মতামতসর্বশেষ

হিজড়া

প্রথমত, ‘হিজড়া’ মানব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের অভাব রয়েছে। এ মানব সম্প্রদায় সম্পর্কে আমাদের নেতিবাচক ধারণাও রয়েছে। ফলে সমাজে অতি কাছে থেকেও হিজড়াদের সম্পর্কে আমাদের আগ্রহের কমতি পরিলক্ষিত হয়। বাংলা একাডেমি সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান বলছে, ‘হিজড়া’ শব্দটি হিন্দি ভাষা থেকে এসেছে। হিজড়াবিষয়ক একজন গবেষক বলেছেন, ‘হিজড়া’ শব্দ এসেছে ফারসি থেকে। [ড. জোবাইদা নাসরীন : ‘আমাদেরই বুঝদার হতে হবে’, আমাদের সময়, ঢাকার দৈনিক পত্রিকা, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮]।
আমরিন খান বলেছেন, ফারসি ভাষায় হিজড়া অর্থ হলো ‘সম্মানিত ব্যক্তি’। মানবাধিকার বাংলাদেশ ২০১৪, আইন ও সালিশ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত আমরিন খানের প্রবন্ধ ‘যৌনগত সংখ্যালঘুর অধিকার’। তবে যে ভাষা থেকেই শব্দটি আসুক না কেন, হিজড়ার আরো অনেক সমার্থক ও পারিভাষিক শব্দ আমাদের সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে আছে। যেমনÑশিখণ্ডী, খোঁজা, বৃহন্নলা, তৃতীয় লিঙ্গ, উভয় লিঙ্গ, নপুংসক, ইংরেজি ভাষায় ট্রান্সজেন্ডার, হার্মফ্রোডাইট, হিব্র“ ভাষায় ইউনাক, আরবি ভাষায় খুনসা ইত্যাদি।
প্রকৃতপক্ষে হিজড়া নারী-পুরুষের বাইরে আরেকটি লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানবধারা। যৌন-বৈচিত্র্যের ভিত্তিতে আমরা ছয় ধরনের হিজড়ার অস্তিত্ব সমাজে পাই। হিজড়া মানববিশেষ লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিকশিত হয়, তার লিঙ্গ অনুপযোগী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিকলাঙ্গ। ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী হিজড়া হচ্ছে সে, যার পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ উভয়টিই রয়েছে অথবা কোনোটিই নেই। শুধু প্রস্রাবের জন্য একটি ছিদ্রপথ রয়েছে। একই দেহে স্ত্রী ও পুরুষ চিহ্নযুক্ত অথবা এই উভয় চিহ্নবিযুক্ত মানুষটি হলো হিজড়া। [সূত্র : মাওলানা ইসমাঈল মাহমুদ : ‘প্রসঙ্গ হিজড়া : ইসলামী দৃষ্টিকোণ’, বাতায়ন, ইসলামী গবেষণা সাময়িকী, বসিলা, ঢাকা, মে ২০১৫ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ৭৬]।

সবচেয়ে ভালো হয়, আমরা যদি তাকে ‘লিঙ্গ প্রতিবন্ধী’ বলি। সব মানুষই নিখুঁত নয়, কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কেউ চোখে কম দেখে, কেউ কানে শোনেই না, কেউ কথা বলতে পারে না, কারো বুদ্ধি কম। এদের আমরা প্রতিবন্ধী বলি। হিজড়ারাও এক ধরনের প্রতিবন্ধী, তারা লিঙ্গপ্রতিবন্ধী।
তবে এর মধ্যেও আমরা হিজড়াদের নারী-পুরুষ ভেদ করতে পারি। অনেক হিজড়ার দাড়ি, গোঁফ গজায়, অনেকেই নারী সহবাসে সক্ষম, অনেকেরই স্বপ্নদোষজাতীয় পুরুষ-প্রকৃতি প্রকাশিত হয়। এদের আমরা সহজেই পুরুষ শ্রেণির হিজড়ার মধ্যে ফেলতে পারি। আবার কিছু হিজড়ার মধ্যে স্তন প্রকাশিত হয়, তাদের ঋতুস্রাবও হয়, সহবাসে উপযোগী থাকে, গর্ভসঞ্চারিত হওয়ার মতোও নারী-প্রকৃতি সমানভাবে প্রকাশিত হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা হিজড়া বিষয়টিকে মানুষের জেনেটিক সমস্যা বলে অভিহিত করেছেন। [ডা. আবদুল ওয়াদুদ, যুগান্তর, ঢাকার দৈনিক, ২১ ডিসেম্বর ২০১২]।
তবে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, লিঙ্গীয় ভিন্নতা আসলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অংশ নয়। [ডা. জোবাইদা নাসরীন, পূর্বোক্ত সূত্র]।
নারীর দেহে হরমোনের অসামঞ্জস্যতার কারণে হিজড়া সন্তান জšে§র একটি বড় কারণ। অনেক সময় জšে§র পরও হরমোনের তারতম্যের কারণে নারী-পুরুষ প্রকৃতির মাঝখানে তৃতীয় আরেকটি লিঙ্গের সৃষ্টি হতে পারে। শিশু বয়সে যৌন নিপীড়নের শিকার হলেও কেউ হিজড়া হয়ে যেতে পারে। কোনো সময় আতঙ্ক থেকেও মানুষ নিজেকে অপর লিঙ্গের মতো ভাবতে থাকে।
এই অন্য লিঙ্গের মতো ভাবতে পারা যদি নারী-প্রকৃতি হয়ে ওঠে, তখন হিজড়া একটা সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এইডস ও অন্যান্য যৌনবাহী রোগের ধারক হিসেবে পতিতার মতো হিজড়াদেরও গুনে থাকেন। বিশেষ করে নারী প্রকৃতির হিজড়ারা এ ক্ষেত্রে প্রধান সন্দেহের তালিকায় থাকে।
অথচ বাংলাদেশে হিজড়াদের সংখ্যা খুব বেশিও নয়। যদিও হিজড়ারা মনে করে, সারা দেশে হিজড়া সম্প্রদায়ের সংখ্যা দেড় লাখ। রাজধানী ঢাকায় আছে ১৫ হাজারের মতো হিজড়া। [প্রথম আলো, ঢাকার দৈনিক, ৩১ আগস্ট ২০১৩]।

ড. মোহাম্মদ হাননান

অন্য একটি সংবাদপত্র জানিয়েছে, সারা দেশে হিজড়াদের সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ হাজারের মতো। কিন্তু ডেমোগ্রাফি সূত্র অনুযায়ী ঢাকার হিজড়ার সংখ্যা ২৫ হাজারের মতো। [যুগান্তর, ২১ ডিসেম্বর ২০১২]।
হিজড়ারা কেন নারীরূপ সাজতে ভালোবাসে? প্রকৃতপক্ষে মানব-প্রকৃতির সবাই সাজতে ভালোবাসে। মেয়েরা একটু বেশি সেজে থাকে। হিজড়া নারী প্রকৃতি বা পুরুষ প্রকৃতি যা-ই হোকÑসবাই দল ধরেই সাজগোজ করতে ভালোবাসে। এমনিতে হিজড়াদের একটা অংশ ভিক্ষাবৃত্তি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, বকশিশ, তোলা ইত্যাদি সামাজিক অপকর্মে রত আছে। এ কাজগুলো নারী সেজে করলে সুবিধা বেশি হয়ে থাকে বলে তাদের মনে একটা সুবিধাবাদ কাজ করে। যেহেতু আমাদের দেশে নারীরা এসব বৃত্তি ও পেশা বেছে নেয় না, সেহেতু হিজড়ারা সুযোগটি গ্রহণ করে। এতে প্রকৃতপক্ষে ‘নারীসমাজ’ অপমানিত হয়। হিজড়াদের নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হওয়ার এটি একটি বড় কারণ।
এসব প্রতারণামূলক কাজ পছন্দ করে নাÑএমন হিজড়াও সমাজে আছে। সমাজে প্রতিষ্ঠিত, শিক্ষিত হিজড়ারা এসব থেকে মুক্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকার একটি সুন্দর হিজড়াসমাজ গড়ে তোলার জন্য নানা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ সমাজসেবা অধিদপ্তর ২০১২ সাল থেকে হিজড়াশিশুদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি চালু করেছে। বাংলাদেশ আইন কমিশন সুপারিশকৃত ‘বৈষম্য বিলোপ আইন ২০১৪’ প্রণয়ন করেছে। জাতীয় সংসদেও তা গুরুত্ব পেয়েছে। এ আইনের ৪ নম্বর ধারা ও উপধারায় লিঙ্গ প্রতিবন্ধীদের জš§, পরিবার, উত্তরাধিকার বিষয়ে বৈষম্য বিলোপ করার কথা উলি­খিত হয়েছে। সংবিধানের ১৯, ২৭, ২৮, ২৯ অনুচ্ছেদেও সব নাগরিকের সমতা, সমান সুযোগ ও সব ধরনের বৈষম্য বিলোপের বিধানাবলি লিপিবদ্ধ রয়েছে। মনে রাখতে হবে, হিজড়ারা পুরুষ নাকি নারী, এ প্রশ্নের উত্তরের চেয়েও জরুরি হলো তারা মানুষ। আমাদের সভ্যসমাজের মতোই মানবমণ্ডলী তারা। সুতরাং সব মৌলিক অধিকার তাকে দিতে হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিজড়াদের জন্য পঞ্চাশের বেশি বেসরকারি সংস্থা ও সংগঠন রয়েছে। তাদেরও রয়েছে নানা রকম প্রকল্প ও কর্মসূচি। সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে মিলে এসব সংস্থা ও সংগঠন বাস্তবসম্মত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সমাজসেবা কমপ্লেক্সে ২০১৬ সালে হিজড়াদের রূপচর্চা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে তারা বিউটি পার্লার ব্যবসাটা করতে পারে। [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ঢাকার দৈনিক, ১৪ জুলাই ২০১৬]।

আমরা আগেই বলেছি, হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্যরা নারী পরিচয় দিতে বেশি ভালোবাসে এবং সাজগোজ করা তাদের প্রধান শখ। সুতরাং আমরা বলতে পারি, নারী হিজড়াদের জন্য এ কার্যক্রম বাস্তবমুখী।
২০১৫ সালের ৩০ মার্চ ঢাকার বেগুনবাড়িতে যখন একল জঙ্গি একজনকে হত্যা করে দৌড়ে পালাচ্ছিল, সাধারণ মানুষ যখন দর্শকের মতো উৎসুক হয়ে ঘটনাটি দেখছিল, তখন একজন হিজড়া দুজন জঙ্গিকে ধরে ফেলে। এ নিয়ে সারা দেশ উৎফুলে­ ফেটে পড়েছিল। সে ছিল একজন নারী হিজড়া, নাম ছিল তার লাবণ্য।
এ প্রেক্ষাপটে প্রশাসন তাদের অধিকতর কাজে লাগাতে উদ্যোগী হয়। কেউ কেউ ট্রাফিক পুলিশের চাকরিও পায়। আমাদের সুপারিশ, নারী হিজড়াদের আনসার ও ভিডিপিতেও নেওয়া যায়, কারণ সেখানে প্রচুর পরিমাণে নারী আনসার ও ভিডিপি রয়েছে।
বাংলাদেশে প্রচুর হিজড়া আছে, যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়েছে। তাদের হিজড়া পুনর্বাসনে কাজে লাগানো যায়। ভারতের বাংলা প্রদেশের কৃষ্ণনগর কলেজের অধ্যক্ষ মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় একজন নারী হিজড়া। [মাহমুদুজ্জামান বাবু : আজš§ পাপ এবং ‘হলদে গোলাপ’, প্রথম আলো, ১৪ ফেব্র“য়ারি ২০১৬]
হিজড়াদের জন্য আবাসন প্রকল্প চালু করলে একটি নতুন সম্ভাবনা তাদের জীবনে জেগে উঠবে। তাদের চিকিৎসাসুবিধা দিতে হবে অন্য প্রতিবন্ধীদের মতোই বিনা মূল্যে, আর এতে নারী হিজড়াদের অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। তাদের সুস্থ বিনোদনে নিয়ে আসতে হবে, যাতে নারী হিজড়াদের অবৈধ কাজে কেউ ব্যবহার করতে না পারে।
হিজড়ারা যাতে সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম না করে, তার জন্য তাদের আদব-কায়দা প্রশিক্ষণও দেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন একজন প্রতিবেদক। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রশিক্ষণে কোনো কর্মকর্তা অধিবেশনে প্রবেশ করলেই হিজড়ারা বলে উঠতÑ‘এই বেডা কেডা।’ প্রশিক্ষণের কয়েক দিনের মধ্যেই প্রশিক্ষককে তারা বলতে শুরু করে, ‘স্যার।’ [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ১৪ জুলাই ২০১৬]। এভাবে তাদেরও পরিবর্তন সম্ভব, সেটি যেকোনো বিষয়েই হোক।


আরেকটি ঘটনা লক্ষ করুন। মিয়ানমারে যখন রোহিঙ্গাদের গণহারে হত্যা করা হচ্ছিল, তখন ঢাকায় হিজড়া সম্প্রদায় প্রতিবাদ মিছিল করে। কয়েক শ হিজড়া মিছিল করে এবং মানববন্ধনও করে। এ সময় বক্তৃতা করেন আনোরি হিজড়া, রূপা হিজড়া, নাসিমা হিজড়া, সুইটি হিজড়া, সীমা হিজড়া। দেখুন, এরা সবাই নারী। তারা সবাই বাংলাদেশ সরকারের কাছে সীমান্ত খুলে দেওয়ার আহŸানও জানিয়েছিল। [বিস্তারিত প্রতিবেদন দেখুন, আমাদের সময়, অনলাইন সংস্করণ, ২৭ নভেম্বর ২০১৬]। হিজড়ারা যে কত সচেতন নাগরিক, এসব ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দেয়।
২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর বাংলাদেশ মন্ত্রিসভা তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে হিজড়াদের স্বীকৃতি দেয়। ২০০৮ সাল থেকেই বাংলাদেশে হিজড়ারা ভোটার। তাদের এ রাজনৈতিক অধিকার রাষ্ট্র মেনে নিয়েছে। আমাদের দেশে তাই নারী আছে, পুরুষ আছে, তৃতীয় লিঙ্গও আছে। মুসলিম শরিয়া আইন অনুযায়ী হিজড়ারা মা-বাবার সম্পত্তির ভাগ পাবে। তাদের বঞ্চিত করা আইনের বরখেলাপ হবে। তবে তারা উত্তরাধিকার সম্পদে নারী হিসেবে পাবে নাকি পুরুষ হিসেবে পাবে, তা-ও শরিয়ায় নিশ্চিত করা আছে। যে হিজড়া নারী বা পুরুষ প্রকৃতির, সে নারী বা পুরুষের মানদণ্ডেই উত্তরাধিকার সম্পদ পাবে, আর যে নারী নাকি পুরুষ, এর কোনোটিই চিহ্নিত করা যায় না, সে তার প্রস্রাবের পথের অবস্থা অনুযায়ী ভাগ পাবে। [সূত্র : সুনানে বায়হাকি, হাদিস নম্বর : ১২২৯৪]।
‘নপুংসক’ অর্থ ধরে কাউকে ‘হিজড়া’ বলে গালি দেওয়া যাবে না। কাউকে ‘মন্দ নামে ডাকা গুনাহ’। [পবিত্র কোরআন, সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১১]। মনে রাখতে হবে, যারা লিঙ্গপ্রতিবন্ধী, তারা আমাদের সভ্যসমাজেরই কারো না কারো সন্তান। আগে আমাদের দেশে শারীরিক অন্য প্রতিবন্ধীদের বোঝা মনে করা হতো, এখন এরা গৌরবের এবং মর্যাদার সঙ্গে বড় হচ্ছে।
লিঙ্গপ্রতিবন্ধীরাও ঠিক এমনই একটি ধারা, তাদেরও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে দিতে হবে। পরিবারের অন্য সদস্যদের মতোই তারা বড় হবে, শিক্ষা লাভ করবে, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে। তাদের নিয়ে একসঙ্গে চলতে সমাজে লজ্জার কিছু নেই। আমাদের নবী (সা.) যখন আরব ভ‚মিতে আগমন করেন, তখন আরবের ঘরগুলোতে কন্যাসন্তান জš§ নেওয়া লজ্জার ছিল। কিন্তু ইসলাম যখন কন্যাসন্তানের মর্যাদা ঘোষণা করল, তখন কন্যাসন্তানই সমাজে হয়ে উঠল মর্যাদাশালী। লিঙ্গপ্রতিবন্ধিতা নিয়ে জš§ানোয় লজ্জার কিছু নেই, তাকে সুষ্ঠুভাবে, আলাদা যতœ নিয়ে লালন-পালন করাই হবে গৌরবের। শিশু লিঙ্গপ্রতিবন্ধীকে প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা দিলে তার প্রতিবন্ধিতা সেরে ওঠার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। সুতরাং এদিকটাও দেখতে হবে।
সব শেষে একজন হিজড়ার গল্প দিয়ে লেখাটা শেষ করছি। একজন নারী হিজড়া ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে এমন করে : ‘আমি যে মায়ের গর্ভে জšে§ছিলাম, তার কাছে আমি থাকতে পারিনি কিংবা সে আমাকে রাখতে পারেনি। আমার জরায়ু নেই; কিন্তু আমার একটি মেয়ে আছে। সুতরাং মা হতে হলে জরায়ু থাকতে হবে এমন কথা নেই’। [ড. জুবাইদা নাসরিন তাঁর বন্ধু এক নারী হিজড়ার স্ট্যাটাসটি উদ্ধৃত করেছেন, দেখুন আমাদের সময়, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮]। এ ঘটনাটি হিজড়াদের সম্পর্কে আমাদের মনের চোখ খুলে দিতে যথেষ্ট। আশা করি, হিজড়া সম্পর্কে আমাদের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হবে।
এর সঙ্গে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আমরা যদি সচেতন থাকি, তাহলে হিজড়াদের জীবন আরো সুন্দর হয়ে উঠবে। মনে রাখতে হবে, এ বিশ্বজগৎ একমাত্র আল­াহ তাআলারই খেয়াল-খুশি অনুযায়ী চলছে। ‘আল­াহ, তিনি যা ইচ্ছা, যেমন করে ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। [পবিত্র কোরআনÑসুরা : শুরা, আয়াত : ৪৯]।
তবে আল­াহর সব ধরনের ইচ্ছা ও খেয়ালের পেছনে হেকমত ও তাৎপর্য আছে। তিনি এমনি এমনি সব ইচ্ছা বাস্তবায়ন করেননি। তিনি একজনকে চোখ দেননি, এটা চোখওয়ালার জন্য একটি শিক্ষা, আল­াহ বলছেন, তোমাকে আমি চোখ দিয়েছি, তুমি আমার সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখতে পারছ; কিন্তু যে দেখতে পারে না তার কথা ভেবে দেখো, আমি তোমাকে কত করুণা করেছি।
তেমনি আল­াহ তাআলা একজনকে লিঙ্গ দেননি, আবার আরেকজনকে দিয়েছেন। যাকে দিয়েছেন, সে যেন তার লিঙ্গকে বৈধ পথে ব্যবহার করে, জেনা থেকে বেঁচে থাকে। আর ভাবে, আমাকেও তো আল­াহ লিঙ্গহীন করে বানাতে পারতেন। তাই এ দুনিয়ার সামান্য থেকে সামান্য, ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র, কিছুর সৃষ্টিই মহান আল­াহর হেকমতের বাইরে নয়। ‘তিনিই মহান সত্তা, যিনি মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের আকৃতি গঠন করেন। তিনি প্রবল পরাক্রমশালী এবং প্রজ্ঞাময়।’ [পবিত্র কোরআন, সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৬]।
আল­াহ তাআলার কাছেও তাই বাহ্যিক আকার-আকৃতির কোনো মূল্য নেই। কারণ এ আকৃতি তার নিজের ইচ্ছায়ই হয়েছে, মানুষের এতে কোনো হাত নেই। হাশরের ময়দানে তিনি দেখবেন শুধু মানুষের আমল। [মুসলিম শরিফ, হাদিস নম্বর ৬৭০৮]।
তাই সাধারণ সুস্থ মানুষের জন্য যেমন, তেমনি লিঙ্গপ্রতিবন্ধীর জন্যও আল­াহর হুকুম জানা ও রাসুল (সা.)-এর তরিকা অনুযায়ী তা মানা তার জন্য জরুরি। বাংলাদেশের বেশির ভাগ হিজড়া মুসলিম। কারণ মুসলিম অধ্যুষিত এ দেশের কোনো না কোনো মুসলিম পিতা-মাতার ঘরেই তাদের জš§ হয়েছে। তাই জš§ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ইসলামী রীতি-নীতিই তাঁকে মেনে চলতে হবে। কিন্তু একটি গোষ্ঠী হিজড়াদের ইসলামবহিভর্‚ত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত করে রাখছে। যা বেদনাদায়ক। একজন হিজড়ার মৃত্যু হলে তাকে কবর দেওয়া হয় ঠিকই; কিন্তু প্রচলিত মুসলিম সমাজের মতো নয়। সে যে বিছানায় ঘুমাত, তার নিচেই তাকে কবর দেওয়া হয়। ইদানীং জায়গার অভাবে অন্যত্র কবর দেওয়া হয় বটে; কিন্তু অন্যান্য কার্যক্রম হয় ইসলামবিরোধী ভাবধারায়। কবরে প্রথম লবণ দেওয়া হয়, পরে লাশ রাখা হয়। এরপর দেওয়া হয় ফুল, তারপর আবার লবণ। এরপর সবাই মিলে লাশটিকে জুতাপেটা করতে থাকে। [সমকাল, ঢাকা, ২০ মার্চ ২০১৫]।
পুরো প্রক্রিয়াটিই নিষ্ঠুর, হাস্যকর ও ইসলামবিরোধী এক কর্মকাণ্ড।
বর্তমানে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার লোভে অনেক সুস্থ মানুষও হিজড়া সেজে থাকে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের একটি চাকরিতে হিজড়া কোটা থাকায় অনেক তরুণ-যুবক হিজড়া হিসেবে নিজেদের নাম লেখায়। কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হওয়ায় তাদের ডাক্তারি পরীক্ষা করে দেখা যায়, তারা সবাই সুস্থ। ইদানীং আরেকটি ঘটনা সংক্রমণ হচ্ছে, আর তা হলো, অনেক প্রাইভেট হাসপাতাল তরুণ-যুবকদের অস্ত্রোপচার করে লিঙ্গ কর্তন করে দিচ্ছে। অনেককে ওষুধ খাইয়েও হিজড়া বানানোর চেষ্টা চলে। ভারতে এ ধরনের বহু প্রতিষ্ঠান আছে, এখন তা বাংলাদেশেও আমদানি হচ্ছে। অথচ আমাদের নবী (সা.) ওই সব পুরুষের ওপর অভিশাপ দিয়েছেন, যারা নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে এবং ওই সব নারীর ওপরও অভিশাপ করেছেন, যারা পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বন করে এবং মহান আল­াহর সৃষ্টিকে বিকৃত করে। [বুখারি শরিফ, হাদিস নম্বর : ৩৮৮৫]।
বাংলাদেশের পেনাল কোড ৩২৬ ধারায়ও অঙ্গহানি ও রূপান্তর শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষিত হয়েছে। ইসলাম ছাড়া অন্যান্য বিশ্বাস ও বাতিল মতবাদেও হিজড়াদের প্রসঙ্গে নানা কথা দেখতে পাওয়া যায়। এদের ‘তৃতীয় প্রকৃতি’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। কোনো কোনো প্রাচীন গোত্রে এদের আলাদা দেবতা রয়েছে। পূর্ব সময় থেকেই মন্দিরে হিজড়া নাচের ব্যবস্থা ছিল। বৌদ্ধ মতবাদে যেসব পুরুষ মেয়েদের মতো আচরণ করে, তাদের ‘কতি’ বলা হয়েছে। বৌদ্ধ অধ্যুষিত থাইল্যান্ডে কতিদের বিয়ে করা নিষিদ্ধ। তবে হিজড়া নারী ইউরোপীয়দের বিয়ে করতে পারবে, কিন্তু তাকে তখন থাইল্যান্ড থেকে চলে যেতে হবে। [ঐড়সব ংবীঁধষরঃু রহ ইঁফফযরংস, গধঃুহবৎ, অহফৎব,ি ২০০, বাতায়ন, মে ২০১৫ সংখ্যা, মাহাদুল বুহুসিল ইসলামিয়া, বাসলা’র গবেষণাপত্র থেকে উদ্ধৃত] ইহুদিরা হিজড়াদের ধর্মবহিভর্‚ত মানুষ বলে মনে করে। তাদের বলা হয় ‘সারিম’। তবে সারিমরা যদি রোজা রাখে, তাহলে জান্নাতে তাদের জন্য উঁচু স্তম্ভ তৈরি করা হবে।
[সূত্র : বাতায়ন, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৮৬]। খ্রিস্টানরা সব সময়ই হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ বলে অভিহিত করে আসছে। এটা ভারতের পৌত্তলিক বিশ্বাসীদের ‘তৃতীয় প্রকৃতি’র কাছাকাছি।
শুধু ইসলামই হিজড়াদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ মনে করে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে অঙ্গ ও আকৃতির ভিত্তিতে মানুষকে ভাগ করা হয়নি। আল­াহ তাআলার কাছে সব ত্র“টিহীন অথবা ত্র“টিপূর্ণ মানুষই সমান এবং হাশরের ময়দানে সব ধরনের মানুষই জিজ্ঞাসিত হবে। সে জন্য নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতÑসব কিছু পালন করাই হিজড়াদের জন্য ফরজ।
ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী একজন হিজড়া নারীদের নামাজে প্রয়োজনে ইমামতিও করতে পারবে। নামাজে পর্দা করতে হবে, নামাজে বসার ক্ষেত্রে নারীদের মতো বসবে। হজ করতে পারবেন হিজড়া মোমিন, তবে এ ক্ষেত্রে একজন মাহরাম পুুরুষ বেছে নিতে হবে এবং নারীদের মতোই হজের সব নিয়ম-কানুন তিনি পালন করবেন।
নাবালগ অবস্থায় হিজড়ার খতনা জরুরি। তবে বয়স হয়ে গেলে পরে খতনা করাতে চাইলে এমন নারী তাকে খতনা করাবে, যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তা না হলে, তাকে খতনাবিহীন জীবন অতিবাহিত করতে হবে।
হিজড়া নারী-পুরুষ পরস্পর বিয়ে করতে পারবে। তবে শর্ত থাকবে, সহবাসে তাদের সক্ষম হতে হবে। কোনো প্রকৃত হিজড়ার স্তনে যদি দুধ আসে, তা কাউকে পান করানো দ্বারা বৈবাহিক নিষিদ্ধতা সাব্যস্ত হবে না।
মৃত্যুর পর হিজড়াকে গোসল না দিয়ে তায়াম্মুম করানোই বিধান। এবং মৃত নারীদের মতো পাঁচ কাপড়ে কাফন পরাতে হবে। মুসলিম হিসেবে তার নামাজে জানাজা হবে। কবরে নামানোর সময় লাশ ওপর থেকে চাদর দ্বারা পর্দাবেষ্টিত থাকবে। [সূত্র : মাওলানা ইসমাঈল মাহমূদ : ‘প্রসঙ্গ হিজড়া : ইসলামী দৃষ্টিকোণ’, বাতায়ন, পূর্বোক্ত]।
আমাদের সমাজে হিজড়াদের সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা নেই। হিজড়ারা নিজেদের অবস্থান ও পরিচয় সম্পর্কে সচেতন নয়। তারা মানুষ এবং মর্যাদাশীল মানুষ। তাদের মধ্যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মেহনত করা প্রয়োজন। তাবলিগ জামায়াতের সাথিরা বোবা, কালাদের মাঝেও ঈমানের মেহনত করেন। হিজড়াদের মধ্যে দাওয়াতের কাজ আছে কি না জানা নেই। থাকলে ভালো, না থাকলে শুরু করা দরকার। তাদেরও চিল­ায় পাঠানো দরকার। পরহেজগারি তাদের জন্যও জরুরি। মসজিদের খতিবরাও খুতবাপূর্ববর্তী বয়ানে হিজড়াদের প্রসঙ্গ আনলে ভালো হয়, যাতে সাধারণ মানুষ ও হিজড়াদের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচে যায়।
লেখক : গ্রন্থকার ও গবেষক
drhannapp@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *