ফাল্গুনী হামিদ, যে মেঘের অনেক রং
তিনি অভিনয় করেন, গল্প-উপন্যাস-নাটক লিখেন, টিভি নাটক ও টেলিফিল্ম নির্মাণ করেন, মঞ্চনাটকের নির্দেশনা দেন। একদা ভিডিও অনুষ্ঠানের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেলিরিয়েল-এর কর্ণধার ছিলেন। বলা যায়, বহুমাত্রিক প্রতিভার দ্যুতিতে উদ্ভাসিত এক ব্যক্তিত।
তিনি ফাল্গুনী হামিদ। শরতের এক মধ্যাহ্নে তার মুখোমুখি হয়েছিল অন্যদিন। নানা প্রসঙ্গে তার সঙ্গে কথা বলেন আমাদের প্রতিনিধি জনাব শুভ্র মুহাম্মদ এর । এই আলাপচারিতার নির্বাচিত অংশ এখানে তুলে ধরা হলো।
দিনগুলি মোর…
সাতক্ষীরার এক হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম। আর ফাল্গুন মাসে পৃথিবীর আলো প্রথম দেখেছিলেন বলে নাম তার ফাল্গুনী।
বাবা ছিলেন স্কুলের হেডমাস্টার। অবশ্য প্রথম যৌবনে কলকাতার হেস্টিংস কোম্পানিতে চাকরি করতেন। তখন বিয়ে করেছিলেন সেখানকার মেয়েÑফাল্গুনীর মাকে। তারপর দেশবিভাগের পরে স্ত্রীকে নিয়ে চলে আসেন সাতক্ষীরায় এবং স্কুলের চাকরিতে যোগ দেন।
মেয়েবেলার কথা বলতে গিয়ে ফাল্গুনী হামিদ বলেন, “ আমরা ছিলাম চার বোন। তবে বড় বোনের সঙ্গে বয়সের বিরাট ব্যবধান ছিল বলে তিনি ছিলেন মাতৃস্থানীয়া। সহজ হতে পরতাম না বাকি অন্য বোনেরা। আমরা এই তিন বোনই ছিলাম ঘনিষ্ঠ। মেজ বোন ছিলেন শান্ত, আমি না শান্ত না দুষ্টু। অবশ্য ছোট বোন ছিল দুষ্টু। াামি ছিলাম নিভৃতচারী। একা থাকতে পছন্দ করতাম। আমার কোনো বন্ধু ছিল না। অবশ্য বন্ধু এখনো নেই। যদিও পরিচিত জন অনেকেই আছে। যাহোক, সেই মেয়েবেলায় একা একা থাকতাম বই পড়তাম, গান শুনতাম । বাড়ির পুকুর-পাড়ে বসে প্রবন্ধ লিখতাম। বিকেলে বেড়াতে যেতাম কাকশিয়ালী নদীর ধারে। হাঁটতাম সেখানে। নানা ধরনের নৌকা দেখতাম। আহা কী সুন্দরই না ছিল সেইসব দিন!”
ফাল্গুনী ভীষণ মেধাবী একজন মানুষ। অল্প বয়সে পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছিলেন। মেট্রিকে বোর্ডে স্ট্যান্ড করেছিলেন। আর তার সার্টিফিকেটে বয়স দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “তখন আমি পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছি। বেশ ভালো টাকার বৃত্তি। কিন্তু আন্ডার এজ ছিলাম বলে বোর্ড থেকে বলা হলো আমি এই জন্য টাকা পাব না। বাবা তখন লেখালেখি শুরু করলেন। তাঁর যুক্তি ছিল: পরীক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে যখন এলাও করা হয়েছিল, এখন টাকা দেওয়া হবে না কেন? তখন আমার বয়স বাড়াতে বলা হলো। তাই করা হলো এবং আমি অন্য স্কুলে ভর্তি হলাম। বিষ্ণুপুর হাই স্কুলে।”
মঞ্চে পদচারণা
বিষ্ণুপুর হাই স্কুলে পড়ার সময়েই ফাল্গুনী প্রথম মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন। তখন তিনি দশম শ্রেণির ছাত্রী। তাদের ফেয়ার ওয়েল উপলক্ষে সেই নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে ফাল্গুনী বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আমি নাট্যাভিনয়ের প্রতি একটু দুর্বল ছিলাম। কারণ আমার বাবা নাটক করতেন। যাহোক স্কুলের ওই নাটকে আমি অভিনয় করলাম। নাটকটির নাম ছিল ‘সাজাহান’। আর আমি হয়েছিলাম জাহানারা।”
১৯৭৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পরে ঢাকায় এসে নাট্যচক্রে যোগ দেন ফাল্গুনী। এখনো সেই দলেই আছেন তিনি।…নাট্যচক্রের হয়ে ফাল্গুনী প্রথম অভিনয় করেন ‘রাজা রাজা খেল’ নাটকে। নীলকণ্ঠ সেন রচিত এবং বাবুল রশীধ নির্দেশিত এই নাটকে তিনি এক পাগলির ভ‚মিকায় অভিনয় করেন। চরিত্রটির নাম ছিল ইন্দ্রানী।
নাট্যচক্রের সদস্য হিসেবে বহু নাটকে অভিনয় করেছেন ফাল্গুনী হামিদ। তবে প্রশংসা কুড়িয়েছেন ‘লেট দেয়ার বি লাইট’, ‘স্প্যার্টাকাস’, ‘প্রতীক্ষার প্রহর’. ‘ভদ্দরনোক’ প্রভৃতি নাটকে অভিনয়ের সূত্রে। তবে এইসব নাটকের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ‘প্রতীক্ষার প্রহর’-এর কাজল চরিত্রটি তার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র। এই চরিত্রটি সম্পর্কে ফাল্গুনী হামিদ বলেন, “কাজল একটি পোড় খাওয়া মেয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ডাক্তারি পড়ছিল। সেই সময় মেডিকেল কলেজের বন্ধু-বান্ধবসহ সে ধরা পড়ে পাকিস্তানি আর্মির হাতে। তার সঙ্গে তার চোদ্দ বছরের ছোটভাইও ছিল। পাকিস্তানি আর্মিরা কাজলের এক বান্ধবীকে ধর্ষণ করে। মেয়েটির মুমুর্ষু অবস্থা দেখে কাজলের ভাই ভয় পেয়ে যায়। এদিকে ওদের দলের নেতাকে ধরে আনা হয়, যার সঙ্গে কাজলের হৃদয়ঘটিত সম্পর্ক রয়েছে। এখন তার পরিচয় যদি কাজলের ছোটভাই বলে দেয় মিলিটারিদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে! এই আশঙ্কায় কাজলের সঙ্গীসাথিরা ওর ছোটভাইকে মেরে ফেলে। এতে অবশ্য কাজলের সায় ছিল। এর পরে সে অসহ্য যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে থাকে।”
এখন মঞ্চে খুব একটা অভিনয় করেন না ফাল্গুনী হামিদ। যেমন আগে ‘ভদ্দরনোক’ নাটকে শেফালীর ভ‚মিকায় অভিনয় করতেন তিনি। সেই চরিত্রটি এখন করছেন তনিমা হামিদÑফাল্গুনীর মেয়ে। অন্যদিকে ফুলজান করতেন ফপল্গুনীর ছোট বোন তুলিকা চৌধুরী। তিনি কিছুদিন আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে সেই চরিত্রটি করতে হয়েছিল ফাল্গুনীকে।
ফাল্গুনী হামিদ মুুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ‘হায়না’ মঞ্চনাটকটি রিখেছেন এবঙ নির্দেশনা দিয়েছেন। কয়েক বছর আগে লিখেছিলেন সত্য ঘটনাভিত্তিক ‘দোররা’ নাটকটি। তখন ঢাকার মঞ্চে এটির প্রথম মঞ্চায়ন হওয়ার পরে নাট্যচক্র গিযেছিল ভারতের উড়িষ্যায়। সেখানে দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছির নাটকটির কলাকুশলীরা, আন্তঃরাষ্ট অ্যাওয়ার্ডও লাভ করেছিল।
এই সময়ের মঞ্চনাটক সম্পর্কে ফাল্গুনী হামিদ বলেন, “মঞ্চে এখন অনেক ভালো নাটক হচ্ছে।রচনা, নির্দেশনা, আলো, সংগীত, সেট, অভিনয়Ñসবই চমৎকার। তবে দর্শখ কমে এসেছে। এটা খুবই দুঃখজনক। কেননা হলভর্তি দর্শখ দেখলে আমরা অনুপ্রাণিত হই। তারপরেও যারা মঞ্চনাটক ভালোবাসেন, তারা ঠিকই নাটক দেখতে আসেন।”
দর্শক স্বল্পতার কারণ হিসেবে ফাল্গুনী হামিদ ভারতীয় টিভি চ্যানেলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রতি দর্শক-আকর্ষণের কথা উল্লেখ করলেন। আরও বললেন ভারতীয় টিভি নাটক যে পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, এদেশের টিভি নাটক সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে না পারলে এক সময় দর্শক মুখ ফিরিয়ে নেবে ছোটপর্দা থেকেও।

