জেলার খবরনেত্রকোনা

নেত্রকোণায় বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৫তম তিরোধান দিবস পালণ

বিশেষ প্রতিনিধি: নেত্রকোণা

বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৫তম তিরোধান দিবস গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর)। এ উপলক্ষে নেত্রকোণায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) আয়োজন করেন আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
বাংলা ১২৯৭ সালের পহেলা কার্তিক (১৬ অক্টোবর) সাধক লালন সাঁই এই ছেউড়িয়াতেই দেহ ত্যাগ করেন। নেত্রকোণা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এবার লালন তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

এই উৎসবে যোগ দিতে নেত্রকোণাসহ বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লালণ অনুসারীদের নিয়ে আসেন নেত্রকোণা জেলা প্রশাসন। স্থানীয় নৃত্য শিল্পী, লালণগীতির গায়কসহ ছুটে এসেছেন, লালন অনুসারী, সাধু-গুরু, বাউল ও ভক্তরা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে আলোচনা সভা শুরু হয়। এতে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য জনাব ফাহিম রহমাণ খান পাঠান, জানাপা-র কেন্দ্রীয় সংগঠক প্রীতম সোহাগ, বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্ববায়ক এস.এম মনিরুজ্জামান দুদু, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া হেলিম, বিশেষ আলোচক হিসেবে আলোচনা করেন জনাব তানভীর জাহান চৌধুরী, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুখময় বিশ্বাস ও নেত্রকোণা জেলার বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ মাহমুদ জামান।

আলোচনা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে সুমন সরকার অনিকের পরিচালনায় নৃত্য শিল্পীরা লালনের গানের সাথে দর্শকদের হৃদয় জয় করে নেন।
নৃত্যর পরেই শুরু একক গান নিয়ে বাউল সুমন টান দেন তার চিরাচরিত কণ্ঠে লালনের গান। তিনি দর্শকদের সামনে দুটি গান গেয়ে মাতিয়ে রাখেন পুরো পাবলিক হল ভবন।

পরের বার আবারও পল্লবী সাহার পরিচালনায় নৃত্য শিল্পীরা লালনে সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে গানটিতে পারফর্ম করে দর্শকদের হৃদয় জয় করে নেন।

অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের পাশাপাশি অজস্র দর্শকদের দেখা যায় আজ পাবলিক হলে। এ বিষয়ে রফিকুল ইসলাম শুভ জাতীয় নাগরিক পার্টির, প্রধান সমন্বয়কারী, মোহনগঞ্জ। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসক জনাব আব্দুল্লাহ মাহমুদ জামান স্যারের আজকের আয়োজনটি শুধু নেত্রকোণাতেই প্রথম নয়, আমার মনে হয় সারা বাংলাদেশেই এটি ১ম। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মহাত্মা লালন সাঁইজির তিরোধান অনুষ্ঠান পালণ যা আগে কখনো হয় নি নেত্রকোণা জেলায়।


জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জামান তাঁর বক্তব্যে বলেন-লালণের ধর্ম, বর্ণ, জন্ম নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও তাঁর সাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ও অসাম্প্রদায়িক মানুষ বিশ্বে লালণ একজনই। আমরা তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।
লালন ফকির কারো মতে একজন আধ্যাত্মিক বাউল সাধক। কারো মতে, মানবতার অন্তরালে সর্বেশ্বরবাদী সুফি সাধক, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক। লালন অসংখ্য অসাধারণ গানের সম্রাট , সুরকার ও গায়ক ছিলেন। লালনকে বাউল গানের অগ্রদূত বলা যায়। তাঁর গানের মাধ্যমেই উনিশ শতকে বাউল গান জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। তাকে বাউল গানের সম্রাট হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।

লালন ১৭৭২ সালে মতান্তরে ১৭৭৪ সালে নাটরের রানী ভবানির রাজ্যে কোথাও জন্মগ্রহণ করে ছিলেন এবং ১৮৯০ সালে তৎকালীন নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার কুমারখালীর ছেউড়িয়া গ্রামে নিজ প্রতিষ্ঠিত আখড়ায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্মস্থান ও ধর্ম পরিচয় নিয়ে আজও ঐক্যমত্য পৌঁছানো সম্ভব হয় নি। কারণ লালন কোন না কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ঘরে জন্ম নিলেও কোন রহস্যজনক কারণে অথবা তাঁর বিশ্বাস ও আদর্শগত কারণে নিজেকে কোন ধর্মীয় পরিচয়ে পরিচয় দেওয়া তাঁর কাছে সমীচীন মনে হয়নি। তাই হয়ত তিনি তাঁর জন্মগত ধর্মীয় পরিচয় গোপন করে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পনের দিন পর কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক হিতকারী পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, “ইহার জীবনী লিখিবার কোন উপকরণ পাওয়া কঠিন, নিজে কিছু বলতেন না। শিষ্যরা তাঁর নিষেধ ক্রমে বা অজ্ঞানতা বশত কিছুই বলিতে পারেন না।” কারো মতে, লালন শাহ বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের ভাড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমান কুমারখালী উপজেলা তখন ছিল একটি ইউনিয়ন।

লালন গড়াই নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠা ভাড়ারা গ্রামে এক হিন্দু পরিবারে জন্মাগ্রহণ করেন। তাঁরা বাবার নাম ছিল শ্রী মাধব কর আর মায়ের নাম ছিল শ্রীমতি পরাবতী বালন। লালন তাঁর বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলেন। শৈশবেই লালন তাঁর বাবাকে হারান। মায়ের আদর স্নেহে লালন বড় হয়ে উঠেন। পরিবারের প্রধান বাবা জীবিত না থাকায় পরিবারের দায় দায়িত্ব লালনের উপর বর্তায়। লালন তাঁর মায়ের সেবার জন্য অল্প বয়সেই বিয়ে করেন। পার্শ্ববর্তী আত্মীয় স্বজনদের সাথে বনিবনা না হওয়ার কারণে মা এবং স্ত্রীকে নিয়ে একই গ্রামে দাস পাড়ায় নতুন বসতি স্থাপন করেন। লালন সংসার চালাতে গিয়ে লেখাপড়া করতে না পারলেও শৈশব থেকেই তাঁর গান বাজনার সাথে সম্পর্ক ছিল। কারও মতে, লালন ছিলেন একজন মানবতাবাদী, যিনি ধর্ম বর্ণ গোত্র সকল প্রকার ধর্মের নামে জাতি-বিভেদ থেকে সরে এসে মানুষ, মানবতার অন্তরালে সনাতন ধর্মের অখ-বাদ, মোক্ষবাদ ও সর্বেশ্বরবাদী, অর্থবাদী সুফিবাদকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়ে ছিল। তাঁর গান ও দর্শন যুগে যুগে আকৃষ্ট করেছে বিখ্যাত লেখক, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী, ও বিজ্ঞজনকে। গান্ধীজীরও ২৫ বছর পূর্বে লালনকে মহাত্মা উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *