর সন্তান, এবং মহিমকে সে অকপটে ভালবাসিত। তাহার অন্তরের আকাক্সক্ষা, কোনমতে, সে বন্ধুর একটা কাজে লাগে। কিন্তু মহিমকে সে কোনোদিন সাহায্য লইতেই স্বীকার করাইতে পারে নাইÑআজিও পারিল না।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
বছর-পাঁচেক পরে দুই বন্ধুতে এই রূপ কথাবার্তা হইতেছিল।
তোমার উপর আমার যে কত বড় শ্রদ্ধা ছিল মহিম, তা বলতে পারি না।
বলবার জন্য তোমাকে পীড়াপীড়ি করচি না সুরেশ।
সে শ্রদ্ধা বুঝি আর থাকে না।
না থাকলে তোমাকে দÐ দেবো, এমন ভয় ত কখনো দেখাই নি।
তোমাকে কপটতা দোষ দিতে তোমার অতি-বড় শক্রও কখনো পারত না।
শক্র পারত না বলে কাজটা যে মিত্রও পারবে না, দর্শন-শাস্ত্রের এমন অনুশাসন ত নেই।
ছি ছি, শেষকালে কিনা একটা ব্রাহ্মমেয়ের কাছে ধরা দিলে ? কি আছে ওদের ? ঐ শুকনো কাঠপানা চেহারা, বই মুখস্থ করে করে গায়ে কোথাও একফোঁটা রক্ত পর্যন্ত যেন নেই। ঠেলা দিলে আধখানা দেহ খসে পড়েছে বলে বয় হয়Ñগলার স্বরটা পর্যন্ত এমনি চিঁচিঁ করে যে যে শুনলে ঘৃণা হয়।
তা হয় সত্য।
দেখ মহিম, ঠাট্টা কর গে তোমাদের পাড়াগাঁয়ের লোককে, যে ব্রাহ্মমেয়ে কখনো চোখে দেখেনি; মেয়েমানুষ ইংরাজীতে ঠিকানা লিখতে পারে শুনলে যারা আশ্চর্য অবাক হয়ে যায়Ñতিনি চলে গেলে যারা সসম্ভ্রমে দূরে সরে দাঁড়ায়। বিস্ময়ে অভিভ‚ত করে দাও গে তোমার গ্রামের লোককে, যারা এঁকে দেব-দেবী মনে করে মাথা লুটিয়ে দেবে। কিন্তু আমাদের বাড়ি তো পাড়াগাঁয়ে নয়Ñআমাদের ত অত সহজে ভুলানো যায় না।
আমি তোমাকে শপথ করে বলচি সুরেশ, তোমাদের শহরের লোককে ভুলোবার আমার কোনো দুরভিসন্ধি নেই। আমি তাঁকে আমাদের পাড়াগাঁয়ে নিয়েই রাখব। তাতে ত তোমার আপত্তি নাই ?
সুরেশ রাগিয়া উঠিয়া বলিতে লাগিল, আপত্তি নেই ? শত, সহস্ত্র, লক্ষ, কোটি আপত্তি আছে। তুমি সমস্ত জগতের বরেণ্য পূজণীয় হিন্দুর সন্তান হয়ে কিনা একটা রমণীর মোহে জাত দেবে ? মোহ! একবার তার জুতো-মোজা শৌখীন পোশাক ছাড়িয়ে নিয়ে আমাদের গৃহল²ীদের রাঙ্গা শাড়িখানি পরিয়ে দেখ দেখি, মোহ কাটে কি না! তখন ঐ নির্জীব কাঠের পুতুলটার রূপ দেখে তোমার ভুল ভাঙ্গে কি না! কি আছে তার ? কি পারে সে ? বেশ ত, তোমার যদি সেলাই আর পশমের কাজই এত দরকার, কলকাতা শহরের দরজীর ত অভাব নেই। একখানা চিঠির ঠিকানা লেখবার জন্য ত তোমাকে ব্রাহ্মমেয়ের দ্বারস্থ হতে হবে না। তোমার অসময়ে সে কি বাটনা বেটে, কুটানো কুটে তোমাকে একমুঠো ভত রেঁধে দেবে ? রোগে তোমার কি সেবা করবে ? সে শিক্ষা কি তাদের আছে ? ভগবান না করুন, কিন্তু সে দুঃসময়ে সে যদি না তোমাকে ছেড়ে চলে আসে ত আমার সুরেশ নামের বদলে যা ইচ্ছে বলে ডেক, আমি দুঃখ করব না।
মহিম চুপ করিয়া রহিল। সুরেশ পুনরায় কহিতে লাগিল, মহিম, তুমি ত জান আমি তোমার মঙ্গল ভিন্ন কখনো ভুলেও অমঙ্গল কামনা করতে পারিনে। আমি অনেক ব্রাহ্ম-মহিলা দেখেছি! দু-একটি ভালও যে দেখিনি, তা নয়;

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *