সোনালি পূর্ণিমা

নবীন সানি
সময়ের আলোচিত এবং জনপ্রিয় কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
কবিদের এক সংঠনের অনুষ্ঠানে- অতিথি হয়ে আসেন
-নবীন সানি
এই অনুষ্ঠানে এসে সোনালি দাশ নামের এক মেয়ের সাথে পরিচয় হয়-নবীন সানির।
মেয়েটি উচ্চ শিক্ষিত; সুন্দরী ও স্মার্ট- অসাধারণ কবিতা লেখে ও আবৃত্তি করে।
অনুষ্ঠানে ফাঁকে দুজনের আলাপ, পরিচয় ও একে অপরের
কাছাকাছি চলে আসা।
দুজনে দুজনার সাথে কথা বলে তারা বুঝতে পারে- তারা একই মানসিকতা ধারণ করে মনেপ্রাণে। উভয়েই উদার মনের-সাংষ্কৃতিক চেতনা ভেতরে লালন করার কারণে হিন্দু মুসলিম আর জাত পাতের ভেদাভেদ দুজনের মধ্যেই নেই একবারে।
তাই খুব অল্প সময়ের পরিচয়ে তারা খুব ঘনিষ্ট হয়ে ওঠে।
বেশ কয়েকদিন পরে হঠাৎ সোনালী দাশের ফোন-
‘আপনার কি সময় হবে?
আপনার সাথে দেখা করতে চাই?’
নবীন সানি উত্তর দেয়-
‘হ্যাঁ, সময় আছে।
কোথায় দেখা হবে?’
সোনালি বলে-
‘টিএসসিতে।’
টিএসসি’তে দেখা হয় দুজনের-
ওই সময়ে জগন্নাথ হলে স্বরস্বতি পূজা চলছিল।
গাঢ় হলুদ রঙের তাঁতের শাড়ি পড়েছে সোনালি। খোঁপায় থোকা থোকা গাঁদা ফুল। এই বসনে স্বরস্বতী দেবীকে অঞ্জলি দিতে যাবে সে। সত্যিই অসাধারণ লাগছে ওকে।
শাড়িতে সোনালীকে দেখে মুগ্ধ হয় নবীন সানি।
কি অনিন্দ্য সুন্দর বাঙালি ললনা শাড়িতে !
এক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে দেখে নবীন সানি।
সোনালি বলে-
‘আমার সাথে চলেন;
আপনাকে নিয়ে পূজা দেখবো।’
টিএসসি থেকে হেঁটে হেঁটে জগন্নাথ হলের ভেতরে মন্ডপে আসে ওরা। মাঘ মাস চলছে বেশ শীত পড়েছে। মাঘ মাসের ৫ম তিথিতেই এই স্বরস্বতী পূজা হয়।
সোনালি মন্দিরে ঢোকে। দেবীকে অঞ্জলি দেয়। পাশে দাঁড়িয়ে সোনালীর
অঞ্জলি দেওয়া দেখতে থাকে নবীন সানি ।
সোনালী মন্ত্র পড়ে-
‘নমো সরস্বতী মহাভাগে
বিদ্যে কমল লোচনে।
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী
বিদ্যাংদেহি নমো হস্তুতে।
জয় জয় দেবী চরাচর সারে,
কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।
বীনারঞ্জিত পুস্তক হস্তে,
ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।
সরস্বতীর স্তব।’
দেবী দেখা ও অঞ্জলি শেষ করে দুজনে এসে বসে- জগন্নাথ হলে শান বাঁধানো ঘাটের পাড়ে।
পূজার প্রসাদ ও মুড়ি মুরকি খায় ঘাটে বসে দুজনে।
পুকুরের পাড়ে পাশাপাশি বসে দুজনে একে অপরের ভাললাগা ও পছন্দের
বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে থাকে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত বেড়ে চলে কিন্তু দুজনের কথা শেষ না । এক সময় বুঝতে পারে অনেকটা রাত হয়ে গেছে। ঘরের দিকে পা বাড়ায় দুজনে।
এরপরে বারবার দুজনের এক হওয়া- লাঞ্চ, ডিনার খাওয়া, রাত জেগে ফোনে কথা বলা আর নিজেদের ভাল লাগা আদান প্রদানের মধ্য দিয়ে সোনালী দাশ নবীর সানি গভির প্রেমে পড়ে যায়।
তার ভালবাসা এতোটাই বেপরোয়া যে- কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে সে সরাসরি নবীন সানিকে বলে-
‘আমি আপনাকে বিয়ে
করতে চাই।

নবীন সানি প্রস্তুত ছিল না;
এই কথা শোনার জন্যে
অবাক হয়ে সে তখন
সোনালীকে উত্তর দেয়-
‘এ সম্ভব না;
আমার গার্ল ফ্রেন্ড আছে
তার নাম পূর্ণিমা
আমি তাকে ভালবাসি-
তার সাথে আমার বিয়ে হবে;
সে রোকেয়া হলে থাকে।’
সানির কথায় রেগে যায় সোনালি তোতলাতে তোতলাতে বলে-
‘আমি বিশ্বাস করি না;
আপনি মিথ্যে বলছেন।
আমাকে অ্যাভয়েড করার
জন্যে মিথ্যে বলছেন আপনি।’
সাথে সাথে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে কল করে পূর্ণিমাকে। দুজনের কথোপকথন সোনালীকে লাউড স্পিকারে পুরোটা শোনায় সানি। কিন্তু এর পরেও বিশ্বাস করে না সোনালী- নিজের ভালবাসার প্রতি অটুট থাকে।
একদিন ঝুম বৃষ্টি–
বেইলী রোডে শর্মা শপে বসে আছে- নবীন সানি ও সোনালী দাশ। শর্মা খেতে খেতে দুজনে বৃষ্টি দেখছে শপের কাচের জানালার ভেতর দিয়ে।
হঠাৎই নবীন সানি দেখে-
সামনে দাঁড়িয়ে তার প্রেমিকা পূর্ণিমা;
সানি বলে-
‘একি, পূর্ণিমা তুমি এখানে?
কখন এলে?’
পূর্ণিমার চোখে মুখে রাগের আগুণ।
চেঁচিয়ে প্রশ্ন করে-
‘কে এই অসভ্য মেয়ে?
তুমি এর সাথে এখানে কি করছো?’
পূর্ণিমার কথায় তেলে বেগুণে জ্বলে ওঠে সোনালী-
তার দিকে তেড়ে গিয়ে বলে-
‘হু দ্যা হেল ইউ আর?
ইউ আর এ ননসেন্স,
স্টুপিড, ইলিটারেট ওম্যান?
হাউ ডেয়ার ইউ আর?’
এক কথায় দুই কথায় তুমুল ঝগড়া আর মারামারিতে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে সোনাল আর পূর্ণিমা। লোকের ভিড় বাড়ে। চিৎকার চেঁচামেচিতে উপচে পড়ে শর্মা শপ।
দুজনকে শান্ত করার অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আস্তে শপ থেকে বেরিয়ে যায়-নবীন সানি।
সিদ্ধান্ত নেয় একলা চলার-
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে- তবে একলা চলো।
সোনালী পূর্ণিমা কেউই তার জীবনে অপরিহার্য নয়-
দুজনের কাউকেই বিয়ে করবে না;
সে খুঁজে নেবে অন্য কাউকে-
ভাসবে নুতন ভালবাসায়;
নতুন সিদ্ধানের দিকে পা বাড়ায় নবীন সানি।
লেখক: রাজু আলীম
