শরৎচন্দ্রের ধারাবাহিক ‘শ্রীকান্ত’ পর্ব-০১
শ্রীকান্ত প্রথম পর্ব
আমার এই ‘ভবঘুরে’ জীবনের অপরাহ্ন বেলায় ইহারই একটা অধ্যায় বলিতে বসিয়া আজ কত কথাই না মনে পড়িতেছে।
ছেলেবেলা হইতে এমনি করিয়াই ত বুড়া হইলাম। আত্মীয় অনাত্মীয় সকলের মুখে শুধু একটানা ‘ছি-ছি-ছি’ শুনিয়া শুনিয়া নিজেও নিজের জীবনটাকে একটা মস্ত ‘ছি-ছি-ছি’ ছাড়া আর কিছুই ভাবিতে পারি নাই। কিন্তু কি করিয়া যে জীবনের প্রভাতেই এই সুদীর্ঘ ‘ছি-ছি’র ভূমিকা চিহ্নিত হইয়া গিয়াছিল, বহু কালান্তরে আজ সেই সব স্মৃত ও বিস্মৃত কাহিনীর মালা গাঁথিতে বসিয়া যেন হঠাৎ সন্দেহ হইতেছে, এই ‘ছি-ছি’টা যত বড় করিয়া সবাই দেখাইয়াছে, হয়ত ঠিক তত বড়ই ছিল না। মনে হইতেছে, হয়ত ভগবান যাহাকে তাঁহার বিচিত্র-সৃষ্টির ঠিক মাঝখানটিতে টান দেয়, তাহাকে ভালো ছেলেহইয়া একজামিন পাশ করবার সুবিধাও দেন নাই; গাড়ী-পাল্কী চড়িয়া বহু লোক-লস্কর সমভিব্যবহারে ভ্রমণ করিয়া তাহাকে ‘কাহিনী’ নাম দিয়া ছাইবার অভিরুচিও দেন না। বুদ্ধি হয়ত তাহাকে কিছুদেন, কিন্তু বিষয়ী রোকেরা তাহাকে সুবুদ্ধি বলে না। তাই প্রবৃত্তি তাহাদের এমনি অসঙ্গত, খাপছাড়াÑএবং দেখিবার বস্তু ও তৃষ্ণাটা স্বভাবতঃই এতই বেয়াড়া হইয়া উঠে যে, তাহার বর্ণনা করিতে গেলে সুধী ব্যক্তিরা বোধ করি হাসিয়াই খুন হইবেন। তারপর সেই মন্দু ছেলেটি যে কেমন করিয়া অনাদরে অবহেলায় মন্দের আকর্ষণে মন্দ হইয়া, ধাক্কা খাইয়া, ঠোক্কর খাইয়া অজ্ঞাতসারে অবশেষে একদিন অবযশের ঝুরি কাঁধে ফেলিয়া কোথায় সরিয়া পড়েÑসুদীর্ঘ দিন আর তাহার কোনো উদ্দেশ্যই পাওয়া যায় না।
অতএব এ সকলও থাক। যাহা বলিতে বসিয়াছি, তাহাই বলি। কিন্তু বলিলেই ত ভলা হয় না। ভ্রমণ করিতে পারে; কিন্তু হাত-দুটো থাকিলেই ত আর লেখা যায় না। সে যেভারি শক্ত । তা তাছড়া মন্ত ম্স্কুল হইয়াছে আমার এই যে, ভাগবান আমার মধ্যে কল্পনা-কবিত্বের বাষ্পটুকুও দেননাই। এই দুটো বোড়া চেখ দিয়া আমি যা কিছু দেখি ঠিক তাহাই দেখি। গাছকেঠিক গাছেই দেখিÑপাহাড় পর্বতকে পাহাড় পবৃতই দেখি। জলের দিকে চাহিয়া জলকে জল ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। আকাশে মেঘের ানে চোখ তুলিয়া রাখিয়া, ঘাড়ে ব্যথাকরিয়া ফেলিয়াছি, কিন্তু যে মেঘ সেই মেঘ! কাহারো আকাশে মেঘের পানে চোখ তুলিয়া রাখিয়া, ঘাড়ে ব্যথা করিয়া ফেলিয়াছি, কিন্তুযে মেঘ সেই মেঘ! কাহারো পানে চাহিয়া চাহিয়াচোখ ঠিকরাইয়া গিয়াছে; কিন্তু কাহারো মুখটুখ ত কখনো নজরে পড়ে নাই। এমন করিয়া ভগবান যাহাকে বিড়ম্বিত করিয়াছেন, তাহার দ্বারা কবিত্ব সৃষ্টি করা ত চলে না। চলে শুধু সত্য কথা সোজা করিয়া বলা। অতএব আমি তাহাই করিব।
কিন্তু, কি করিয়া ‘ভবঘুরে’ হইয়া পড়িলাম, সে কথা বলিতে গেলে, প্রভাত-জীবনে এ নেশায় কে মাতাইয়া দিয়াছিল, তাহার একটু পরিচয় দেওয়া আবশ্যক। তাহার নাম ইন্দ্রনাথ। আমাদের ্রথম আলাপ কেটা ‘ফুটবল ম্যাচে’। আজ সে বাঁচিয়া আছে কি না জানি আর বহু বৎসর পূর্বে একদিন অতি প্রত্যুষে ঘরবাড়ি, বিষয়-আশয়, আত্মীয়-স্বজন সমস্ত ত্যাগ করিয়া সেই যে একবস্ত্রে সে সংসার ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেল, আর কখনো ফিরিয়া আসিল না। উঃÑসে দিনটা কি মনেই পড়ে!
ইস্কুলের মাটে বাঙ্গালী ও মুসলমান ছাত্রদের ‘ফুটবল ম্যাচ’। সন্ধ্যা হয়-হয়। মগ্ন হইয়া দেখিতেছি। আনন্দের সীমা নাই। হঠাৎÑওরে বাবা-এ কি রে! চটাপট শব্দ এবং ম্যারো শালাকে, ধরো শ্যালাকে! কি একরকম যেন বিহŸল হইয়াগেলাম। মিনিট দুই-তিন। ইতিমধ্যে কে যে কোথায় অন্তর্ধান হইয়া গেল, ঠাহর পাইলাম না। ঠাহর পাইলাম ভালো করিয়া তখন, যখন পিঠের উর একটা আস্ত ছাতির বাঁট পটাশ করিয়া ভাঙ্গিল এবং আরো গোটা দুই-তিন মাথার উপর, পিঠের উপর উদ্যত দেখিলাম। পাঁচ-সাতজন মুসলমান-ছোকরা তখন চারিদিকে ব্যূহ রচনা করিয়াছেÑপালাইবার এতটুকু পথ নাই।
আরও একটা ছাতির বাঁটÑআরও একটা। ঠিক এই মুহূর্তে যে মানুষটি বাহির হইতে বিদ্যুৎগতিতে ব্যূহভেদ করিয়া আমাকে আগলাইয়া দাঁড়াইলÑসেই ইন্দ্রনাথ।
ছেলেটি কালো। তাহার বাঁশির মতো নাক, প্রশস্ত সুডৌল কপাল, মুখে দুই চারিটা বসন্তের দাগ। মাথায় আমার মতোই, কিন্তু বয়সে কিছু বড়। কহিল, ভয় কি। ঠিক আমার পেছনে পেছনে বেরিয়ে এসো।
ছেলেটির বুকের ভিতর সাহস এবং করুণা যাহা ছিল, তাহা সুদুর্লভ হইলেও অসাধারণ হয়ত নয়। কিন্তু তাহার হাত দুখানি যে সত্যই অসাধারণ, তাহাতে লেশমাত্র সন্দেহ নেই। শুধু জোরের জন্য বলিতেছি না। সে দুটি দৈর্ঘ্যে তাহার হাঁটুর নীচে পর্যন্ত পড়িত। ইহারপরম সুবিধা এই যে, যে ব্যক্তি জানিত না, তাহার কস্মিনকালেও এ আশঙ্কা মনে উদয় হইতে পারে না যে, বিবাদের সময় ঐ খাটো মানুষটি অকস্মাৎ হাত-তিনেক লম্বা একটা হাত বাহির করিয়া তাহার নাকের উপর এই আন্দাজের মুষ্ট্যঘাত করিবে। সেকি মুষ্টি! বাঘের থাবা বলিলেই হয়।
মিনিট-দুয়ের মধ্যে তাহার পিঠ ঘেঁষিয়া বাহিরে আসিয়া পড়িলাম। ইন্দ্র বিনা-আগম্বরে কহিল, পালা।
ছুটিতে শুরু করিয়া কহিলাম, তুমি ? সে রুক্ষভাবে জবাব দিল, তুই পালা নাÑগাধা কোথাকার!
গাধাই হইÑআর যাই হই, আমার বেশ মনে পড়ে, আমি হঠাৎ ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিয়াছিলাম,Ñনা।
ছেলেবেলা মারপিট কে না করিয়াছে ? কিন্তু পাঁড়াগায়ের ছেলে আমরাÑমাস দুই-তিন পূর্বে লেখাপড়ার জন্য শহরেপিসিমার বাড়ি আসিয়াছিÑইতিপূর্বে এভাবে দল বাঁধিয়া মারামারিও করি না, এমন আস্ত দুটা ছাতির বাঁট পিঠের উপরও কোনোদিন ভাঙে নাই। তথাপি একা পলাইতে পারিলাম না। ইন্দ্র একবার আমার মুখের প্রতি চাহিয়া কহিল না,Ñতবে কি ? দাঁড়িয়ে মার খাবি নাকি ? ঐ, ওই দিক থেকে ওরা আসছেÑআচ্ছা, তবে খুব ক’ষে দৌড়াÑ
এ কাজটা বরাবরই খুব পারি। বড় রাস্তার উপরে আসিয়া যখন পৌঁছান গেল, তখন সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। দোকানে আলো জ্বলিয়া উঠিয়াছে এবংপথের উপর মিউনিসিপ্যালিটির কেরোসিন ল্যাম্প লোহার থামের উপর এখানে একটা, আর ওই ওখানে একটা জ্বালা হইয়াছে। চোখের জোর থাকিলে, একটার কাছে দাঁড়াইয়া আর গলা শুকাইয়া গিয়াছিল, কিন্তু আশ্চর্য, সে এতটুকুও হাঁপায় নাই। এতক্ষণ যেন কিছুই হয় নাইÑমারে নাই, মার খায় নাই, ছুটিয়া আসে নাইÑনা, কিছুইনয়, এমনি জিজ্ঞাসা করিল, তোর নাম কি রে ?
শ্রী-কা-ন্তÑ
শ্রীকান্ত ? আচ্ছা বলিয়া সে তাহার জামার পকেট হইতে একমুঠো শুকনা পাতা বাহির করিয়া কতকটা নিজের মুখে পুরিয়া দিয়া কতকটা আমার হাতে দিয়া বলিল, ব্রাটাদের খুব ঠুকেছিÑচিবো।
কি এ ?
সিদ্ধি।
আমি অত্যন্ত বিস্মিত হইয়া কহিলাম, সিদ্ধি ? এ আমি খাইনে।
সে ততোধিক বিস্মিত হইয়া কহিল, খাসনে ? কোথাকার গাধা রে! বেশ নেশা হবেÑচিবো! চিবিয়ে গিলে ফ্যাল।
নেশা জিনিসটার মাধুর্য তখন ত আর জানি নাই। তাই ঘাড় নাড়িয়া ফিরাইয়া দিলাম। সে তাহাও নিজের মুখে দিয়া চিবাইয়া গিলিয়া ফেলিল।
আচ্ছা, তা হ’লে সিগরেট খাঁ। বলিয়া আর একটা পকেট হইতে গোটা দুই সিগরেট ও দেশলাই বাহির করিয়া, একটি আমার হাতে দিয়া অপরটা নিজে ধরাইয়া ফেলিল। তারপরে তাহার দুই করতল বিচিত্র উপায়ে জড়ো করিয়া সেই সিগরেটটাকে কলিকার মত করিয়া টানিতে লাগিল। বাপ রে, সে কি টান! এক টানে সিগরেটের আগুন মাথা হইতে তলায় নামিয়া আসিল। চারিদিকে লোকÑআমি অত্যন্ত ভয় পাইয়া গেলাম। সভয়ে প্রশ্ন করিলাম, চুরুট খাওয়া কেউ যদি দেখে ফ্যালে?
ফেললেই বা! সবাই জানে। বলিয়া স্বচ্ছন্দে সে টানিতে টানিতে রাস্তার মোড় ফিরিয়া আমার মনের উপর একটা প্রগাঢ় ছাপ মারিয়া দিয়া আর একদিকে চলিয়া গেল।
আজ আমার সেই দিনের অনেক কথাই মনে পড়িতেছে। শুধু এইটি স্মরণ করিতে পারিতেছি নাÑঐ অদ্ভুত ছেলেটিকে সেদিন ভালবাসিয়াছিলাম, কিংবা তাহার প্রকাশ্যে সিদ্ধি ও ধূমপান করার জন্য তাহাকে মনে মনে ঘৃণা করিয়াছিলাম।
তারপরে মাসখানেক গত হইয়াছে। সেদিনের রাত্রিটা যেমন গরম তেমনি অন্ধকার। কোথাও গাছেরএকটি পাতা পর্যন্ত নড়ে না। ছাদের উপর সবাই শুইয়া ছিলাম। বারোটা বাজে, তথাপি কাহারো চক্ষে নিদ্রা নাই। হঠাৎ কি মধুর বংশীস্বরে কানেআসিয়া লাগিল। সহজ রামপ্রসাদী সুর। কত ত শুনিয়াছি, কিন্তু বাঁশিতে যে এমন মুগ্ধ করিয়া দিতে পারে, তাহা জানিতাম না। বাড়ির পূর্ব-দক্ষিণ কোণে একটা প্রকাÐ আম-কাঁঠালের বাগান। ভাগের বাগান, অতএব কেহ খোঁজখবর লইত না। সমস্ত নিবিড় জঙ্গলে পরিণত হইয়া গিয়াছিল। শুধুগরু-বাছুরের যাতায়াতে সেই বনের মধ্য দিয়া সরু একটা পথ পড়িয়াছিল। মনে হইল, যেন সেই বনপথেই বাঁশির সুর ক্রমশঃ নিকটবর্তী হইয়া আসিতেছে। পিসিমা উঠিয়া বসিয়া তাঁহার বড়ছেলেকে উদ্দেশ করিয়া কহিলেন, হাঁ রে নবীন, বাঁশি বাজায় কেÑরায়েদের ইন্দ্র নাকি ? বুঝিলাম ইঁহারা সকলেই ওই বংশীধারীকে চেনেন। বড়দা বলিলেন, সে হতভাগা ছাড়া এমন বাঁশিই বা বাজাবে কে, আর ওই বনের মধ্যেই বা ঢুকবে কে ?
বলিস কি রে ? ও কি গোঁসাই বাগানের ভেতর দিয়ে আসচে নাকি ?
বড়দা বলিলেন, হুঁ।
পিসিমা এই ভয়ঙ্কর অন্ধকারে ওই অদূরবর্তী গভীর জঙ্গলটা স্মরণ করিয়া মনে মনে বোধ করি শিহরিয়া উঠিলেন। ভীতকণ্ঠে প্রশ্ন করিলেন, আচ্ছা, ওর মা কি বারণ করে না ? গোঁসাইবাগানে কত লোক যে সাপের কামড়ে মরেচে, তার সংখ্যা নেইÑআচ্ছা, ও জঙ্গলে এত রাত্তিরে ছোঁড়াটা কেন ?
বড়দা একটুখানি হাসিয়া বলিলেন, আর কেন ! ও-পাড়া থেকে এ-পাড়ায় আসার এই সোজা পথ। যার ভয় নেই, প্রাণের মায়া নেই, সে কেন বড় রাস্তা ঘুরতে যাবে মা ? ওর শিগগির আসা নিয়ে দরকার। তা, সে পথে নদী-নালাই থাক আর সাপখোপ বাঘ-ভালুকই থাক।
ধন্যি ছেলে! বসিয়া পিসিমা একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া চুপ করিলেন। বাঁশির সুর ক্রমশঃ সুস্পষ্ট হইয়া আবার ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হইয়া দূরে মিলাইয়া গেল।
এই সেই ইন্দ্রনাথ। সেদিন ভাবিয়াছিলাম, যদি অতখানি জোর এবং এমনি করিয়া মারামারি করিতে পারিতাম! আর আজ রাত্রে যতক্ষণ না ঘুমাইয়া পড়িলাম, ততক্ষণ কেবলই কামনা করিতে লাগিলামÑযদি অমনি করিয়া বাঁশি বাজাইতে পারিতাম!
কিন্তু কেমন করিয়া ভাব করি! সে যে আমার অনেক উচ্চে। তখন ইস্কুলেও সে আর পড়ে না। শুনিয়াছিলাম, হেডমাস্টার মহাশয় অবিচারে করিয়া তাহার মাথায় গাধার টুপি দিবার আয়োজন করিতেই সে মর্মাহত হইয়া অকস্মাৎ হেডমাস্টারের পিঠের উপর কি একা করিয়া ঘৃণাভরে ইস্কুলের রেলিঙ ডিঙ্গাইয়া বাড়ি চলিয়া আসিয়াছিল, আর যায় নাই। অনেক দিন পরে তাহার মুখেরই শুনিয়াছিলাম, সে অপরাধ অতি অকিঞ্চিৎ। হিন্দুস্থানী পÐিতজীর ক্লাশের মধ্যেই নিদ্রাকর্ষণ হইত। এমনি এক সময়েসে তাহার গ্রন্থিবদ্ধ শিখাটি কাঁচি দিযা কাটিয়া ছোট করিয়া দিয়াছিল মাত্র। বিশেষ কিছু অনিষ্ট হয় নাই। কারণ, পÐিতজী বাড়ি গিয়া তাঁহার নিজের শিখাটি নিজের চাপকানের পকেটেই করিয়াছিলেনÑখোয়া যায় নাই। তথাপি কেনযে পÐিতের রাগ পড়ে নাই, এবং হেডমাস্টারের কাছে নালিশ করিয়াছিলেনÑ সে কথা আজ পর্যন্ত ইন্দ্র বুঝিতে পারে নাই, কিন্তু এটাসে ঠিক বুঝিয়াছিল যে, ইস্কুল হইতে রেলিঙ ডিঙ্গাইয়া বাড়িআসিবারপথ প্রস্তুত করিয়া লইলে, তথায় ফিরিয়া যাইবারপথ গেটের ভিতর দিয়া আর প্রায়ই খোলা থাকে না।কিন্তু খোলা ছিল, কি ছিল না, এ দেখিবার শখও তাহার আদৌ ছিল না। এমন কি, মাথারউপর দশ-বিশজন অভিভাবক থাকা সত্তে¡ও কেহ কোনমতেই আর তাহার মুখ বিদ্যালয়ের অভিমুখে ফিরাইতে সক্ষম হইল না। ইন্দ্র কলম ফেলিয়া দিয়া নেওকার দাঁড় হতে তুলিল। তখন হইতে সে সারাদিন গঙ্গায় নৌকার উপর। হঠাৎ হয়ত একদিন সে পশ্চিমের গঙ্গার একটানা স্রোতে পানসি ভাসাইয়া দিয়া, হাল ধরিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। দশ-পনের দিন আর তাহার কোনো উদ্দেশ্যই পাওয়া গেল না। এমনি একদিন উদ্দেশ্যবিহীন ভাসিয়া যাওয়ার মুখেই তাহার সহিত আমার একান্ত বাঞ্ছিত মিলনের গ্রন্থি সৃদৃঢ় হইবার অবকাশ ঘটিয়াছিল। তাই এত কথা আমার বলা।
কিন্তু যাহারা আমাকে জানে, তাহারা বলিবে, তোমার ত এ সাজে নাই বাপু! গরীবের ছেলে লেখাপড়া শিখিতে গ্রাম ছাড়িয়া পরের বাড়িতে আসিয়াছিলামÑতাহার সহিত তুমি মিশিলেই বা কেন ? এবং মিশিবার জন্য এত ব্যাকুল হইলেই বা কেন ? তা না হইলে তা আজ তোমারÑ
থাক্থাক্ আর বলিয়া কাজ নাই্ সহস্র লোক এ কথা আমাকে লক্ষবার বলিয়াছে; নিজেকে নিজে আমি এ প্রশ্ন কোটিবার করিয়াছি। কিন্তু সব মিছে। কেন যেÑএ জবাব তোমরাও দিতে পারিবে না। যিনি সব জানেন, তিনিই শুধু বলিয়া দিতে পারেনÑকেন এত লোক ছাড়িয়া সেই একটা হতভাগার প্রতিই আমার সমস্ত মন-প্রাণটা পড়িয়া থাকিত, এবং কেন সেই মন্দের সঙ্গে মিলিবার জন্যই আমার দেহের প্রতি কণাটি পর্যন্ত উন্মুখ হইয়া উঠিয়াছিল।
সে দিনটা আমার খুব মনে পড়ে। সারাদিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টিাত হইয়াও শেষ হয় নাই। শ্রাবণের সমস্ত আকাশটা ঘনমেঘে সমাচ্ছন্ন হইয়া আছে, এবং সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইতে না হইতেই চারিদিক গাঢ় অন্ধকারে ছাইয়া গিয়াছেÑসকাল সকাল খাইয়া লইয়া আমরা কয় ভাই নিত্যপ্রথামত বাইরে বৈঠকখানায় ঢালা-বিছানার উপর রেড়ির তেলের সেজ জ্বালাইয়া বই খুলিয়া বসিয়া গিয়াছি। বাহিরের বারান্দায় একদিকে পেিশমশায় ক্যাম্বিশের খাটের উপর শুউয়া তাঁহার সন্ধ্যাতন্দ্রাটুকু উপভোগ করিতেছেন, এবং অন্যদিকে বসিয়া বৃদ্ধ রামকমল ভট্চায আফিং খাইয়া, অন্ধকারে চোখ বুঝিয়া, থেলো হুঁকায় ধুমপান করিতেছেন। দেউড়িতে হিন্দুস্থানী পেয়াদাদের তুলসীদাসি সুর শুনা যাইতেছে, বেং ভিতরে আমরা তিন ভাই, মেজদা কঠোর তত্ত¡াবধানে নিঃশব্দে বিদ্যাভাস করিতেছ্ িছোদা, যতীনদা ও আমি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি এবং গম্ভীর প্রকৃতি মেজদা বার-দুই এন্ট্রান্স ফেল করিবার পর গভীর মনোযোগের সহিত তৃতীয়বারের জন্য প্রস্তুত হইতেছে। তাঁহার প্রচÐ শাসনের একমুহূর্তে কাহারো সময় নষ্ট করিবার জো ছিল না। আমাদেরপড়ার সময় ছলসাড়ে সাতটা হইতে নয়টা। এই সময়টুকার মধ্যে কথাবার্তা কহিয়া মেজদা’র পাশের পড়ার বিঘœ না করি, এই জন্য তিনি নিজে প্রত্যহ পড়িতে বসিয়াই কাঁচি দিয়া কাগজ কাটয়া বিশ- তিশখানি টিকিটের মত করিতেন। তাহার কোনটাতে লেখা থাকিত, ‘বাইরে’, কোনটাতে ‘থুথুফেলা’, কোনটাতে ‘নাকঝাড়া’, কোনটাতে ‘ তেষ্টা পাওয়া’ ইত্যাদি। যতীনদা একটা ‘নাকঝাড়া’ টিকিট লইয়া মেজদা’র সমুখে ধরিয়া দিলেন। মেজদা তাহাতে স্বাক্ষর করিয়া লিখিয়া দিলেনÑহুঁÑআটটা তেত্রিশ মিনিট হইতে আটটা সাড়ে চৌত্রিশ মিনিট পর্যন্ত, অর্থাৎ এই সময়টুকার জন্য সে নাক ঝাড়িতে যাইতে পারে। ছুটি পাইয়া যতীনদা টিকিট হাতে উঠিয়া যাইতেই ছোড়দা ‘থুথুফেলা’ টিকিট পেশ করিলেন। মেজদা ‘না’ লিখিয়া দিলেন। কাজেই ছোড়দা মুখ ভারি করিয়া লিখিলেনÑহুঁÑ আটটা একচল্লিশ মিনিট হইতে আটটা সাতচল্লিশ মিনিট পর্যন্ত। পরওয়ানা লইয়া ছোড়দা হাসিমুখে বাহির করিয়াসেই টিকিট গঁদ দিয়া আঁটিয়া দাখিল করিলেন। মেজদা ঘড়ি দেখিয়া সময় মিলাইয়া একটা খাতা বাহির করিয়া সেই টিকিট গঁদ দিয়া আঁটিয়া রাখিলেন। সমস্ত সাজ-সরঞ্জাম তাঁহার কাছেই মজুত থাকিত। সপ্তাহ পরে এই সব টিকিটের সময় ধরিয়া কৈফিয়ত তলব করা হইত।
এইরূপে মেজদা’র অত্যন্ত সতর্কতায় এবং সুশৃঙ্খলায় আমাদের এবং তাঁহার নিজের কাহারও এতটুকু সময় নষ্ট হইতে পাইত না। প্রত্যহ এইদেড়ঘণ্টা কাল অতিশয় বিদ্যাভ্যাস করিয়া রাত্রি নয়টার সময় আমরা যখন বাড়ির ভিতর শুইতে আসতাতখন মা সরস্বতী ঘরে চৌকাঠ পর্যন্ত আমাদিগকে আগাইয়া দিয়া যাইতে; এবং পরদিন ইস্কুলে ক্লাশের মধ্যে যে-সকল সম্মান-সৌভাগ্য লাভ করিয়া ঘরে ফিরিতাম, সে ত আপনারা বুঝিতেই পারিতেছেন। কিন্তু মেজদা’র দুভৃাগ্য, তাঁহার নির্বোধ পরীক্ষাগুলা তাঁহাকে কোনদিন চিনিতেই পারিল না। নিজের এবং পরের বিদ্যাশিক্ষারপ্রতি এরূপ প্রবল অনুরাগ, সময়ের মূল্য সম্বন্ধে সূ² দায়িত্ববোধ থাকা সত্তে¡ও, তাঁহাকে বারংবার ফেল করিয়াই দিতে লাগিল। ইহাই অদৃষ্টে অন্ধ বিচার। যাকÑএখন আর সে দুঃখে জানাইয়া কি হইবে।
সে রাত্রেও ঘরের বাহিরে ঐ জমাট অন্ধকার এবং বারান্দায় তন্দ্রাভিভূত সেই দুটো বুড়ো। ভিতরে মৃদু দীপালোকের সম্মুখে গভীর-অধ্যয়নরত আমরা চারিটি প্রাণী। ছোড়দা ফিরিয়া আসায় তৃষ্ণায় আমার একেবারে বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল। কাজেই টিকিট পেশ করিয়া উন্মুখ হইয়া রহিলাম। মেজদা তাঁহার সেই টিকিট-আঁটা খাতার উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়া পরীক্ষা করিতে লাগিলেনÑতৃষ্ণা পাওয়াটা আমার আইনসঙ্গত কিনা, অর্থাৎ কাল-পরশু কি পরিমাণে জল খাইয়াছিলাম।
অবস্মাৎ আমার ঠিক পিঠের কাছে একটা ‘হুম’ শব্দ এবং সঙ্গে সঙ্গে ছোড়দা ও যতীনদার সমবেত আর্তকণ্ঠের গগণভেদী রৈ রৈ চিৎকারÑওরে বাবা রে, খেয়ে ফেল্লে রে! কিসে ইহাদিগকে খাইয়া ফেলিল, আমি ঘাড় ফিরাইয়া উল্টাইয়া দিলেন। তখন সেই অন্ধকারের মধ্যে যেন দক্ষযষ্ণ বাধিয়া গেল। মেজদা’র ছির ফিটের ব্যামো। তিনি সেই যে অোঁ-অোঁ করিয়া প্রদীপ উল্টাইয়া চিৎ হইয়া পড়িলেন, আর খাড়া হইলেন না।
ঠেলাঠেলি করিয়া বাহির হইতেই দেখি, পিশেমশাই তাঁর দুই ছেলেকে বগলে চাপিয়া ধরিয়া তাহাদের অপেক্ষাও তেজে চেঁচাইয়া বাড়ি ফাটাইয়া ফেলিতেছেন। এ যেন তিন বাপ-ব্যাটার কে কতখানি হাঁ করিতে পারে, তারই লড়াই চলিতেছে।
এই সুযোগে একটা চোর নাকি ছুটিয়া পলাইতেছিল, দেউড়ির সিপাহীরা তাহাকে ধরিয়া ফেলিয়াছে। পিসেমশাই প্রচÐ চীৎকারে হুকুম দিতেছেনÑআউর মারোÑশালাকে মার ডালো ইত্যাদি।
মুহূর্তকাল মধ্যে আলোয়, চাকর-বাকরে ও পাশের লোকজনে উঠান পরিপূর্ণ হইয়া গেল। দরওয়ান চোরকে মারিতে মারিতে আধমরা করিয়া টানিয়া আলোর সম্মুখে ধাক্কা দিযা ফেলিয়া দিল। তখন চোরের মুখ দেখিয়া বাড়িসুদ্ধ লোকের মুখ শুকাইয়া গেল। এ যে ভট্চায্যিমশাই।
তখন কেহ বা জল, কেহ বা পাখার বাতাস, কেহ বা তাঁহার চোখেমুখে হাত বুলাইয়া দেয়। ওদিকে ঘরের ভিতরে মেজদাকে লইয়া সেই ব্যাপার!
পাখার বাতাস ও জলের ঝাপটায় রামকমল প্রকৃতিস্থ হইয়া ফুঁপাইয়া কাঁদিয়া উঠিলে সবাই প্রশ্ন করিতে লাগিল, আপনি অমন করে ছুটছিলেন কেন ? ভট্চায্যিমশাই কাঁদিতে কহিলেন, বাবা, বাঘ নয়, সে একটা মস্ত ভালুকÑলাফ মেরে বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে এলো।
ছোড়দা ও যতীনদা বারংবার কহিতে লাগিল, ভালুক নয় বাবা, একটা নেকড়ে বাঘ। হুম্ ক’রে ল্যাজ গুটিয়ে পাপোশের উপর বসেছিল।
মেজদা’র চৈতন্য হইলে তিনি নিমীলিতচক্ষে দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া সংক্ষেপে কহিলেন, ‘দি রয়েল বেঙ্গল টাইগার’।
কিন্তু কোথা সে ? মেজদা’র রয়েল বেঙ্গল’ই হোক আর রামকমলের ‘মস্ত ভালুক’ই হোক, সে আসিলই বা কিরূপে, গেলেই বা কোথায় ? এতগুলো লোক যখন দেখিয়াছে, তখন সে একটা কিছু বটেই।
তখন কেহ বা বিশ্বাস করিল, কেহ বা করিল না। কিন্তু সবাই লণ্ঠন লইয়া ভয়চকিত নেত্রে চারিদিকে খুঁজিতে লাগিল।
অকস্মাৎ পালোয়ান কিশোরী সিং ‘উহ বয়ঠা’ বলিয়াই একলাফে একেবারে বারান্দায় উপর। তারপর সেও এক ঠেলাঠেলি কাÐ। এতগুলো লোক, সবাই একসঙ্গে বারান্দায় উঠিতে চায়, কাহারো মুহূত বিলম্ব সয় না। উঠানের একপ্রান্তে একটা ডালিম গাছ ছিল, দেখা গেল, তাহারই ঝোপের মধ্যে বসিয়া একটা বৃহৎ জানোয়ার। বাঘের ভিড়ের মধ্যে হইতে পিসেমশায়ের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর আসিতে লাগিলÑসড়কিও লাওÑবন্দুন লাও। আমাদের পাশের বাড়ির গগনবাবুদের এটা মুঙ্গেরী গাদা বন্দুক ছিল; লক্ষ্য সেই অস্ত্রটার উপর। ‘রাও’ ত বটে, কিন্তু আনে কে ? ডালিম গাছটা যে দরজার কাছেই, এবং তাহারই মধ্যেযে বাঘ বসিয়া! হিন্দুস্থানীরা সাড়া দেয় নাÑতামাশা দেখিতে যাহারা বাড়ি ঢুকিয়াছিল, তাহারাও নিস্তব্ধ।
এমনি বিপদের সময়ে হঠাৎ কোথা হইতে ইন্দ্র আসিয়া উপস্থিত। সে বোধ করি পরেই ব্যাপারটা শুনিয়া লইয়া একা নির্ভয়ে উঠানে নামিয়া গিয়া লণ্ঠন তুলিয়া বাঘ দেখিতে লাগিল।
দোতলার জানালা হইতে মেয়েরা রুদ্ধ নিঃশ্বাসে এই ডাকাত ছেলেটির পানে চাহিয়া দুর্গানাম জপিতে লাগির। পিসিমা ত ভয়ে কাঁদিয়াই ফেলিলেন। নীচে ভিড়ের মধ্যে গাদাগাদি দাঁড়াইয়া হিন্দুস্থানী সিপাহারী তাহাকে সাহস দিতে লাগিল এবং এক-একটা অস্ত্র পাইলেই নামিয়া আসে, এমন আভাসও দিল।
বেশ করিয়া দেখিয়া ইন্দ্র কহিল, দ্বারিকবাবু, এ বাঘ নয় বোধ হয়। তাহার কথাটা শেষ হইতে না হইতেই সেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার দুই থাবা জোড় করিয়া মানুষের গলায় কাঁদিয়া উঠিল। পরিষ্কার বাঙ্গালা করিয়া কহিল, ভট্চায্যিমশাই খড়ম হাতে সর্বাগ্রে দেখিয়াছিল, সুতরাং তাহারই দাবি সর্বাপেক্ষা অধিক বলিয়া, সেই গিয়া তাহার কান ধরিয়া হিড়হিড় করিয়া টানিয়া আনিল। ভটচায্যিমশাই তাহার পিঠের উপর খড়মের এক ঘা বসাইয়া দিয়া রাগের মাথায় হিন্দী বলিতে লাগিলেন, এই হারামজাদা বজ্জাতকে বাস্তে আমার গতর চূর্ণ হো গিয়া। খোট্টা শালার ব্যাটারা আমাকে যেন কিলায়কে পাকায় দিয়াÑ
ছিনাথের বাড়ি বারাসতে সে প্রতি বৎসর এই সময়টায় একবার করিয়া রোজগার করিতে আসে। কালও এ বাড়িতেসে নারদ সাজিয়া গান শুনাইয়া গিয়াছিল।
সে একবার ভটচায্যিমশায়ের, একবার পিসেমশায়ের পায়ে পড়িতে লাগিল। কহির, ছেলেরা অমন করিয়া ভয় প াইয়া প্রদীপ উলটাইয়া মহামারী কাÐ বাধাইয়াতোলায় সে নিজেও ভয় পাইয়া গাছের আড়ালে গিযা লকুইয়াছিল। ভাবিযাছির, একটু ঠান্ডা হইলেই বাহির হইয়া তাহার সাজ দেখাইয়া যাইবে। কিন্তু ব্যাপার উত্তরোত্তর এমন হইয়া উঠিল যে, তাহার আর সাহসে কুলাইল না।
ছিনাত কাকুতি-মিনতি করিতে লাগিল; কিন্তু পিসেমশায়ের আর রাগ পড়ে না। পিসিমা অমন উপর হইতে কহিলেন, তোমাদের ভাগ্যি ভালো যে সত্যিকারের বাঘ-ভালুক বার হয়নি। যে বীরপুরুষ তোমরা, আর তোমার দারওয়ানরা। ছেড়ে দাও বেচারীকে। আর দূর করে দাও দেউড়ির ঐ খোট্টাগুলোকে। একটা ছোট ছেলের যা সাহস, একবাড়ি লোকের তা নেই। পিসেমশাই কোন কথাই শুনিলেন না, বরং পিসিমার এই অভিযোগে চোখ পাকাইয়া এমন একটা ভাব ধারণ করিলেন যে, ইচ্ছা করিলেই তিনি এইসকল কথার যথেষ্ট সদুত্তর দিতে পারেন। কিন্তু স্ত্রীলোকের কথার উত্তর দিতে যাওয়াই পুরুষমানুষের পক্ষে অপমানকর; তাই আরও গরম হইয়া হুকুম দিলেন, উহার ল্যাজ কাটিয়া দাও তখন, তাহার সেই রঙিন, কাপড় জড়ানো সুদীর্ঘ খড়ের ল্যাজ কাটিয়া লইয়া তাহাকে তাড়াইয়া দেওয়া হইল। পিসিমা উপর হইতে রাগ করিয়া বলিলেন, রেখে দাও। তোমার ওটা অনেক কাজে লাগবে।
ইন্দ্র আমার দিকে চাহিয়া কহিল, তুই বুঝি এই বাড়িতে থাকিস শ্রীকান্ত ?
আমি কহিলাম, হ্যাঁ। তুমি এত রাত্তিরে কোথায় যাচ্চ ?
ইন্দ্র হাসিয়া কহিল, রাত্তির কোথায় রে, এই সন্ধ্যা। আমি যাচ্ছি আমার ডিঙিতেÑমাছধরে আনতে, যাবি ?
আমি সভয়ে জিজ্ঞাসা করিলাম, এত অন্ধকারে ডিঙিতে চড়বে ?
সে আবার হাসিল। কহিল, ভয় কিরে! সেই ত মজা। তা ছাড়া অন্ধকার না হলে কি মাছ পাওয়া যায় ? সাঁতার জানিস ?
খুব জানি।
তবে আয় ভাই। বলিয়া সে আমার একটা হাত ধরিল। কহিল, আমি একলা এত স্রোতে উজোন বাইতে পারিনেÑএকজন কাউকে খুঁজি, যে ভয় পায় না।
আমি আর কথা কহিলাম না। তাহার হাত ধরিয়া নিঃশব্দে রাস্তার উপর আসিয়া উপস্থিত হইলাম। প্রথমটা আমার নিজেরই যেন বিশ্বাস হইল নাÑআমি সত্যিই এই রাত্রে নৌকায় চলিয়াছি। কারণ, যে আহŸান এই স্তব্ধ নিবিড় নিশিতে এই বাড়ির সমস্ত কঠিন শাসনপাশ তুচ্ছ করিয়া দিয়া, একাকী বাহির হইয়া আসিয়াছি, সে যে কত বড় আকর্ষণ, তাহা তখন বিচার করিয়া দেখিবার আমার সাধ্যই ছিল না। অনতিকাল পরে গোঁসাই বাগানের সেই ভয়ঙ্কর বনপথের সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইলাম এবং ইন্দ্রকে অনুসরণ করিয়া স্বপ্নাবিষ্টের মতো তাহা অতিক্রম করিয়া গঙ্গার তীরে আসিয়া দাঁড়াইলাম।
খাঁড়া কাঁকড়ের পাড়। মাথার উপর একটা বহু প্রাচীন অশ্ববৃক্ষ মূর্তিমান অন্ধকারের মতো নীরবে দাঁড়াইয়া আছে এবং তাহারই প্রায় ত্রিশ হাতে নীচে সূচিভেদ্য আঁধার-তলে পরিপূর্ণ বর্ষার গভীর জলস্রোত ধাক্কা খাইয়া আবর্ত রচিয়া উদ্দাম হইয়া ছুটিয়াছ্ েদেখিলাম, সেইখানে ইন্দ্রের তরীখানি বাঁধা আছে। উপর হইতে মনে হইল, সেই সুতীব্র জলধারা মুখেএকখানি ছোট্ট মোচার খোলা যেন নিরন্তর কেবলই আছাড় খাইয়া মরিতেছে।
আমি নিজেও নিতান্ত ভীরু ছিলাম না। কিন্তু ইন্দ্র যখন উপর হইতে নীচে একগাছি রজ্জু দেখাইয়া কহিল, ডিঙির এইদড়ি ধরেপাটিপে টিপে নেবে যা, সাবধানে নাবিস, পিছলে পড়ে গেলে আর তোকে খুঁজে পাওয়া যাবে না; তখন যথাথই আমার বুক কাঁপিয়া উঠিল। মনে হইল, ইহা অসম্ভব। কিন্তু তথাপি আমার ত দড়ি অবলম্বন আছে, কিন্তু তুমি ?
সে কহিল, তুই নেবে গেলেই আমি দড়ি খুলে দিয়ে নাব্ব। ভয় নেই, আমার নেবে যাবার অনেক ঘাসের শিকড় ঝুলে আছে।

দুই
কয়েক মুহূর্তে ঘনান্ধকারে সম্মুখ এবং পশ্চাৎ লেপিয়া একাকার হইয়া গেল। রহিল শুধু দক্ষিণ ও বামে সীমান্তরাল প্রসারিত বিপুল উদ্দাম জলস্রোত এবং তাহারই উপর তীব্রগতিশীলা এই ক্ষুদ্র তরণীটি এবং কিশোরবয়স্ক দুটি বালক। প্রকৃতিদেবীর সেই অপরিমেয় গম্ভীর রূপ উপলব্ধি করিবার বযস তাহাদের নহে, এবং কিশোরবয়স্ক দুটি বালক। প্রকৃতিদেবীর সেই অপরিমেয় গম্ভীর রূপ উপলব্ধি করিবার বয়স তাহাদের নহে, কিন্তু সে কথা আমি আজও ভুলিতে পারি নাই। ভাবলেশহীন, নিষ্কম্প, নিস্তব্ধ, নিঃসঙ্গ নিশীথিনীর সে যেন এক বিরাট কালমূর্তি। নিবিড় কালো চুলে দ্যুলোকে ও ভূলোক আচ্ছন্ন হইয়া গেছে, এবং সেই সূচিভেদ্য অন্ধকার বিদীর্ণ করিয়া করাল দংষ্ট্রারেখার ন্যায় দিগন্তবিস্তৃত এই তীব্র জলধারা হইতে কি একপ্রকারের অপরূপ স্তিমিত দ্যুতি নিষ্ঠুর চাপাহাসির মত বিচ্ছুরিত হইতেছে। আশপাশে সম্মুখে কোথাও না উন্মত্ত জলস্রোত গভীর তলদেশে ঘা খাইয়া কোথাও বা অপ্রতিহত জলপ্রবাহ পাগল হইয়া ধাইয়া চলিয়াছে।
আমাদেরনৌকা কোণাকুণি পাড়ি দিতেছে, এইমাত্র বুঝিয়াছি। কিন্তু পরপারেরএই দুর্ভেদ্র অন্ধকারের কোনখানে যে লক্ষ্য স্থির করিয়া ইন্দ্র লাল ধরিয়া নিঃশব্দে বসিয়া আছে তাহার কিছুই জানি না। এই বয়সেই সে যে কত বড় পাকা মাঝি, তখন তাহা বুঝি নাই। হঠাৎ সে কথা কহিল, কি রে শ্রীকান্ত, ভয় করে ?
আমি বলিলাম, নাঃÑ
ইন্দ্র খুশি হইয়া কহির, এই ত চাইÑসাঁতার জানলে আবার ভয় কিসের! প্রত্যুত্তরে আমি একটি ছোট্ট নিশ্বাস চাপিয়া ফেলিলামÑপাছ সে শুনিতে পায়। কিন্তু এই গাঢ় অন্ধকার রাত্রিতে, এই জলরাশি এবং এই দুর্জয় স্রোতের সঙ্গে সাঁতার জানা এবং না-জানার পার্থক্য যে কি, তাহা ভাবিয়া পাইলাম না। সেও আরকোনো কথা কহিল না। বহুক্ষণ এইভাবে চলার পরে কি একটা যেন শোনা গেলÑঅস্ফুট এবং ক্ষীণ, কিন্তু নৌকা যত অগ্রসর হইতে লাগিল, ততই সে শব্দ স্পষ্ট এবং প্রবল হইতে লাগিল। যেন বহুদূরাগত কাহাদের ক্রুব্ধ আহŸান। যেন কত বাধাবিঘœ ঠেলিয়া ডিঙ্গাইয়া সে আহŸান আমাদের কানে আসিয়া পৌঁছিয়াছÑএমনি শ্রান্ত, অথচ বিরাম নাই, বিচ্ছেদ নাইÑক্রোধ যেন তাহাদের কমেও না, বাড়েও না, থামিতেও চাহে না। মাঝে মাঝে এক একবার ঝুপঝাপ শব্দ। জিজ্ঞাসা করিলাম, ইন্দ্র, ও কিসের আওয়াজ শোনা যায়। সে নৌকার মুখটা আর একটু সোজা করিযা দিয়া কহিল, জলের স্রোতে ওপারের বালির পার ভাঙার শব্দ।
জিজ্ঞাসা করিলাম, কত বড় পাড় ? কেমন স্রোত ?
সে ভয়ানক স্রোত। ওঃ তাইত, কাল জল হয়ে গেছে, আজ ত তলা দিয়ে যাওয়া যাবে না। একটা পাড় ভেঙ্গে পড়লে ডিঙ্গিসুদ্ধ আমরা সব গুড়িয়ে যাব। তুই দাঁড় টানতে পারিস ?
পারি।
তবে টান।
আমি টানতে শুরু করিলাম। ইন্দ্র কহিল, উইÑযে কালো মত বাঁদিকে দেখা যায় ওটা চড়া। ওরি মধ্যে দিয়ে একটা খালের মত আছে, তারি ভিতর দিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে, কিন্তু খুব আস্তেÑজেলেরা টের পেলে আর ফিরে আসতে হবে না। লগির ঘায়ে ফাটিয়ে পাঁকে পুঁতে দেবে।
এ আবার কি কথা! সভয়ে বলিলাম, তবে ওর ভিতরদিযে নাই গেলে! ইন্দ্র বোধ করি একটু হাসিয়া কহিল, আর ত পথ নেই। এর মধে?্য দিয়ে যেতেই হবে। বড় চড়ার বাঁদিকের বের ঠেলে জাহাজ যেতে পারে নাÑআমরা যাব কি ক’রে ? পিে আসতেপারা যাবে, কিন্তু যাওয়া যাবে না।
তবে মাছ চুরি করে কাজ নেই ভাই, বলিয়াই আমি দাঁড় তুলিয়া ফেলিলামদ। চক্ষের পলকে নৌকা পাক খাইয়া পিছাইয়া গেল। ইন্দ্র বিরক্ত হইয়া ফিসফিস করিয়া তর্জন করিয়া উঠিলÑতবে এলি কেন ? চল তোকে ফিরে রেখে আসিÑকাপুরুষ। তখন চৌদ্দ পার হইয়া পনরয় পড়িয়াছিÑ আমাকে কাপুরুষ ? ঝপাৎ করিয়া দাঁড় ঝিলে ফেলিয়া প্রাণপণে টান দিলাম। ইন্দ্র খুশি হইয়া বলিল, এই ত চাই। কিন্তু আস্তে ভাইÑব্যাটারা ভারী পাজী। আমি ঝাউবনের পাশ দিয়ে মক্কাক্ষেতের ভিতর দিয়ে এমনি বার করে নিয়ে যাব সে শালারা টেরও পাবে না। একটু হাসিয়া কহিল, আর টের পেলেই বা কি ? ধরা কি মুখের কথা! দ্যাখ শ্রীকান্ত, কিচ্ছু ভয় নেইÑব্যাটাদের চারখানা ডিঙি আছে বটে, কিন্তু যদি দেখিস ঘিরে ফেললে বলেÑআর পালাবার জো নেই, থুক ঝুপ করে লাফিয়ে পড়ে এক ডুবে যতদূর পারিস গিয়ে ভেসে উঠলেই হল। এ অন্ধকারে আর দেখবার জোটি নাই, তারপর মজা করে সতুয়ার চড়ায় উঠে ভোরবেলায় সাঁতরে এপারে এসে গঙ্গার ধার ধরে বাড়ি ফিরে গেলেই বাস! কি করবে ব্যাটারা ?
চড়টার নাম শুনিয়াছিলাম, কহিলাম, সুতয়ার চড়া ত ঘোরনালার সমুখে, সে ত অনেক দূর।
ইন্দ্র তাচ্ছিল্যভরে কহিল, কোথায় অনেক দূর ? ছ-সাত কোশও হবে না বোধ হয়। হাত ভেরে গেলে চিত হয়ে থাকলেই হলোÑতা ছাড়া মড়া-পোড়ানো বড় বড় গুঁড়ি কত ভেসে যাবে দেখতে পাবি।
আত্মরক্ষার যে সোজা রাস্তা সে দেখাইয়া দিল, তাহাতে প্রতিবাদের আর কিছু রহিল না। এই দিক চিহ্নহীন অন্ধকার নিশীথ আবর্তসঙ্কুল গভীর তীব্র জলপ্রবাহে সাত ক্রোশ ভাসিয়া গিয়া ভোরের জন্য প্রতীক্ষা করিয়া থাকা। ইহার মধ্যে আর এদিকের তেির উঠিবার জো নাই। দশ-পনর হাত খাড়া উঁচু বালির পাড় মাথায় ভাঙ্গিয়া পড়িবে)ইে দিকেই গঙ্গার ভীষণ ভাঙন ধরিয়া জলস্রোত অর্ধবৃত্তাকারে ছুটিয়া চলিয়াছে।
বস্তুটা- অস্পষ্ট উপলব্ধি করিয়াই আমার বীরহৃদয় সঙ্কুচিত হইয়া বিন্দুবৎ হইয়া গিয়াছিল। কিছুক্ষণ দাঁড় টানিয়া বলিলাম, কিন্তু আমাদের ডিঙির কী হবে ?
ইন্দ্র কহিল, সেদিন ত আমি ঠিক এমনি করেই পালিয়েছিলাম। তারপর দিন এসে ডিঙি কেড়ে নিযে গেলাম, বললাম, নৌকা ঘাট থেকে চুরি ক’রে আর কেউ এনেছিলÑআমি নয়।
তবে এ-সকল কল্পনা নয়Ñএকেবারে হাতেনাতে প্রত্যক্ষ করা সত্য! ক্রমশঃ ডিঙি খাঁড়ির সম্মুখীন হইলে দেখা গেল, জেলেদের নৌকাগুলি সারি দিয়া খাঁড়ির মুখে বাঁধা আছেÑমিটমিট করিয়া আলো জ্বলিতেছে। দুইটি চড়ার মধ্যবর্তী এই জলপ্রবাহটা খালের মতো হইয়া প্রবাহিত হইতেছিল ঘুরিয়া তাহার অপর পারে গিয়া উপস্থিত হইলাম। সেই স্থানটায় জলের বেগে অনেকগুলো মোহনার মত হইয়াছে এবং সব কয়টাকে বুনো ঝাউগাছে একটা হইতে আরএকটাকে আড়াল করিয়া রাখিয়াছে। একটার ভিতর দিয়া খানিকটা বাহিয়া গিয়াই আমরা খালের মধ্যে পড়িলাম। জেলেদের নৌকাগুলো তখন অনেকটা দূরে কালো ঝোপের মতো দেখাইতেছে। আরও খানিকটা অগ্রসর হইয়া গন্তব্য স্থানে পৌঁছান গেল।
ধবির প্রভুরা খালের সিংহদ্বয় আগুলিয়া আছে মনে করিয়া এ স্থানটায় পাহারা রাখে নাই। ইহাকে মায়াজাল বলে। খালে যখন জল থাকে না তখন এ ধার হইতে ওধার পর্যন্ত উঁচু কাঠি শক্ত করিয়া পুঁতিয়া দিয়া তাহারই বর্হিদিকে জাল টাঙ্গাইয়া রাখে। পরে বর্ষার জলস্রোতে বড় বড় রুই-কাতলা ভাসিয়া আসিয়া এই কাঠিতে বাধা পাইয়া লাফাইয়া ওদিকে পড়িতে চায় এবং দড়ির জালে আবব্ধ হইয়া থাকে।
দশ, পনর, বিশ সের রুই-কাৎলা গোটা পাঁচ-ছয় ইন্দ্র চক্ষের নিমেষে নৌকায় তুলিয়া ফেলিল। সেই বিরাটকায় মৎস্যরাজ্যেরা তখন পুচ্ছতাড়নায় ক্ষুদ্র ডিঙিখানা যেন চূর্ণবিচূর্ণ করিয়া দিবার উপক্রম করিতে লাগিল এবং তাহার শব্দও বড় কম হইল না।
এত মাছ কি হবে ভাই ?
কাজ আছে। আর না, পালাই চল। বলিয়া সে জাল ছাড়িয়া দিল। আর দাঁড় টানিবার প্রয়োজন নাই। আমি চুর করিয়া বসিয়া রহিলাম। তখন তেমনি আবার সেই পথেই বাহির হইতে হইবে। অনুকূল স্রোতে মিনিট দুই-তিন খরবেগে ভাঁটাইয়া আসিয়া হঠাৎ একস্থানে একটা দমকা মারিয়া যেন আমাদের এই ক্ষুদ্র ডিঙিটি পাশের ভুট্টা ক্ষেতের মধ্যে গিয়া প্রবেশ করিল। তাহার এই আকস্মিক গতিপরিবর্তনে আমি চকিত হইয়া প্রশ্ন করিলাম, কি ? কি হ’ল
ইন্দ্র আর একটা ঠেলা দিয়া নৌকাখানা আরও খানিকটা ভিতরে পাঠাইয়া দিয়া কহিল, চুপ! শালার টের পেয়েছেÑচারখানা ডিঙি খুলেদিয়েই এদিকে আসছেÑঐ দ্যাখ!
তাই ত বটে! প্রবল? জর-তাড়নায় ছপাছপ শব্দ করিয়া চারখানা নেওকা আমাদের গিলিয়া ফেলিবার জন্য যেন কৃষ্ণকায় দৈত্যের মতো ছুটিয়া আসিতেছে। ওদিকে জাল দিয়া বন্ধু, সমুখেইহারা। পলাইয়া নিষ্কৃতি পাইবার একটুকু স্থান নাই। এই ভুট্টা ক্ষেতের মধ্যেই পুতিয়া ফেলিলেই বা কে নিবারণ করিবে ?
ইতিপূর্বে পাঁচ-ছয় দিন ইন্দ্র ‘চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা’ সপ্রমাণ করিয়া নির্বিঘেœ প্রস্থান করিয়াছে, এতদিন ধরা পড়িয়াও পড়ে নাই, কিন্তু আজ ?
সে মুখে একবার বলিল, ভই নেই। কিন্তু গলাটা তাহার যেন কাঁপিয়া গেল। কিন্তু সে থামিল না। প্রাণপণে লগি ঠেলিয়া ক্রমাগত ভিতরে লুকাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। সমস্ত চড়াটা জলে জলময়। তাহার উপর আট-দশ হাত দীর্ঘ ুট্টা এবং জনারের গাছ। ভিতরে এই দুটি চোর। কোথাও জল এক বুক, কেথাও এক কোমার, কোথাও হাঁটুর অধিক নয়। উপরে নিবিড় অন্ধকার, সম্মুখে পশ্চাতে দক্ষিণে বামে দুর্ভেদ্য জঙ্গল, পাঁকে লগি পুঁতিয়া যাইতে লাগিল, নৌকা আর একহাতও অগ্রসর হয় না। পিছন হইতে জেলেদের অস্পষ্ট কথাবার্তা কানে আসিতে লাগিল, কিছু একটা সন্দেহ করিয়াই যে তাহারা আসিয়াছে এবং তখনো খুঁজিয়া ফিরিতেছে, তাহাতে লেশমাত্র সংশয় নাই।
সহসা নৌকাটা একটু কাত হইয়াই সোজা হইল। চাহিয়া দেখি, আমি একাকী বসিয়া আছি, দ্বিতীয় ব্যক্তি নাই।
নীচে কেন ?
ডিঙি টেনে বের করতে হবে। আমার কোমরে দড়ি বাঁধা আছে।
টেনে কোথায় বার করবে ?
ও গঙ্গায়। খানিকটাযেতে পারলেই বড় গাঙে পড়ব।
শুনিয়া চুপ করিয়া গেলাম। ক্রমশঃ ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। অকস্মাৎ কিছুদূরে বনের মধ্যে ক্যানেস্ত্রা পিটানো ও চেরা বাঁশের কটাকট শব্দে চমকাইযা উঠিলাম। সভয়ে জিজ্ঞাসা করিলাম, ও কি ভাই ? সে উত্তর দিল, চাষীরা মাচারউপরে বসে বুনো শুয়ার তাড়াচ্চে।
বুনো শুয়ার! কোথায় সে ? ইন্দ্র নৌকা টানিতে ট ানিতে তাচ্ছিল্যভরে কহিল, আমি কি দেখতে পাচ্চি যে বলব ? আছেই কোথাও এইখানে। জবাব শুনিযা স্তব্ধ হইয়া রহিলাম। ভাবিলাম, কার মুখ দেখিযা আজ প্রভাত হইয়াছিল। সন্ধ্যারাত্রে আজই ঘরের মধ্যে বাঘের হাতে পড়িয়াছিলাম। এ জঙ্গলে যে বুনো শুয়ারের হাতে পড়িব, তাহাতে আর বিচিত্র কি ? তথাপি আমি ত নৌকায় বসিয়া; কিন্তু ঐ লোকটি একবুক কাদা ও জলের মধ্যে এই বনের ভিতরে। এক পা নড়িবার চড়িবার উপায় পর্যন্ত নাই। মিনিট-পনর এইভাবে কাটিল। আর একটা জিনিস লক্ষ্য করিতেছিলাম। প্রায়ই দেখিতেছি, কাছাকাছি এক-একটা জনার, ভুট্টাগাছের ডগা ভয়ানক আন্দোলিত হইয়া ‘ছপাৎ’ করিয়া শব্দ হইতেছে।একটা প্রায় আমার হাতের কাছেই। সশঙ্কিত হইয়া সেদিকে ইন্দ্রের মনোযোগ আকৃষ্ট করিলাম। ধাড়ী শুয়ার না হইলেও বাচ্চা-টাচ্চা নয় ত ?
ইন্দ্র অত্যন্ত সহজভাবে কহিল, ও কিছু নাÑসাপ জড়িয়ে আছে; তাড়া পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছ্ ে
কিছু নাÑসাপ! শিহরিয়া নৌকার মাঝখানে জড়সড় হইয়া বসিলাম। অস্ফুটে কহিলাম, কি সাপ ভাই ?
ইন্দ্র কহিল, সব রকম আছে, ঢোঁড়া বোড়া, গোখরো, করেতÑজলে ভেসে এসে গাছে জড়িয়ে আছেÑকোথাও ডাঙা নেই দেখচিস নে ?
সে ত দেখচি। কিন্তু ভয়ে যে পায়ের নখ হইতে মাথার চুল পর্যন্ত আমার কাঁটা দিয়া রহিল। সে লোকটি কিন্তু ভ্রæক্ষেপমাত্র করিল না, নিজের কাজ করিতে করতে বলিতে লাগিল, কিন্তু কামড়ায় না। ওরা নিজেরাই ভয়ে মরচে+দুটো-তিনটে ত আমার গাঁ ঘেষে পালালো। এক-একটা মস্ত বড়Ñসেগুলো বোড়া টোড়া হবে বোধ হয। আর কামড়ালেই বা কি করব। মরতে একদিন ত হবেই ভাই! এমনি আরও কত কি সে মৃদু স্বাভাবিক কণ্ঠে বলিতে বলিতে চলিল, আমার কানে কতক পৌঁছিল কতক পৌঁছিল না। আমি নির্বাকÑনিস্পন্দকাঠের মতো আড়ষ্ট হইয়া একস্থানে একভাবে বসিয়া রহিলাম। নিশ্বাস ফেলিতেও যেন ভয় করিতে লাগিলÑছফাৎ করিয়া একটা যদি নৌকার উপরেই পড়ে!
কিন্তু সেই যাই হোক ওই লোকটি কি! মানুষ ? দেবতা ? পিশাচ ? কে ও ? কার সঙ্গে এই বনের মধ্যে ঘুরিতেছি ? যদি মানুষই হয়, তবে ভয বলিয়া কোন ব্তু যে বিশ্বসংসারে আছে, সে কথা কি ও জানেও না! বুকখানা কি পাথর দিয়া তৈরি ? সেটা কি আমাদের মত সঙ্কুচিত বিস্ফারিত হয় না ? তবে যে সেদিন মাঠের মধ্যে সকলে পলাইয়া গেলে, সে নিতান্ত অপরিচিত আমাকে একাকী নির্বিঘেœ বাহির করিবার জন্য শত্রæর মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিল, সে দয়ামায়াও কি ওই পাথরের মধ্যেই নিহিত ছিল। আর আজ ? সমস্ত বিপদের বার্তা তন্ন তন্ন করিয়া জানিয়া শুনিয়া নিঃশব্দে অনুণ্ঠিতচিত্তে এই ভয়াবহ, অতি ভীষণ মৃত্যুর মুখে নামিয়া দাঁড়াইল, একবার একটা মুখের অনুরোধও করিল নাÑশ্রীকান্ত, তুই একবার নেমে যা’। সে ত জোর করিয়াই আমাকে নামাইয়া দিযা নৌকা টানাইতে পারিত! এ ত শুধু খেল নয়! জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াইয়া এই স্বার্থত্যাগএই বয়সে কয়টা লোক করিয়াছে! ঐ যে বিনা আড়ম্বরে সামান্র ভাবে বলিয়াছিলÑমরতেএকদিনত হবেইÑএমন সত্য কথা বলিতে কয়টা মানুষকে দেখা যায় ? সে-ই আমাকে এই বিপদের মধ্যে টানিয়া আনিয়াছে সত্য, কিন্তু সে যাই হোক, তাহার এত বড় স্বার্থত্যাগ আমি মানুষের দেহ ধরিয়া ভুলিয়া যাই কেমন করিয়া? কেমন করিয়া ভুলি, যাহার হৃদয়ের ভিতর হইতে এত বড় অযাচিত দান এতই সহজে বাহির হইয়া আসিলÑসেহৃদয় দিয়া কে গড়িয়া দিয়ছিল। তারপরে কাল কত সুখ-দুঃখের ভিতর দিয়া আজ এই বার্ধক্যের উপনীত হইয়াছি, কত দেশ, কত প্রান্তর, কত নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল ঘাঁটিয়া ফিরিয়াছি, কত প্রকারের মানুষই না এই দুটো চোখে পড়িয়াছে, কিন্তু এত বড় মহাপ্রাণ ত আর কখনো দেখিতে পাই নাই! কিন্তু সে আর নেই। অকস্মাৎ একদিন যেন বদুবুদের মতো শূন্যে মিলাইয়া গেল। আজ মনে পড়িয়া এই দুটো শুষ্ক চোখ জলে ভাসিয়া যাইতেছেÑকেবল একটা নিষ্ফল অভিমান হৃদয়ের তলদেশ আরোড়িত করিয়া উপরের দিকে ফেনাইয়া উঠিতেছে। সৃষ্টিকর্তা! এই অদ্ভুত অপার্থিব বস্তু কেনই বা সৃষ্টি করিয়া পাঠাইয়াছিলে, এবং কেনইবা তাহা এমন ব্যর্থ করিয়া প্রত্যাহার করিলে! বড় ব্যথায় আমার এই অসহিষ্ণু মন আজ বারংবার এই প্রশ্নই করিতেছেÑভগবান! টাকাকড়ি, ধন দৌলত, বিদ্যাবুদ্ধি ঢের ত তোমার অফুরন্ত ভাÐার হইতে দিতেছ দেখিতেছি, কিন্ত এত বড় একটা মহাপ্রাণ আজ পর্যন্তু তুমিই বা কয়টা দিতে পারিলে ?
যাক সেকথা। ক্রমশঃ ঘোর কলকল্লোল নিকটবর্তী হইতেছে, তাহা উপলব্ধি করিতেছিলাম, অতএব আর প্রশ্ন না করিয়াই বুঝিলাম। বেশ অনুভব করিতেছিলাম, জলের বেগ বর্ধিত হইতেছে, এবং ধূসর ফেনপুঞ্জ বিস্তৃত বালুকারাশির ভ্রমোৎপাদন করিতেছে। ইন্দ্র আসিয়া নৌকায় উঠিল এবং বোটে হাতে করিয়া সম্মুখবর্তী উদ্দাম স্রোতের জন্য প্রস্তুত হইয়া বসিল। কহিল, আর ভয় নেই, বড় গাঙে এসে পড়েচি। মে মনে কহিলাম ভয় না থাকে ভালোই কিন্তু কিসে যে তোমার ভয় আছে, তাও্র তো বুঝিলাম না। পরক্ষণেই সমস্ত নৌকাটা আপাদমস্তক একবার যেন শিহরিয়া উঠিল, এবং চক্ষের পলক না ফেলিতেই দেখিলাম, তাহা বড় গাঙের স্রোত ধরিয়া উল্কাবেগে ছুটিয়া চলিয়াছে।
তখন ছিন্নভিন্ন মেঘের আড়ালে বোধ করি যেন চাঁদ উঠিতেছিল! কারণ, যে অন্ধকারের মধ্যে যাত্রা করিয়াছিলাম, সে অন্ধকার আর ছিল না। এখন অনেক দূর পর্যন্ত অস্পষ্ট হইলেও দেখা যাইতেছিল। দেখিলাম,বনঝাউ এবং ভুট্টা জনারের চড়া ডান দিকে রাখিয়া নৌকা আমাদের সোজা চলিতেই লাগিল।

তিন
বড় ঘুম পেয়েছে ইন্দ্র, বড়ি ফিরে চল না ভাই।
ইন্দ্র-একটুখানি হাসিয়া ঠিক যেন মেয়েমানুষের মত স্নেহার্দ কোমল স্বরে কথা কহিল। বলিল, ঘুম ত পাবার কথাই ভাই ! কি করব শ্রীকান্ত, আজ একটু দেরি হবেইÑঅনেক কাজ রয়েছে। আচ্ছা, এক কাজ কর না কেন ? ঐখানে একটু শুয়ে ঘুমিয়ে নে না ?
আর দ্বিতীয় অনুরোধ করিতে হইল না। আমি গুটিশুটি হইয়া সেই তক্তাখানির উপর শুইয়া পড়িলাম। কিন্তু ঘুম আসিল না। স্তিমিতচক্ষে চুপ করিয়া আকাশের গায়ে মেঘ ও চাঁদের লুকোচুরি খেলা দেখিতে লাগিলাম। ঐ ডোবে, ঐ ভাসে, আবার ডোবে, আবার ভাসে! আর কানে আসিতে লাগিলÑজলস্রোতের সেই একটানা হঙ্কার। আমার একটা কথা প্রায়ই মনে পড়ে। সেদিন অমন করিয়া সব ভুলিয়া মেঘ আর চাঁদের মধ্যে ডুবিয়া গিয়াছিলাম কি করিয়া ? সে ত আমার তন্ময় হইযা চাঁদ দেখিবার বয়স নয়!। কিন্তু ঐ বুড়োয়া পৃথিবীর অনেক ব্যাপার দেখিয়া-শুনিয়া বলে যে, ওই বাহিরের চাঁদটা কিছু না, মেঘটাও কিছু না, মেঘটাও কিচু সব ফাঁকিÑসব ফাঁকি! আসল যা কিছু, তা এই নিজের মনটা। সে যখন যাকে যা দেখায়, বিভোর হইয়া সে তখন শুধু দেখে। আমারও সেই দশা। এত রকমের ভয়ঙ্কর ঘটনার ভিতর দিয়া এমন নিরাপদে বাহির হইয়া আসিতে পারিয়া আমার নির্জীব মনটা তখন বোধ করি এমনিÑকিছু একটা শান্ত ছবির অন্তরেই নিশ্রাম করিতে চাহিয়াছিল।
ইতিমধ্যে যে ঘণ্টা দুই কাটিয়া গেছে, তাহা টেরও পাই নাই। হঠাৎ মনে হইল আমার, চাঁদ যেন মেঘের মধ্যে একটা লম্বা ডুবসূাঁতার দিয়াএকেবারে ডানদিকে হইতে বাঁদিকে গিয়া মুখ বাহির করিলেন। ঘাড়টা একটু তুলিয়া দেখিলাম, নৌকা এবার ওপারে পাড়ি দিবার আয়োজন করিয়াছে। প্রশ্ন করিবার বা একটা কথা কহিবার উদ্যমও তখনবোধ করি আমার মধ্যে আর কিছু না; তাই তখনি আবার তেমনি করিয়াই শুইয়া পড়িলামদ। আবারসেই তখন দুচুক্ষু ভরিয়া চাঁদের খেলা এবং দু’কান ভরিয়া স্রোতে তর্জন। বোধ করি আরও ঘণ্টাখানেক কাটিল।
খসÑসÑবালুর চরেনৌকা বাঁধিয়াছে। ব্যস্ত হইয়া উঠিয়া বসিলাম। এই যে এপারে আসিয়া পৌঁছিয়াছি। কিন্তু এ কোন জায়গা ? বাড়ি আমাদের কত দূরে ? বালুকার রাশি ভিন্ন আর কিছুই তো কোথাও দেখি না? প্রশ্ন করিবার পূর্বেই হঠাৎ নিকটেই কোথায় যেন কুকুরে কলহ শুনিতে পাইয়া আরও সোজা হইয়া বসিলাম। কাছেই লোকালয় আছে নিশ্চয়।
ইন্দ্র কহিল, একটু বোস শ্রীকান্ত, আমি এখখুনি ফিরে আসিবÑতোর কিচ্ছু ভয় নেই।এই পাড়ের ওধারেই জেলেদের বাড়ি।
সাহসের এতগুলো পরীক্ষায় পাশ করিয়াশেষে এইখানে আসিয়া ফেল করিবার আমার ইচ্ছা ছিল না। বিশেষতঃ মানুষের এই কিশোর বয়সটার মতো এমন মহাবিস্ময়কর বস্তু বোধ করি সংসারে আর নাই। এমনিই ত সর্বকালের মানুষের মানুসিক গতিবিধি বড়ই দুর্জ্ঞেয়। কিন্তু কিশোর-কিশোরীর মনের ভাব বোধ করি একেবারেই অজ্ঞেয় বুদ্ধি দিয়া তাহাকে ধরিতে না পারিয়া, তাহাকে কেহ কহিল ভালো, কেহ কহিল মন্দÑকেহ নীতির, কেহ বা রুচির দোহাইÑআবার কেহ বা কোন কথাই শুনিল নাÑতর্কাতর্কির সমস্ত গÐি মাড়াইয়া ডিঙ্গাইয়া বাহির হইয়া গেল। যাহারা গেল, তাহারা মজিল, পাগল হইল, নাচিয়া, কাঁদিয়া, গান গাহিয়া সব একাকার করিয়া দিয় সংসারটাকে যেন এক পাগলাগারদ বানাইয়া ছাড়িল। তখন যাহারা মন্দ বলিয়া গালি পড়িল, তাহারাও কহিল, এমন রসের উৎস কিন্তু আর কোথাও নেই । যাহাদের রুচির সহিত মিশ খায় নাই, তাহারাও স্বীকার করি, এই পাগলের দলটি ছাড়া সংসারে এমন গান কিন্তু আর কোথাও শুনিলাম না।
কিন্তু এত কাÐ যাহাকে আশ্রয় করিয়া ঘটিলÑসেইসে সর্বদিকের পুরাতন, অথচ চিরনূতনÑবৃন্দাবনের বনে বনে দুটি কিশোর কিশোলীর অপরূপ লীলাÑ বেদান্ত যাহার কাছে ক্ষুদ্র, মুক্তিফল যাহার তুলনায় বারীশের কাছে বারিবিন্দুর মতই তুচ্ছÑতাহার কে কবে অন্ত খুঁজি?য়া পাইল ? পাইল না, পাওয়াও যায় না। তাই বলিতেছিলাম, তেমনি সেও ত আমার সেই কিশোর বয়স! যৌবনের তজ এবং দৃঢ়তা না আসুক, তাহার দম্ভত তখন আসিয়া হাজির হইয়াছে! প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা ত হৃদয়ে সজাগ হইযাছে! তখন সঙ্গীর কাছে ভীরু বলিয়া কে নিজেকে প্রতিপন্ন করিতে চাহে ? অতএব তৎক্ষণাৎ জবাব দিলাম, ভয় করব আবার কিসের ? বেশ ত, যাও না। ইন্দ্র আর দ্বিতীয় বাক্যব্যয় না করিয়া দ্রæতপদে নিমেষের মধ্যে অদৃশ্য হইয়া গেল।
উপরে, মাথারউপরে আবার সেই আলোÑআঁধারের লুকোচুরি খেলা এবং পশ্চাতে বহুদূরোগত সেই অবিশ্রান্ত তর্জন। আর সমুখে সেই বআলি পাড়। এটাকোন জায়গা, তাই ভাবিতেছি, দেখি ইন্দ্র ছুটিয়া আসিয়া উপস্থিত হইল। কহির, শ্রীকান্ত, তোকে কেটা কথা বলতে ফিরে এলুম। কেউ যদি মাছ চাইতে আসে, খবরদার দিসনেÑখবরদার বলে দিচ্ছি। ঠিক আমার মতো হয়ে যদি কেউ আসে, তবু দিবিনেÑবলবিÑমুখে তোর ছাইÑইচ্ছে হয় নিজের তুলে নিয়ে যা। খরবার হাতে করে দিতে যাসনে যেন, ঠিক আমি হলেও না,Ñখবরদার!
কেন ভাই ?
ফিরে এসে বলবÑখবরদার কিন্তুÑ বলিতে বলিতে সে যেমন ছুটিয়া আসিয়াছিল, তেমনই ছুটিয়া দৃষ্টির বহির্ভুত হইয়া গেল।
এইবার আমার পায়ের নখ হইতে মাথার চুল পর্যন্ত কাঁটা দিয়া খাড়া হইয়া উঠিল। বোধ হইতে লাগিল, যেন দেহের প্রতি শিরা উপশিরা দিয়া বরফ গলা জল বহিয়া লাগিল। নিতান্ত শিশুটি নহি যে, তাহার ইঙ্গিতে মর্ম অনুমান করিতে পারি নাই। আমার জীবনে এমন অনেক ঘটনা ধটিয়া গিয়াছে যাহার তুলনায়ইহা সমুদ্রের কাছে গোস্পদের জল। কিন্তু তথাপি, এই নিশা অভিযানের রাতটায় যে ভয় অনুভব করিয়াছিলাম, তাহা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। পাড়ের ওদিকে হইতে কে যেন উঁকি মারিয়া দেখিতেছে। যেমনি আড়চোখে চাই অমনি সেও যেন মাথা নীচু করে।
সময় আর কাটে না। ইন্দ্র যেন কত যুগ হইল চলিয়া গিয়াছেÑআর ফিরিতেছে ন্ া
মনে হইল, যেন মানুষের কণ্ঠস্বর শুনিলাম। পৈতাটা বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠে শতপাকে বেষ্টন করিয়া মুখ নিচু করিয়া উৎসর্গ হইয়া রহিলাম। কণ্ঠস্বর ক্রমশঃ স্পষ্টতর হইলে বেশ বুঝিলাম, দুই-তিনজন লোক কথাবার্তা বলিতে বলিতে এইদকেই আসেতেছে। একজন ইন্দ্র এবং আর অপর দুইজন হিন্দুস্থানী! কিন্তু যে যাহাই হউক, তাহাদের মুখের দিকে চাহিবার আগে ভাল করিয়া দেখিয়া লইলাম, চন্দ্রলোকে তাহাদের ছায়া পড়িয়াছে কি না। কারণ, এইঅবিসংবাদী সত্যটা ছেলেবেলা হইতেই জানিতাম যে, ইহাদের ছায়া থাকে না।
আঃÑঐ যে ছায়া! অস্পষ্ট হউক তবুও ছায়া! জগতে আমার মত সেদিন কোন মানুষ কোন বস্তু চোখে দেখিয়া কি এমন তৃপ্তি পাইয়াছে। পাক আর নাইপাক, ইহাকেই যে বলে দৃষ্টির চরম আনন্দ, এ কথা আজ আমি বাজি রাখিয়া বলিতে পারি! যাক! যাহারা আসিল তাহারা অসাধারণ ক্ষিপ্রতার সহিত সেই বৃহদাযতন মাছগুলি নৌকা হএত তুলিয়া জারের মতো একপ্রকার বস্তখÐে বাঁধিয়া ফেলিল এবং তৎপরিবর্তে ইন্দ্রের হাতে যাহা গুঁজিয়া দিল, তাহার একটা টুং করিয়া একটুখানি মৃদু মধুর শব্দ করিয়া নিজেদের পরিচয়টাও আমার কাছে সম্পূর্ণ গোপন করিয়া গেল না।
ইন্দ্র নৌকা খুলিয়া দিল, কিন্তু স্রোতে ভাসাইল না। ধার ঘেঁষিয়া প্রবাহের প্রতিকূলে লগি ঠেলিয়া ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতে লাগিল।
আমি কোন কথা কহিলাম না। কারণ আমার মন তখন তাহার বিরুদ্ধে ঘৃণায় ও কি-এক প্রকারের অভিমানে নিবিড়ভাবে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু এইমাত্র না তাঁহাকেই চাঁদের আলোয় ছায়া ফেলিয়া ফিরিতে দেখিয়া অধীর আনন্দে ছুটিয়া গিয়া জড়াইয়া ধরিবার জন্য উন্মুক্ত হইয়া উঠিয়াছিলাম।
হ্যাঁ, তা মানুষের স্বভাবতই ত এই! একটুখানি দোষ পাইলে পূর্ব মুহূর্তের সমস্তই নিঃশেষে ভুলিয়া যাইতে তাহার কতক্ষণ লাগে? ছি! ছি! এমনি করিয়া সে টাকা সংগ্রহ করিল! এতক্ষণ এই মাছচুরি ব্যাপারটা আমার মনের মধ্যে বেশ স্পষ্ট চুরির আকারে বোধ করি স্থান পায় নাই। কেননা ছেলেবেলায় টাকাকড়ি চুরিটাই শুধু যে বাস্তবিক চুরি; আর সবÑঅন্যায় বটেÑকিন্তু কেমন করিয়া যেন সে সব ঠিক চুরি নয়Ñএমনিই একটা অদ্ভুত ধারণা প্রায় সকল ছেলেরই থাকে। আমারও তাই ছিল। না হইলে, এই ‘টুং’ শব্দটি কানে যাইবামাত্র এতক্ষণের এত বীরত্ব, এত পৌরুষ, সমস্ত এক মুহূর্তে এমন শুষ্ক তৃণের মতো ঝরিয়া পড়িত না। সে যদি মাছগুলা গঙ্গার জলে ফেলিয়া দিত, সংগ্রহের অভিযানটিকে কেহ চুরি বলিলে ক্রোধে বোধ করি তাহার মাথা ফাটাইয়া দিতাম এবং সে তাহার ন্যায্য প্রাপ্য পাইয়াছে বলিয়াই মনে করিতাম। কিন্তু ছিঃ ছিঃ! এ কাজ ত জেলখানার কয়েদীরা করে!
ইন্দ্র কথা কহিল, জিজ্ঞাসা করিল, তুই একটুও ভয় পাসনি, নারে শ্রীকান্তক ?
আমি সংক্ষেপে জবাব দিলাম, না।
ইন্দ্র কহিল, কিন্তু তুই ছাড়া ওখানে আর কেউ বসে থাকতে পারত না, তা জানিস ? তোকে আমি খুব ভালোবাসিÑআমার এমন বন্ধু আর একটিও নেই। আমি যখন আসব, তোকে শুধু ডেকে আনব, কেমন ?
আমি জবাব দিলাম না। কিন্তু এই সময়ে তাহার মুখের উপর সদ্য মেঘমুক্ত যে চাঁদের আলোটুকু পড়িল তাহাতে মুখখানি কি যে দেখাইল, আমি এতক্ষণ সব রাগ অভিমান হঠাৎ ভুলিয়া গেলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম, আচ্ছা ইন্দ্র, তুমি কখনো ঐসব দেখেচো ?
কি সব ?
ঐ যারা মাছ চাইতে আসে ?
না ভাই-দেখি নিÑ লোকে বলে, তাই শুনেচি।
আচ্ছা, তুমি এখানে একলা আসতে পারো ?
ভয় করে না ?
না। রামরাম করি। কিছুতে তারা আসতে পারে না। একটু থামিয়া কহির, কি সোজা রে। তুই রামনাম করতেকরতে সাপের মুখ দিয়ে চ’লে যাস, তবু তোর কিছু হবে না। সব দেখবি ভয়ে ভয়ে পথ ছেড়ে দিয়ে পালাবে। কিন্তু ভয় করলে হবে না। তা হ’লেই তারা টের পাবে, এ শুধু চালাকি করছেÑতারা সব অন্তর্যামী কিনা!
বালুর চর শেষ হইয়া আবার কাঁকড়ের পাড় শুরু হইল। ওপার অপেক্ষা এপারে স্রোত অনেক কম। বরঞ্চ এইখানটায় বোধ হইল, স্রোত যেন উল্টামুখ চলিয়াছে। ইন্দ্র লগি তুলিয়া বোটে হাতে করিয়া কহিল, ঐ যে সামনে বনের মত দেখাচ্ছে, আমাদের ওর ভেতর দিয়ে যেতে হবে। ঐখানে আমি একবার নেবে যাব। যাব আর আসব। কেমন ?
অনিচ্ছা সত্তে¡ও বলিলাম, আচ্ছা। কারণ, ‘না’ বরিবার পথ ত একপ্রকার নিজেই বন্ধ করিয়া দিয়াছি। আবার ইন্দ্র আমার নির্ভীকতা সম্বন্ধে দেখাইতেছিল যে, এই মাত্র রামনামের অসাধারণ মাহাত্ম্য শ্রবণ করা সত্তে¡ও ওই অন্ধকার প্রাচীন বটবৃক্ষমূলে নৌকা উপর একা বসিয়া এত রাত্রে রামনামের শক্তি সামর্থ্য যাচাই করিয়া লইতে আমার এতটুকু প্রবৃত্তি হইল না, এবং তখন হইতেই গা ছমছম করিতে লাগিল। সত্য বটে মাছ আর ছিল না, সুতরাং মৎসপ্রার্থীর শুভাগমন কা হইতে পারে, কিন্তু সকরের লোভ যে মাছেরই উপর, তাই বা কে বলিল ? মানুষের ঘাড় মটকাইয়া ইষদুষ্ণ রক্তপান এবং মাংসচর্বণের ইতিহাসও ত শোনা গিয়াছে।
অনুকূল স্রোত এবং বোটের তাড়নায ডিঙিখানি র্তর্ত করিয়া অগ্রসর হইয়া আসিতে লাগিল। আরও কিছুদূর আসিতেই দক্ষিণাদিকের আগ্রীবমগ্ন বনঝাউ এবং কসাড়বন াথা তুলিয়া এই দুটি অসমসাহসী মানবশিশুর পানে বিস্ময়স্তব্ধভাবে চাহিয়া রহিল, এবং কেহ বা মাঝে মাঝে শিরশ্চালনে কে যেন নিষেধ জানাইতে লাগিল। বামদিকেও তাহাদেরই আত্মীয়পরিজনেরা সু-উচ্চ কাঁকড়ের পাড় সমাচ্ছন্ন করিয়া তেমনি করিয়াই চাহিয়া রহিল এবং তেমনি করিয়া মান করিতে লাগির। আমি একা হইলে নিশ্চয়ই তাহাদের সঙ্কেত অমান্য করিতাম না। কিন্তু কর্ণধার যিনি তাঁহার কাছে বোধ করি ‘রামনামের’র জোরে ইহাদের সমস্ত আবেদন-নিবেদন একেবারেই ব্যর্থ হইয়া গেল। সে কোনদিকে ভ্রæক্ষেপই করিল না। দক্ষিণখানের চরের বিস্তৃতবশতঃ এ জায়গাটা একটি ছোটখাটো হৃদের মতে হইয়াছিলÑশুধু উত্তরদিকের মুখ খোলা ছিল। জিজ্ঞাসা করিলাম, আচ্ছা ডিঙি বেঁধে উপরে উঠবার ত ঘাট নেই, তুমি যাবে কি করে ?
ইন্দ্র কহিল, ঐ যে বটগাছ, এর পাশেতেই একটা সরু ঘাট আছে।
কিছুক্ষণ হইতে কেমন একটা দুর্গন্ধ মাঝে মাঝে হাওয়ার সঙ্গে নাকে আসিয়া লাগিতেছিল। যত অগ্রসর হইতেছিলাম, ততই সেটা বাড়িতেছিল। এখন হঠাৎ একটা দমকা বাতাসের সঙ্গে সেই দুর্গন্ধটা এমন বিকট হইয়া নাকে লাগিলে যে, অসহ্য বোধ হইল। নাকে কাপড় চাপা দিয়া বলিলাম, নিশ্চয় কিচু পচেছে, ইন্দ্র!
ইন্দ্র বলিল, মড়া। আজকাল ভয়ানক কলেরা হচ্ছে কিনা! সবাই ত পোড়াতে পারে নাÑমুখে একটুখানি আগুন ছুঁইয়ে ফেলে দিয়ে যায়। শিয়াল-কুকুরে খায় আর পচে। তারই অত গন্ধ।
ঐ হোথা থেকে হেথা পর্যন্তÑ সবটাই শ্মশান কিনা। যেখানে হোক ফেলে রেখে ঐ বটতলার ঘাটে চান করে বাড়ি চলে যায়,Ñআরে দূর! ভয় কি রে! ও শিয়ালে লড়াই করচে। আচ্ছা আয়, আয় আমার কাছে এসে বোস।
আমার গলা দিয়া স্বর ফুটিল নাÑকোনমতে হামাগুড়ি দিয়া তাহার কোলের কাছে গিয়া বসিয়া পড়িলাম। সে ক্ষণকালের জন্য আমাকে একবার স্পর্শ করিয়া হাসিয়া কহিল, ভয় কি শ্রীকান্ত ? কত রাত্তিরে একা একা আমি এইপথে আসিÑতিনবার রামনাম করলে কার সাধ্যি কাছে আসে ?
তাহাকে স্পর্শ করিয়া দেহটাতে যেন একটু সাড়া পাইলামÑঅস্ফুটে কহিলাম, না ভাই, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, এখানে কোথাও নেবো নাÑসোজা বেরিয়ে চল।
সে আবার আমার কাঁধে হাত ঠেকাইয়া বলিল, না শ্রীকান্ত, একটিবার যেতেই হবে! এই টাকা কটি না দিলেই নযÑতারা পথ চেয়ে বসে আছেÑআমি তিন দনি আসতে পারি নি।
টাকা কাল দিয়ো না ভাই!
না ভাই, অমন কথাটি বলিসনে। আমার সঙ্গে তুই চরÑকিন্তু কারুকে এক থা বলিস নে যেন।
আমি অস্ফুটে ‘না’ বলিয়া তাহাকে তেমনি স্পর্শ করিয়াপাথরের মত বসিয়া রহিলাম। গলা শুকাইয়া কাঠ হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু হাত বাড়াইয়া জল লইব কি নড়াচড়ার কোনো প্রকার চেষ্টা করিব, এ সাধ্যই আমার আর ছিল না।
গাছের ছায়ার মধ্যে আসিয়া পড়ায়, অদূরেইসেই ঘাটটি চোখে পড়িল। যেখানে আমাদের অবতরণ করিতে হইবে, তাহার উপর যে গাছপালা নাই, স্থানটি জ্যোৎস্নালোকেও বেশ আলোকিত হইয়া আছেÑদেখিয়া াত দুঃখেও একটু আরাম বোধ করিলাম। ঘাটের কাকড়ে ডিঙি ধাক্কা না খায়, এইজন্য ইন্দ্র পূর্বাহ্নেই প্রস্তুত হইয়া মুখের কাছে সরিয়া আসিল এবং রাগিতে না লাগিতে লাফাইয়া পড়িয়াই একটা ভয় জড়িত স্বরে ইস করিয়া উঠিল। আমিও তাহার পশ্চাতে ছিলাম, সুতরাং উভয়েই প্রায় একসময়েই সেই বস্তুটির উপর বৃষ্টিপাত করিলাম।
তবে সে নীচে, আমি নৌকার উপরে।
অকালমৃত্যু বোধ করি আর কখনও তেমন করুণভাবে আমার চোখে পড়ে নাই। ইহা যে কত বড় হৃদয়ভেদী ব্যথার আধার, তাহা তেমন করিয়া না দেখিলে বোধ করি দেখাই হয় না! গভীর নিশীথে চারিদিক নিবিড় স্তব্ধতায় পরিপূর্ণÑশুধু মাঝে মাঝে ঝোপঝাড়ের অন্তরালে শ্মশানচারী শৃগালের ক্ষুধার্ত কলহ চিৎকার, কখন বা বক্ষোপবিষ্ট অর্ধসুপ্ত বৃহৎকায় পক্ষীর পক্ষতাড়নশব্দ, আর বহুদূরাগত তীব্র জলপ্রবাহের অবিশ্রাম হু-হু-হু আর্তনাদÑইহার মধ্যে দাঁড়াইয়া উভয়েই নির্বাক, নিস্তব্ধ হইয়া, এই মহাকরণ দৃশ্যটির পানে চাহিয়া রহিলাম। একটি গৌরবর্ণ ছয-সাত বৎসরের হৃষ্টপুষ্ট বালকÑতাহার সর্বাঙ্গ জলে ভাসিতেছে, শুধু মাথাটি ঘাটের উপর।শৃগালেরা বোধ করি জল হইতে তাহাকে এইমাত্র তুলিতেছিল, শুধু আমাদের আকস্মিক আগমনে নিকটে কোথাও গিয়া অপেক্ষাকরিয়া আছে। খুব সম্ভব তিন চারি ঘণ্টার অধিক তাহার মৃত্যু হয় নাই। ঠিক যেন বিসূচীকার নিদারুণ যাতনা ভোগ করিয়া সে বেচারা মা-গঙ্গার কোলেরউপরেই ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। মা অতি সর্ন্তপণে তাহার সুকুমার নধর দেহটিকে এইমাত্র কোল হইতে বিছানায় শোয়াইয়া দিতেছিলেন। জলেস্থলে বিন্যস্ত এমনিভাবেই সেই ঘুমন্ত শিশু-দেহটিরউপর সেদিন আমাদের চোখ পড়িয়াছিল।
মুখ তুলিয়া দেখি ইন্দ্রের দুই চোখ বাহিযা বড় বড় অশ্রæর ফোঁটা ঝরিয়া পড়িতেছে। সে কহিল, তুই একটু সরে দাঁড়া শ্রীকান্ত, আমি এ বেচারাকে ডিঙিতে তুলে ঐ চড়ার ঝাইবনের মধ্যে জলে রেখে আসি।
চোখের জল দেখিবামাত্র আমার চোখেও জল আসিতেছিল সত্য; কিন্তু ছোঁয়াছুঁয়ির প্রস্তাবে আমি একেবারে সঙ্কুচিত হইয়া পড়িলাম। পরদুঃখে ব্যথা পাইয়া চোখের জল ফেলা সহজ নহে, তাহা অস্বীকার করি না; কিন্তুতাই বলিয়া সেই দুঃখের মধ্যে নিজের দুই হাত বাড়াইয়া আপনাকে জড়িত করিতে যাওয়াÑসে ঢের বেশি কঠিন কাজ। তখন ছোটবড় কত জায়গাতেই না টান ধরে! একে ত এই পৃথিবীর সেরা সনাতন হিন্দুর ঘরে বশিষ্ঠ ইত্যাদির পবিত্র পূজ্য রক্তের বঙশধর হইয়া জন্মিয়া, জন্মগত সংস্কারবশত : মৃতদেহ স্পর্শ করাকেই একটা ভীষণ কঠিন ব্যাপার বলিয়া ভাবতে শিখিয়াছি, ইহাতেকতই না শাস্ত্রয়ি বিধিনিষেধের বাঁধাবাঁধি, কতই না রকমারি কাÐের ঘটা! তাহাতে এ কোন রোগের মড়া, কাহার ছেলে কি জাতÑকিছুই না জানিয়া এবং মরিবার পর এ ছোকরা ঠিকমতো প্রায়শ্চিত্ত করিয়া ঘরহইতে বাহির হইয়াছিল কি না, সে খবরটা পর্যন্ত না লইয়াই বা ইহাকে স্পর্শ করা যায় কিরূপে ?
কুণ্ঠিত হইয়া যেই জিজ্ঞাসা করিলাম, কি জাতের মড়াÑতুমি ছোঁবে ? ইন্দ্র সরিয়া আসিয়া একহাত তাহার ঘাড়ের তলায় এবং অন্যহাত হাঁটুর নীচে দিয়া একটা শুষ্ক তৃণখÐের মত স্বচ্ছন্দে তুলিয়া লইয়া কহিল, নইলে বেচারাকে শিয়ালে ছেঁড়াছেঁড়ি করে খাবে! আহা! মুখে এখনো এর ওষুধের গন্ধ পর্যন্ত রয়েচে রে! বলিয়া নৌকার যে তক্তাখনির উপর ইতিপূর্বে আমি শুইয়া পড়িয়াছিলাম, তাহারই উপর শোয়াইয়া নৌকা ঠেলিয়া দিয়া নিজেও চড়িয়া বসিল। কহিল, মড়ারকি জাত থাকে রে ?
আমি তর্ক করিলাম, কেন থাকবে না ?
ইন্দ্র কহিল, আরে এ যে মড়া। মড়ার আবার জাত কি ? এই যেমন আমাদের ডিঙিটাÑএর কি জাত আছে ? আমগাছ, জামগাছ যে কাঠেরই তৈরি হোকÑ এখন ডিঙি ছাড়া একে কেউ বলবে নাÑআমগাছ, জামগাছÑবুঝলি না ? এও তেমনি।
দৃষ্টান্তটি যে নেহাৎ ছেলেমানুষের মত, এখন তাহা জানি। কিন্তু অন্তরের মধ্যে ইহাও ত অস্বীকার করিতে পারি নাÑকোথায় যেন অতি তীক্ষè সত্য ইহারই মধ্যে আত্মগোপন করিয়া আছে। মাঝে মাঝে এমনি খাঁটি কথা সে বলিতে পারিত। তাই আমি অনেক সময়ে ভাবিয়াছি, ওই বয়সে কাহারো কাছে কিছুমাত্র শিক্ষা না করিয়া বরঞ্চ প্রচলিত শিক্ষা-সংস্কারকে অতিক্রম করিয়া এই সকল তত্ত¡ সে পাইত কোথায় ? এখন কিন্তু বয়সের সঙ্গেই ইহার উত্তরটাও যেন পাইয়াছি বলিয়া মনে হয়। কপটতা ইন্দ্রের মধ্যে ছিলই না। উদ্দেশ্যকে গোপন রাখিয়া কোন কাজ সে করিতেই জানিত না। সেই জন্যই বোধ করি তাহার সেই হৃদয়ের ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্ন সত্য কোনো অজ্ঞাত নিয়মের বশে সেই বিশ্ব্যাপী অবিচ্ছন্ন নিখিল সত্যের দেখা পাইয়া ওস্তাদের উমেদারী না করিয়াই ঠিক ব্যাপারটি টের পাইত। বাস্তবিক, অকপট সহজ বুদ্ধিই ত সংসারে পরম এবং চরম বুদ্ধি। ইহার উপরে ত কেহই নাই। ভালো করিয়া দেখিলে, মিথ্যা বলিয়া তকোন বস্তুরই অস্তিত্ব এ বিশ্বব্রহ্মাÐের চোখে পড়ে না। মিথ্যা শুধু মানুষের বুঝিবার এবং বুঝাইবার ফলটা। সোনাকে পিতল বলিয়া বুঝানও মিথ্যা, বুঝাও মিথ্যা, তাহা জানি। কিন্তু তাহাতে সোনারই বা কি, আর পিতলেরই বা কি আসে যায়! তোমার যাহা ইচ্ছা বুঝ না, তাহারা যা তাই ত থাকে। সোনা মনে করিয়া তাহাকে সিন্ধুকে বনধ করিয়া রাখিলেও তাহার সত্যকার মূল বৃদ্ধি হয় না, আর পিতল বলিয়া টান মারিয়া বাহিরে ফেলিয়া দিলেও তাহার দাম কমে না। সেদিনও সে পিতল, আজও সে পিতলই। তোমার মিথ্যার জন্য তুমি ছাড়া আর কেহ দায়ীও হয় না, ভ্রæক্ষেপও করে না। এই বিশ্বব্রহ্মাÐের সমস্তটাই পরিপূর্ণ সত্য। মিথ্যার অস্তিত্ব যদি কোথাও থাকে, তবে সে মনুষ্যের মন ছাড়া আর কোথাও না। সুতরাং এই অসত্যকে ইন্দ্র যখন তাহার অন্তরের মধ্যে জানিয়া হোক, না জানিয়া হোক, কোন দিন স্থান দেয় নাই, তখন তাহার বিশুদ্ধ বুদ্ধি যে মঙ্গল এবং সত্যকেই পাইবে, তা ত বিচিত্র নয়।
কিন্তু তাহার পক্ষে বিচিত্র না হইলেও কাহারও পক্ষেই যে বিচিত্র নয়, এমন কথা বলিতেছি না। ঠিক এই উপলক্ষে আমার নিজের জীবনেই তাহার প্রমাণ পাইয়াছি, তাহা বলিবার লোভ এখানে সংবরণ করিতে পারিতেছি না।
এই ঘটনার দশ-বারো বৎসর পরে, হঠাৎ একদিন অপরাহ্নকালে সংবাদ পাওয়া গেল যে এক বৃদ্ধা ব্রাহ্মণী ও-পাড়ায় সকাল হইতে মরিয়া পড়িয়া আছেনÑকোনমতেইতাঁহার সৎকারের লোক জুটে নাই। না জুটিবার হেতু এই যে, তিনি কাশী হইতে ফিরিবার পথে রোগগ্রস্ত হইয়া এই শহরেই রেলগাড়ি হইতে নামিয়া পড়েন এবং সামান্য পরিচয়সূত্রে যাহার বাটীতে আসিয়া আশ্রয় গ্রহণ করিয়া এই দুই রাত্রি বাস করিয়া আজ সকালে প্রাণত্যাগ করিয়াছেন, তিনি ‘বিলাত-ফেরত’ এবং সে সময়ে ‘একঘরে’। ইহাই বৃদ্ধার অপরাধ যে, তাঁহাকে নিতান্ত নিরূপায় অবস্থায় এই ‘একঘরে’র বাটীতে মরিতে হইয়াছে।
যাহা হউক সৎকারে করিয়া পরদিন সকালে ফিরিয়া আসিয়া দেখা গেল প্রত্যেকেরই বাটীর কবাট বন্ধ হইয়া গিয়াছে। শুনিতে পাওয়া গেল গতরাত্রি এগারোটা পর্যন্ত হ্যারিকেন-লণ্ঠন-হাতে সমাজপতিরা বাড়ি বাড়ি ঘুরিয়া বেড়াইয়াছেন, এবং স্থির করিয়া দিয়াছেন যে এই অত্যন্ত শাস্ত্রবিরুদ্ধ অপকর্ম (দাহ) করার জন্য এই কুলাঙ্গারদিগকে কেশচ্ছেদ করিতে হইবে, ‘ঘাট’ মানিতে হইবে এবং এমন একটা বস্তু সবৃসমক্ষে ভোজন করিতে হইবে, যাহা সুপবিত্র হইলেও খাদ্য নয়! তাঁহারা স্পষ্ট করিয়া প্রতি বাড়িতেই বলিয়া দিয়াছেন যে ইহাতে তাঁহাদের কোনই হাত নাই; কারণ জীবিত থাকিতে তাঁহারা অশাস্ত্রীয় কাজ সমাজের মধ্যে কিছুতেই ঘটিতে দিতে পারিবেননা। আমরা অনন্যোপায় হইয়া ডাক্তার বাবুর শরণাপন্ন হইলাম। তিনিই তখন শহরে সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসক এবং বিনা দক্ষিণায় বাঙ্গালীর বাটীতে চিকিৎসা করিতেন। আমাদের কাহিনী শুনিয়া ডাক্তারবাবু ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিয়া প্রকাশ করিলেন, যাঁহারা এইরূপ নির্যাতন করিতেছেন তাঁহাদের বাটীর কেহ চোখের সম্মুখে বিনা চিকিৎসায় মরিয়া গেলেও তিনি তিনি সেদিকে আর চাহিয়া দেখিবেন না। কে এই কথা তাহাদের গোচর করিল, জানি না। দিবা অবসান না হইতেই শুনিলাম, কেশচ্ছেদের আবশ্যকতা নাই, শুধু ‘ঘাট’ মানিয়া সেই সুপবিত্র পদার্থটা ভক্ষণ করিলেই হইবে। আমরা স্বীকার না করায় মোনা গেল, আমাদের এই প্রথম অপরাধ বলিয়া তাঁহারা এমনিই মার্জনা করিয়াছেনÑপ্রায়শ্চিত্ত করিবার আবশ্যকতা নাই। কিন্তু ডাক্তারবাবু কহিলেন, প্রায়শ্চিত্তের আবশ্যকতা নাই বটে, কিন্তু তাঁহারা যে এই দুটা দিন ইহাদিগকে ক্লেশ দিয়াছেন সেই জন্য যদি প্রত্যেকে আসিয়া ক্ষমা প্রার্থনা করিযা না যান, তাহা হইলে তাঁহার যে কথা সেই কাজ; অর্থাৎ কাহারও বাটীতে যাইবেন না। তারপর সেই সন্ধ্যাবেলাতেই ডাক্তারবাবুর বাটীতে একে একে বৃদ্ধ সমাজপতিদের শুভাগমন হইয়াছিল। আশীর্বাদ করিয়া তাঁহারা কি কি বলিয়াছিলেন, তাহা অবশ্য শুনিতে পাই নাই; কিন্তু পরদিন ডাক্তারবাবুর আর ক্রোধ ছিল না, আমাদিগকে ত প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয়ই নাই।
যাক, কি কথায় কি কথা আসিয়া পড়িল। কিন্তু সে যাই হউক, আমি নিশ্চয় জানিÑযাঁহারা জানে তাঁহারা এই নামধামহীন বিবরণটির মধ্যে সমস্ত উপলব্ধি পাইয়াছিল, অত বড় বড় সমাজপতিরা অতটা প্রবীণ বয়স পর্যন্ত তাহার কোন তত্ত¡ পান নাই; এবং ডাক্তারবাবু সেদিন অমন করিয়া তাঁহাদের শাস্ত্রজ্ঞানের চিকিৎসা না করিয়া দিলে, কোনদিন এ ব্যাধি তাঁহাদের আরোগ্য হইত কি না তাহা জগদীশ্বরই জানেন।
চড়ার উপর আসিয়া অর্ধমগ্ন বনঝাউয়ের অন্ধকারের মধ্যে জলের উপর সেই অপরিচিত শিশুদেহটিকে ইন্দ্র যখন অপূর্ব মমতার সহিত রাখিয়া দিল তখন রাত্রি আর বাকি নাই। কিছুক্ষণ ধরিয়া সেই শবের পানে মাথা ঝুঁকাইয়া থাকিয়া অবশেষে যখন মুখ তুলিয়া চাহিল তখন অস্ফুট চন্দ্রালোকে তাহার মুখের যতটুকু দেখা গেল,তাহাতেÑঅত্যন্ত ¤øান এং উত্তীর্ণ হইয়া অপেক্ষা করিয়া থাকিলে যেরূপ দেখায়, তাহার শুষ্কমুখে ঠিক সেই ভাব প্রকাশ পাইল।
আমি বলিলাম ইন্দ্র, এইবার চল।
ইন্দ্র অন্যমনস্কভাবে কহিল, কোথায় ?
এই যে বললে, কোথয়ায় যাবে?
থাকÑআজ আর না।
আমি খুশি হইয়া কহিলাম, বেশ, তাই ভালো ভাই, চল বাড়ি যাই।
প্রতুত্তরে ইন্দ্র আমার মুখের পানে চাহিয়া প্রশ্ন করিল, হ্যাঁরে শ্রীকান্ত, মরলে মানুষ কি হয়, তুই জানিস ?
আমি তাড়াতাড়ি বলিলাম, না ভাই জানিনে; তুমি বাড়ি চল।তারা সব স্বর্গে যায় ভাই! তোমার পায়ে পড়ি, তুমি আমাকে বাড়ি রেখে এস।
ইন্দ্র যেন কর্ণপাতই করিল না। কহিল, সবাই ত স্বর্গে যেতে পায় না। তা ছাড়া খানিকক্ষণ সবাই কেই এখানে থাকতে হয়। দ্যাখ, আমি যখন ওকে জলের উপর শুইয়ে দিচ্ছিলুম, তখন সে চুপি চুপি স্পষ্ট বললে, ভাইয়া।
আমি কম্পিতকণ্ঠে কাঁদ কাঁদ হইয়া বলিয়া উঠিলাম, কেন ভয় দেখাচ্ছ ভাই, আমি অজ্ঞান হয়ে যাবো। ইন্দ্র কথা কহিল না, অভয় দিল না, ধীরে ধীরে বোটে হাতে করিয়া নেওকা ঝাউবন হইতে বাহির করিয়া ফেলিল এবং সোজা বাহিতে লাগিল। মিনিট দুই নিঃশব্দে থাকিয়া গম্ভীর মৃদুস্বরে কহিল, শ্রীকান্ত, মনে মনে রামনাম কর, সে নৌকা ছেড়ে যায় নিÑআমার পেছনেই ব’সে আছে।
তারপর সেইখানেই মুখ গুঁজিয়া উপুড় হইয়া পড়িয়াছিলাম। আর আমার মনে নাই। যখন চোখ চাহিলাম তখন অন্ধকার নাইÑ নৌকা কিনারায় লাগানো। ইন্দ্র আমার পায়ের কাছে বসিয়াছিল; কহিল, এইটুকু হেঁটে যেতে হবে শ্রীকান্ত, উঠে বোস।

চার
পা আর চলে নাÑ
এমনি করিয়া গঙ্গার ধারে ধারে চলিয়া সকাল বেলা রক্তচক্ষু ও একান্ত শুষ্ক ¤øানমুখে বাটী ফিরিয়া আসিলাম। একটা সমারোহ পড়িয়া গেল। এই যে! এইপ যে! করিয়া সবাই সমস্বরে এমনি অভ্যর্থনা করিয়া উঠিল যে, আমার হৃৎপিÐ থামিয়া যাইবার উপক্রম হইল।
যতীনদা প্রায় আমার সমবয়সী। অতএব তাহার আনন্দটাই সর্বপেক্ষা প্রচÐ। সে কোথা হইতে ছুটিয়া আসিয়া উন্মত্ত চীৎকার শব্দেÑএসেচে শ্রীকান্তÑএই এল, মেজদা! বলিয়া বাড়ি ফাটাইয়া আমার আগমনবার্তা ঘোষণা করিয়া দিল, এবং মুহূর্তে বিলম্ব না করিয়া পরম সমাদরে আমার হাতটি ধরিয়া টানিয়া বৈঠকখানার পাপোশের উপর দাঁড় করাইয়া দিল।
সেখানে মেজদা গভীর মনোযোগের সহিত ‘পাশের পড়া’ পড়িতেছিলেন। মুখ তুলিয়া একটিবার মাত্র আমার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া পুনশ্চ পড়ায় মন দিলেন। অর্থাৎ বাঘ শিকার হস্তগত করিয়া নিরাপদে বসিয়া যেরূপ অবেহেলার সহিত অন্যদিকে চাহিয়া থাকে, তাঁহারও সেই ভাব। শাস্তি দিবার এত বড় মহেন্দ্রযোগ তাঁহার ভাগ্যে আর কখনো ঘটিয়াছে কিনা সন্দেহ।
মিনিট খানেক চুপচাপ। সারারাত্রি বাহিরে কাটাইয়া গেলে কর্ণযুগল ও উভয় গÐের উপর যে-সকল ঘটনা ঘটিবে তাহা আমি জানিতাম। কিন্তু আর যে দাঁড়াইতে পারি না। অথচ কর্মকর্তাও ফুরসৎ নাই। তাঁহারও যে আবার ‘পাশের পড়া’!
আমাদের এই মেজদাদাটিকে আপনারা বোধ করি এত শীঘ্র বিস্মৃত হন নাই। সেই, যাঁহার কঠোর তত্ত¡াবধানে কাল সন্ধ্যাকালে আমরা পাঠাভ্যাস করিতেছিলাম, এবং ক্ষণেক পরেই যাঁহার সুগম্ভীর ‘অোঁ-অোঁ’ রবে ও সেজ উল্টানোর চোটে গত রাত্রি সেই ‘দি রয়েল বেঙ্গল’কে ও দিশাহারা হইয়া একেবাওে ডালিমতলায় ছুটিয়া পালাইতে হইয়াছিলÑসেই তিনি।
পাঁজিটা একবার দেখ রে সতীশ, এ বেলা আবার বেগুন খেতে আছে নাকি বলিতে বলিতে পাশের দ্বারা ঠেলিয়া পিসিমা ঘরে পা দিয়াই আমাকে দেখিয়া অবাক হইয়া গেলেনÑকখন এলি রে ? কোথায় গিয়েছিলি ? ধন্যি ছেলে বাবা তুমি সারা রাত্রিটা ঘুমুতে পারিনিÑভেবে মরি, সেই যে ইন্দ্রের সঙ্গে চুপি চুপি বেরিয়ে গেলেÑআর দেখা নেই। না খাওয়া, না দাওয়া’ কোথা ছিলি বলতে হতভাগ্য ? মুখ কালিবর্ণ, চোখ রাঙ্গাÑছলছল করছে, বলি জ্বরটর হয়নি ত ? কই, কাছে আয় ত, গা দেখিÑএকসঙ্গে এতগুলো প্রশ্ন করিয়া পিসিমা নিজেই আগাইয়া আসিয়া আমার কপালে হাত দিয়াই বলিয়া উঠিলেন, যা ভেবেচি তাই। এই যে বেশ গা গরম হয়েচে। এমন সব ছেলের হাত-পা বেঁধে জলবিছুটি দিওে তবে আমার রাগ যায়। তোমাকে বাড়ি থেকে একেবারে বিদেয় ক’ওে তবে আমার কাজ। চল ঘরে গিয়ে শুবি, আয় হতভাগা ছোঁড়া। বলিয়া তিনি বার্তাকু ভক্ষণের প্রশ্ন বিস্মৃত হইয়া আমার হাত ধরিয়া কোলের কাছে টানিয়া লইলেন।
মেজদা, জলদগম্ভীরকণ্ঠে সংক্ষেপে কহিলেন, এখন ও যেতে পারবে না।
কেন, কি করবে ও ? না, না, এখন আর পড়তে হবে না। আগে যা হোক দুটো মুখে দিয়ে একটু মুমোক। আয় আমার সঙ্গে, বলিয়া পিসিমা আমাকে লইয়া চলিবর উপক্রম করিলেন।
কিন্তু শিকার যে হাতছাড়া হয়। মেজদা স্থান-কাল ভুলিয়া প্রায় চীৎকার করিয়া আমাকে ধমক দিয়া উঠিলেনÑখবরদার! ঐাসনে বলচি শ্রীকান্ত।
পিসিমা পর্যন্ত যেন একটু চমকিয়া উঠিলেন, তারপরে মুখ ফিরাইয়া মেজদার প্রতি চাহিয়া শুধু কহিলেন, সতে! পিসিমা অত্যন্ত রাশভারী লোক। বাড়িসুদ্ধ সবাই তাঁহাকে ভয় করিত। মেজদা সে চাহনির সম্মুখে ভয়ে একেবাওে জড়সড় হইয়া উঠিল। আবার পাশের ঘরেই বড়দা বসেন। কথাটা তাঁর কানে গেেল আর রক্ষা থাকিত না।
পিসিমার একটা স্বভাব আমরা চিরদিন লক্ষ্য করিয়া আসিয়াছি, কখনও, কোন কারণেই তিনি চেঁচামেচি করিয়া লোক জড়ি করিয়া তুলিতে ভালবাসিতেন না। হাজার রাগ হইলেও তিনি জোরে কথা বলিতেন না। তিনি কহিলেন, তাই বুঝি ও দাঁড়িয়ে এখানে ? দেখ, সতীশ, যখন-তখন শুনি, তুই ছেলেদেও মারধোর করিস?। আজ থেকে কারো গায়ে যদি তুই হাত দিস আমি জানতে পারি, এই থামে বেঁধে চাকর দিয়ে তোকে আমি বেত দেওয়াব! বেহায়া, নিজে ফি বছর ফেলত হচ্চেÑও আবার যায় পরকে শাসন কতে! কেউ পড়–ক, না পড়–ক, কারুকে তুই জিজ্ঞেসা পর্যন্ত করতে পাবনেÑবলিয়া তিনি আমাকে লইয়া যে পথে প্রবেশ করিয়াছিলেন, সেই পথে বাহির হইয়া গেলেন। মেজদা মুখ কালি করিয়া বসিয়া রহিল। এ আদেশ অবহেলা করিবার সাধ্য বাড়িতে কাহারো নাইÑসে কথা মেজদা ভাল করিয়াই জানিত।
আমাকে সঙ্গে করিয়া পিসিমা তাঁর নিজের ঘরের মধ্যে আনিয়া কাপড় ছাড়াইয়া দিলেন এবং পেট ভরিয়া গরম গরম জিলাপি আহার করাইয়া বিছানায় শোয়াইয়া দিয়াÑআমি মরিলেই তাঁর হাড় জুড়ায়Ñএই কথা জানাইয়া দিয়া বাহির হইতে শিকল বন্ধ করিয়া চলিয়া গেলেন।
মিনিটি-পাঁচেক পরেই খুট করিয়া সাবধানে শিকল খুলিয়া ছোড়দা হাঁপাইতে আসিয়া আমার বিছানার উপর উপুড় হইয়া পড়িল। আনন্দে আতিশয্যে প্রথমটা সে কথা কহিতেই পারিল না। একটুখানি দম লইয়া ফিসফিস করিয়া কহিল, মেজদাকে মা কি হুকুম দিয়েচে জানিস ? আমাদের কোন কথায় তার থাকবার জো-টি নেই। তুই, আমি যতে একঘওে পড়বÑমেজদা অন্য ঘরে পড়বে। আমাদরে পুরনো পড়া বড়দা দেখাইবেন। ওকে আমরা আর কেয়ার করব না। বলিয়া সে দুই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ একত্র করিয়া সবেগে আন্দোলিত করিয়া দিল।
যতীনদাও পিছনে পিছনে আসিয়া হাজির হইয়াছিল। সে তাহার কৃতিত্বের উত্তেজনায় একেবাওে অধীর হইয়া উঠিয়াছিল এবং ছোটদাকে এই শুভ সংবাদ দিয়া সে-ই এখানে আনিয়াছিল। প্রথমে সে খুব খানিকটা হাসিয়া লইল। হাসি থামিলে নিজের বুকে বারংবার করাঘাত করিয়া কহিল, আমি! আমার জন্যেই হ’ল তা জানো ? ওকে আমি মেজদার কাছে না নিয়ে গেলে কি মা হুকুম দিত! ছোড়দা, তোমার কলের লাট্টুটা কিন্তু আমাকে দিতে হবে, তা বলে দিচ্চি।
আচ্ছা দিলুম। নিয়ে যা আমার ডেস্ক থেকে, বলিয়া ছোড়দা তৎক্ষণাৎ হুকুম দিয়া ফেলিল। কিনট্তু এই লাট্টুটা বোধকরি সে ঘণ্টাখানেক পূর্বে পৃথিবীর বিনিময়েও দিতে পারিত না।
এমনি মানুষের স্বাধীনতার মূল্য। এমনিই মানুষের ব্যক্তিগত ন্যায্য অধিকার লাভ করার আনন্দ। আজ আমার কেবলই মনে হইতেছেÑশিশুদেও কাছেও তাহার দুমূর্ল্যতা একবিন্দু কম নয়। মেজদা তাহার অগ্রজের অধিকারে সেচ্ছাচারে ছোটদেও যে-সমস্ত অধিকার গ্রাস করিয়া ফেলিল। বস্তুতঃ মেজদার অত্যাচাওে আর সীমা ছিল না’ রবিবাওে দুপুর রৌদ্রে এক মাইল পথ হাঁটিয়া গিয়া তাঁহার তাস খেলার বন্ধু ডাকিয়া আনিতে হইত। গ্রীষ্মের ছুটির দিনে তাঁহার দিবানিদ্রার সমস্ত সময়টা পাখার বাতাস করিতে হইত। শীতের রাত্রে তিনি লেপের মধ্যে হাত-পা ঢুকাইয়া কচ্ছপের মতো বসিয়া বই পড়িতেন, আর আমাদিগকে কাছে বসিয়া তাঁহার বহির পাতা উল্টাইয়া দিতে হইতÑঅমনি সমস্ত অত্যাচার! অতচ ‘না’ বলিবার জো নাই, কাহারও কাছে অভিযোগ করিবার সাধ্য পর্যন্ত নাই। ঘুনাক্ষওে জানিতে পারিলেও তৎক্ষণাৎ হুকুম করিয়া বসিতেন, কেশব, তোমার জিয়োগ্রাফি আনো পুরানো পড়া দেখি। যতীন যাও, একটা ভালো দেখে ঝাউয়ের ছড়ি ভেঙ্গে আনো। অর্থাৎ প্রহার অনিবার্য। অতএব আনন্দের মাত্রা যে ইহাদের বাড়াবাড়িতে গিয়া পড়িবে, ইহাও আশ্চর্যেও বিষয় নয়।
কিন্তু সে যতই হোক : আপাততঃ তাহাকে স্থগিত রাখা আবশ্যক, কারণ স্কুলের সময় হইতেছে। আমার জ্বরÑসুতরাং কোথাও যাইতে হইবে না।
আমার মনে পড়ে সেই রাত্রেই জ্বরটা প্রবল হইয়াছিল এবং সাত-আট দিন পর্যন্ত শয্যাগত ছিলাম।
তার কতদিন পরে স্কুলে গিয়েছিলাম এবং আরও যে কতদিন পরে ইন্দ্রের সহিত আবার দেখা হইয়াছিল, তাহা মনে নাই। কিন্তু সেটা যে অনেক দিন পওে, একথা মনে আছে। সেদিন শনিবার। স্কুল হইতে সকাল সকাল ফিরিয়াছি। গঙ্গার তখন জল মরিতে শুরু করিয়াছে। তাহারই সংলগ্ন একটা নালার ধারে বসিয়া, ছিপ দিয়া ট্যাঙরা মাছ ধরিতে বসিয়া গিয়াছি। অনেকেই ধরিতেছে। তাহারই সংলগ্ন একটা নালার ধারে বসিয়া, ছিপ দিয়া ট্যাঙরা মাছ ধরিতে বসিয়া গিয়াছি। অনেকেই ধরিতেছে। লোকটি ভাল দেখা যায় না, কিন্তু তাহার মাছধরা দেখা যায়। অনেকক্ষণ হইতেই আমার এ জায়গাটা পছন্দ হইতেছিল না। মনে করিলাম, উহারই পাশে গিয়া বসি। ছিপ হাতে করিয়া একটুখানি ঘুরিয়া দাঁড়াইবামাত্র সে কহিল, আমার ডানদিকে বোস। ভাল আছিস ত রে শ্রীকান্ত ? বুকের ভিতরটা ধক করিয়া উঠিল। তখনো তাহার মুখ দেখিতে পাই নাই; কিন্তু বুঝিলাম, এ ইন্দ্র। দেহের ভিতর দিয়া বিদ্যুতের তীব্র প্রবাহ বহিয়া গেলে যে যেখানে আছে এক মুহূর্তে যেমন সজাগ হইয়া উঠে, ইহার কণ্ঠস্বরেও আমার সেই দশা হইল! চক্ষের পলকে সর্বাঙ্গেও রক্ত চঞ্চল, উদ্দাম হইয়া বুকের উপর আছাড় খাইয়া পড়িতে লাগিল। কোনমতেই মুখ দিয়া একটা জবাব বাহির হইল না। এই কথাগুলি লিখিলাম বটে, কিন্তু জিনিসটা ভাষায় ব্যক্ত করিয়া পরকে বুঝানো শুধুই যে অত্যন্ত কঠিন তা নয়, বোধ করি বা অসাধ্য। কারণ বলিতে গেলে, এই সমস্ত বহু-ব্যবহৃত মামুলি বাক্যরাশিÑযেমন বুকের রক্ত তোলপাড় করাÑউদ্দাম চঞ্চল হইয়া আছাড় খাইয়াÑতড়িৎ প্রবাহ বহিয়া যাওয়াÑএই সব ছাড়া ত আর প থ নাই! আমিই বা কি করিয়া তাহাকে জানাইব, এবংঢ সেই বা কি করিয়া তাহা জানিবে ? যে নিজের জৎীবনে একটি দিনের তরেও অনুভব কওে নাই যাহাকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়াছি, কামনা করিয়াছি, আকাক্সক্ষা করিয়াছি, অথচ পাছে কোথাও কোনরূপে দেখা হইয়া পড়ে এই ভয়েও অহরহত কাঁটা হইয়া আছি, সে এমনি অকস্মাৎ এতই ভাবনীয়রূপে আমার চোখের উপর থাকিয়া আমাকে পার্শ্বে আসিয়া বসিতে অনুরোধ করিল! পাশে গিয়াও বসিলাম। কিন্তু তখনও কথা কহিতে পারিলাম না।
ইন্দ্র কহিল, সেদিন ফিরে এসে বড় মার খেয়েছিলÑনা রে শ্রীকান্ত! আমি তোকে নিয়ে গিয়ে ভালো কাজ করি নি। আমার সেজন্যে রোজ বড় দুঃখ হয়। আমি মাথা নাড়িয়া জানাইলাম, মার খাই নাই। ইন্দ্র খুশি হইয়া বলিল, খাস্নি! দেখ রে শ্রীকান্ত, তুই চলে গেলে আমি মা কালীকে অনেক ডেকেছিলুমÑযেন তোকে না মারে। কালীঠুকর বড় জাগ্রত দেবতা রে! মন নিয়ে ডাকলে কখনো কেউ মারতে পারে না। মা এসে তাদের এমনি ভুলিয়ে দেন যে, কেউ কিছু করতে পাওে না। বলিয়া সে ছিপটা রাখিয়া দুই হাত জোড় করিয়া কপালে ঠেকাইয়া বোধ করি তাঁকেই মনে মনে প্রণাম করিল। বঁড়শিতে একটা টোপ দিয়া সেটা জলে ফেলিয়া বলিল, আমিত ভাবিনি তোর জ্বও হবে; তাহ’লে সেও হতে দিতুম না।
আমি আস্তে আস্তে প্রশ্ন করিলাম, কি করতে তুমি ? ইন্দ্র কহিল, কিছুই না। শুধু জবাফুল তুলে এনে মা কালীর পায়ে দিতুম। উনি জবাফুল বড় ভালবাসেন। যে যা’ বলে দেয় তার তাই হয়। এ ত সবাই জানে। তুই জানিস নে ? আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমার অসুখত করেনিদদ ? ইন্দ্র আশ্চর্য হইয়া কহিল, আমার ? আমার কখ্খনো অসুখ কওে না। কখনো কিছু হয় না। হঠাৎ উদ্দীপ্ত হইয়া বলিল, দেখ, শ্রীকান্ত, আমি তোকে একটা জিনিস শিখিয়ে দেব। যদি তুই দুবেলা খুব মন দিয়ে ঠাকুরদেবতার নাম করিসÑতাঁরা সব সামনে এসে দাঁড়াবেন, তুই স্পষ্ট দেখতে পাবি। তখন আর তোর কোনো অসুখ করবে না। কেউ তোর একগাছি চুল পর্যন্ত ছুঁতে পারবে নাÑতুই আপনি টের পাবি। আমার মতন যেখানে খুশি যা, যা খুশি কর, কোন ভাবনা নেই বুঝলি ?
আমি ঘাড় নাড়িয়া বলিলামত, হুঁ। বঁড়শিতে টোপ দিয়া জলে ফেলিয়া মৃদুকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলাম, এখন তুমি কাকে নিয়ে সেখানে যাও ?
কোথায় ?
ওপাওে মাছ ধরতে ?
ইন্দ্র ছিপটা তুলিয়া লইয়া সাবধানে পাশে রাখিয়া বলিল, আমি আর যাইনে। তাহার কথা শুনিয়া ভারি আশ্চর্য হইয়া গেলাম। কহিলামদ, আর একদিনও যাও নি ?
না, একদিনও না। আমাকে মাথার দিব্যি দিয়েÑকথাটা ইন্দ্র শেষ না করিয়াই ঠিক যেন থতমত খাইয়া চুপ করিয়া গেল।
উহার সম্বন্ধে এই কথাই আমাকে অহরহ খোঁচার মত বিঁধিয়াছে। কোন মতই সেই সেদিনের মাছ বিক্রিটা ভুলিতে পারি নাই। তাই সে যদি বা চুপ করিয়া গেল, আমি পারিলামতদ না। জিজ্ঞাসা করিলাম, কে মাথার দিব্যি দিলে ভাই ? তোমার মা ?
না, মাদ নয়। বলিয়া ইন্দ্র চুপ করিয়া রহিল। তার পরে সে ছিপের গায়ে সুতাটা ধীরে ধীরে জড়াইতে জড়াইতে কহিল, শ্রীকান্ত, আমাদের সে রাত্রির কথা তুই বাড়িতে বলে দিসনি ?
আমি বলিলাম না,। কিন্তু তোমার সঙ্গে চ’লে গিয়েছিলাম তা সবাই জানে।
ইন্দ্র আর কোন প্রশ্ন করিল না। আমি ভাবিয়াছিলাম, এইবার সে উঠিবে। কিন্তু তাহাও করিল নাÑচুপ করিয়া বসিয়া রহিল। তাহার মুখে সর্বদাই কেমন একটা হাসির ভাব থাকে, এখন তাহাও নাই এবং কি একটা সে যেন বোধ করিতেছে। আপনারা পাঁচজন এখানে হয়ত বলিয়া বসিবেন, এটি বাপু তোমার কিন্তু মিছে কথা। অতখানি মনস্তত্ব আবিষ্কার করিবার বযসটা ত তা নয়। আমিও তাহা স্বীকার করি। কিন্তু আপনারাও এ কথাটা ভুলিতেছেন যে, আমি ইন্দ্রকে ভালবাসিয়াছিলাম। একজন আর একজনের মন বুঝে সহানুভূতি এবং ভালবাসা দিয়াÑবয়স এবং বুদ্ধি দিয়া নয়। সংসারে যত ভালবাসিয়াছে, পরের হৃদয়ের ভাষা তাহার কাছে তত ব্যক্ত হইয়া উঠিয়াছে। এই অত্যন্ত কঠিন অন্তদৃষ্টি শুধু ভালবাসার জোরেই পাওয়া যায় আর কিছুতে নয়। তাহার প্রমাণ দিতেছি। ইন্দ্র এই তুলিয়া কি যেন বলিতে গেল, কিন্তু বলিতে না পারিয়া সমস্ত মুখ তার অকারণে রাঙ্গা হইয়া উঠিল। তাড়াতাড়ি একটা শরের ডাঁটা ছিঁড়িয়া নতমুখে জলের উপরে নাড়িতে নাড়িতে কহিল, শ্রীকান্ত!
কি ভাই ?
তোরÑতোর কাছে টাকা আছে ?
ক’টাকা ?ÑএইÑধর, পাঁচ টাকাÑ
আছে। তুমি নেবে ? বলিয়া আমি ভারি খুশি হইয়া তাহার মুখপানে চাহিলাম। এ কয়টি টাকাই আমার ছিল। ইন্দর কাজে লাগিবার অপেক্ষা তাহার সদ্ব্যবহার আমি কল্পনা করিতেও পারিতাম না। কিন্তু ইন্দ্র ত কৈ খুশি হইল না। মুখ যেন তাহার অধিকতর লজ্জায় কি একরকম হইয়া গেল। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল, কিন্তু আমি ত এখন তোকে ফিরিয়ে দিতে পারব না।
আমি আর চাইনে, বলিয়া সগর্বে তাহার মুখের পানে চাহিলামদ।
আবার কিছুক্ষণ সে মুখ নিচু করিয়া থাকিয়া ধীরে ধীরে কহিল, আমি নিজে চাইনে। একজনদেও দিতে হবে, তাই। তারা বড় দুঃখী রেÑখেতেও পায় না। তুই যাবি সেখানে! চক্ষের নিমেষে আমার সে রাত্রির কথা মনে পড়িল। কহিলাম, সেই যাদের তুমি টাকা দিতে নেমে যেতে চেয়েছিলে ? ইন্দ্র অন্যমনস্ক ভাবে মাথা নাড়িয়া বলিল, হাঁ তারাই। টাকা আমি নিজেই ত কত দিতে পারি, কিন্তু দিদি যে কিছুতে নিতে চায় না। তোকে একটিবার যেতে হবে শ্রীকান্ত, নইলে এ টাকাও নেবে না; মনে করবে, আমি মায়ের বাক্স থেকে চুরি ক’রে এনেচি! যাবি শ্রীকান্ত ?
তারা বুঝি তোমার দিদি হয় ?
ইন্দ্র একটু হাসিয়া কহিল, দিদি হয় নাÑদিদি বলি। যাবি ত ? আমাকে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া তখনি কহিল, দিনের বেলা গেলে সেখানে কোন ভয় নেই। কাল রবিবার ? তুই খেয়েদেয়ে এইখানে দাঁড়িয়ে থাকিস আমি নিয়ে যাব; আবার তখখুনি ফিরিয়ে আনব। যাবি ত ভাই ? বলিয়া যেমন করিয়া সে আমার হাতটি ধরিয়া মুখের পানে চাহিয়া রহিল, তাহাতে আমার ‘না’ বলিবার সাধ্য রহিল না। আমি দ্বিতীয়বার তাহার নৌকায় উঠিবার কথা দিয়া বাড়ি আসিলাম।
কথা দিলাম সত্য, কিন্তু সে যে কতবড় দুঃসাহসের কথা, সে তা আমার চেয়ে কেউ বেশি জানে না। বিকালবেলাটা মন ভারী হইয়া রহিল, এবং রাত্রে ঘুমের ঘোরে প্রগাঢ় অশান্তির ভাব সর্বাঙ্গে বিচরণ করিয়া ফিরিতে লাগিল। ভোরবেলা উঠিয়া সর্বাগ্রে ইহাই মনে পড়িল আজ যেখানে যাইব বলিয়া প্রতিশ্রæত হইয়াছি, সেখানে যাইলে কোনমতেই আমার ভাল হইবে না। কোন সূত্রে কেহ জানিতে পারিলে, ফিরিয়া আসিয়া যে শাস্তি ভোগ করিতে হইবে, মেজদার জন্যও ছোড়দা বোধ করি সে শাস্তি কামনা করিতে পারিত না। অবশেষে খাওয়া দাওয়া শেষ হইলে টাকা পাঁচটি লুকাইয়া নিঃশব্দে যখন বাহির হইয়া পড়িলাম, তখন এমন কথাও অনেকবার মনে হইলÑকাজ নাই গিয়া। নাই বা কথা রাখিলাম; এমনই বা হাতাতে কি আসে যায়! যথাস্থানে উপস্থিত হইয়া দেখিলাম, শরঝাড়ের নীচে সেই ছোট্ট নৌকাটির উপর ইন্দ্র উদগ্রীব হইয়া অপেক্ষা করিয়া আছে। চোখাচোখি হইবামাত্র সে এমন করিয়া হাসিয়া আহŸান করিল যে, না-যাওয়ার কথা মুখে আনিতেও পারিলাম না। সাবধানে ধীরে ধীরে নামিয়া নিঃশব্দে নৌকাটিতে চড়িয়া বসিলাম। ইন্দ্র নৌকা ছাড়িয়া দিল।
আজ মনে ভাবি, আমার বহুজন্মেও সুকৃতির ফল যে, সেদিন ভয়ে পিছাইয়া আসি নাই। সে দিনটিকে উপলক্ষ্য করিয়া যে জিনিসটি দেখিয়া লইয়াছিলাম, সারা জীবনের মধ্যে পৃথিবী ঘুরিয়া বেড়াইয়াও তেমন কয়জনের ভাগ্যে ঘটে। আমিই বা তাহার মত আর কোথায় দেখিতে পাইলাম। জীবনে এমন-সব শুভ মুহূর্তে অনেকবার আসে না। একবার যদি আসে, সে সমস্ত চেতনার উপর এমন গভীর একটা ছাপ মারিয়া দিয়া যায় যে, সেই ছাঁচেই সমস্ত পরবর্তী জীবন গড়িয়া উঠিতে থাকে। আমার তাই বোধ হয়, স্ত্রীলোককে কখনও আমি ছোট করিয়া দেখিতে পারিলাম না। বুদ্ধি দিয়া যতই কেন না তর্ক করি, সংসাওে পিশাচী কি নাই ? নাই যদি তবে পথেঘাটে এত পাপের মূর্তি দেখি কাহাদেও ? সবাই যদি সেই ইন্দ্রর দিদি, তবে এত প্রকার দুঃখের স্রোত বহাইতেছে কাহারা ? তবুও কেমন করিয়া যেন মনে হয়, এ-সকল তাহাদের শুধু বাহ্য আবরণ, যখন খুশি ফেলিয়া দিয়া ঠিক তাঁর মতই সতীর আসনে উপর অনায়াসে গিয়া বসিতে পারে। বন্ধুরা বলেন, ইহা আমার একটা অতি জঘন্য শোচনীয় ভ্রমমাত্র। আমি তাহারও প্রতিবাদ করি না। শুধু বলি, ইহা আমার যুক্তি নয়Ñআমার সংস্কার। সংস্কারের মূলে যিনি জানি না সেই পূণ্যবতী আজও বাঁচিয়া আছেন কি না। থাকিলেও কোথায় কীভাবে আছেন, তাঁহার নির্দেশমত কখনো কোন সংবাদ লইবার চেষ্টাও করি নাই। কিন্তু কত যে মনে তাঁকে প্রণাম করিয়াছি, তাহা যিনি সব জানিতে পারেন, তিনিই জানেন।
শ্মশানের সেই সঙ্কীর্ণ ঘাটের পাশে বটবৃক্ষমূলে ডিঙি বাঁধিয়া যখন দুজনে রওনা হইলাম, তখনও অনেক বেলা ছিল। কিছু দূর গিয়া ডানদিকে বনের ভিতর ঠাহর করিয়া দেখায়, একটা পথের মতও দেখা গেল। ইন্দ্র তাহাই ধরিয়া ভিতরে প্রবেশ করিল। প্রায় দশ মিনিট চলিবার পর একটা পর্ণকুটির দেখা গেল। কাছে আসিয়া দেখিলাম, ভিতরে ঢুকিবার পথ আগড় দিয়া আবদ্ধ। ইন্দ্র সাবধানে তাহার বাঁধন খুলিয়া ঠেলা দিয়া প্রবেশ করিল এবং আমাকে টানিয়া লইয়া পুনরায় তেমনি করিয়া বাঁধিয়া দিল। আমি তেমন বাসস্থান কখনো জীবনে দেখি নাই। একে ত চতুর্দিকেই নিবিড় জঙ্গল, তাহাতে মাথার উপরে একটা প্রকাÐ তেঁতুল গাছ এবং পাকুড় গাছে সমস্ত জায়গাটা যেন অন্ধকার করিয়া রাখিয়াছে। আমাদের সাড়া পাইয়া একপাল মুরগী এবং ছানাগুলা চীৎকার করিয়া উঠিল। একধারে বাঁধা গোটাদুই ছাগল ম্যাঁ ম্যাঁ করিয়া ডাকিয়া উঠিল। সুমুখে চাহিয়া দেখিÑওরে বাবা! একটা প্রকাÐ অজগর সাপ আঁকিয়া-বাঁকিয়া প্রায় সমস্ত উঠান জুড়িয়া আছে। চক্ষের নিমেষে অস্ফুট চীৎকারে মুরগিগুলাকে আরও ত্রস্ত ভীত করিয়া দিয়া আঁচড়-পিঁচড় করিয়া একেবারে সেই বেড়ার উপর চড়িয়া বসিলাম। ইন্দ্র খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিয়া কহিল, ও কিছু বলে না রে, বড় ভালোমানুষ। ওর নাম রহিম। বলিয়া কাছে গিয়া তাহার পেটটা ধরিয়াটানিয়া উঠানের ওধারে সরাইয়াদিল। তখন নামিয়া আসিয়াডানদিকে চাহিয়া দেখিলাম, সেই পর্ণকুটিরে বারান্দার উপরে বিস্তর ছেঁড়া চাটাই ও ছেঁড়া কাঁথার বিছানায় বসিয়া একটা দীর্ঘকায় পাতলাগোছের লোক প্রবল কাসির পরে হাঁপাইতেছে। তাহার মথায় জটা উঁচু করিয়া বাঁধা, গলায় বিবিধ প্রকারের ছোটবড় মালা। গায়ের জামা এবং পরনের কাপড় অত্যন্ত মলিন এবং একপ্রকার হলদে রঙে ছোপানো। তাহার লম্বা দাড়ি বস্ত্রখÐ দিয়া জটার সহিত বাঁধা ছিল বলিয়াই প্রথমটা চিনিতে পারি নাই; কিন্তু কাছে আসিয়াই চিনিলাম সে সাপুড়ে। মাস পাঁচ-ছয় পূর্বে তাহাকে প্রায় সর্বত্রই দেখিতাম। আমাদের বাটীতেও তাহাকে কয়েকবার সাপ খেলাইতে দেখিয়াছি। ইন্দ্র তাহাকে শাহজী সম্বোধন করিল এবং সে আমাদিগকে বসিতে ইঙ্গিত করিয়া, হাত তুলিয়া ইন্দ্রকে গাঁজার সাজ-সরঞ্জাম এবং কলিকাটি দেখাইয়া দিল। ইন্দ্র দিরুক্তি না করিয়া, আদেশ পালন করিতে লাগিয়া গেল এবং প্রস্তুত হইলে শাহজী সেই কাসির উপর ঠিক যেন ‘মরি-বাঁচি’ পণ করিয়া টানিতে লাগিল এবং একবিন্দু ধোঁয়াও পাছে বাহির হইয়া পড়ে, এই আশঙ্কায় নাকেমুখে বাম করতল চাপা দিয়া মাথায় একটা ঝাঁকানির সহিত কলিকাটি ইন্দ্রের হাতে তুলিয়া দিয়া কহিল, পিয়ো।
ইন্দ্র পান করিল না। ধীরে ধীরে নামাইয়া রাখিয়া কহিল না, শাহজী অতিমাত্রায় বিস্মিত হইয়া কারণ জিজ্ঞাসা করিল; কিন্তু উত্তরের জন্য একমুহূর্তে অপেক্ষা না করিয়াই সেটা নিজেই তুলিয়া লইয়া টানিয়া টানিয়া নিঃশেষ করিয়া উপুড় করিয়া রাখিল। তার পরে দুজ“ে মৃদুকণ্ঠে কথাবার্তা শুরু হইল। তাহার অধিকাংশ শুনিতেও পাইলাম না, বুঝিতেও পরিলাম না। কিন্তু এই একটা বিষয় লক্ষ্য করিলাম, শাহজী হিন্দিতে কথা কহিলেও ইন্দ্র বাঙ্গালা ছাড়া কিছুই ব্যবহার করিল না।
শাহজীর কণ্ঠস্বর ক্রমেই উত্তপ্ত হইয়া উঠিতেছিল, এবং দেখিতে দেখিতে তাহা উন্মত্ত চীৎকারে পরিণত হইল কাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া সে যে এরূপ অকথ্য অশ্রাব্য গালিগালাজ উচ্চারণ করিতে লাগিল, তাহা তখন বুঝিলে ইন্দ্র সহ্য করিয়াছিল বটে, কিন্তু আমি করিতাম না। তারপরে লোকটা বেড়ায় ঠেস দিয়া বসিল এবং অনতিকাল পরেই ঘাড় গুঁজিয়া ঘুমাইয়া পড়িল। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ বসিয়া থাকিয়া যেন অস্থির হইয়া উঠিলাম, বলিলাম বেলা যায় তুমি সেখানে যাবে না ?
কোথায় শ্রীকান্ত ?
তোমার দিদিকে টাকা দিতে যাবে না ?
দিদির জন্যই ত ব’সে আছি। এই ত তাঁর বাড়ি।
এই তোমার দিদির বাড়ি! এরা ত সাপুড়েÑমুসলমান। ইন্দ্র কি-একটা কথা বলিতে উদ্যত হইয়াই, চাপিয়া গিয়া চুপ করিয়া আমার দিকে চাহিয়া রহিল। তাহার দুই চক্ষের দৃষ্টি বড় ব্যথায় একেবারে যেন ¤øান হইয়া গেল। একটু পরেই কহিল, একদিন তোকে সব কথা বলব। সাপ খেলাব দেখবি শ্রীকান্ত ?
তাহার কথা শুনিয়া অবাক হইয়া গেলাম। তুমি সাপ খেলাবে কি ? কামড়ায় যদি ? ইন্দ্র উঠিয়া গিয়া ঘরে ঢুকিয়া একটা ছোট ঝাঁপি এবং সাপুড়ের বাঁশি বাহির করিয়া আনিল; এবং সুমুখে রাখিয়া ডালার বাঁধন আলগা করিয়া বাঁশিতে ফুঁ দিল। আমি ভয়ে আড়ষ্ট হইয়া উঠিলাম। ডালা খুলো না ভাই, ভেতরে যদি গোখরো সাপ থাকে! ইন্দ্র তাহার জবাব দেওয়াও আবশ্যক মনে করিল না, শুধু ইঙ্গিতে জানাইল যে সে গোখরা সাপই খোলাইবে, এবং পরক্ষণেই মাথা নাড়িয়া নাড়িয়া বাঁশি বাজাইয়া ডালাটা তুলিয়া ফেলিল। সঙ্গে সঙ্গেই প্রকাÐ গোখরা একহাত উঁচু হইয়া ফণা বিস্তার করিয়া উঠিল; এবং মুহূর্ত বিলম্ব না করিয়া ইন্দ্রর হাতের ডালায় একটা তীব্র ছোবল মারিয়া ঝাঁপি হইতে বাহির পড়িল। বাপ্ রে! বলিয়া ইন্দ্র উঠানে লাফাইয়া পড়িল। আমি বেড়ার গায়ে চড়িয়া বসিলাম। ক্রব্ধ সর্বরাজ বাঁশির লাইয়ের ওপর আর একটা কামড় দিয়া ঘরের মধ্যে দিয়া ঢুকিল। ইন্দ্র মুখ কালি করিয়া কহিল, এটা একেবারে বুনো। আমি যাকে খেলাই, সে নয়। ভয়ে বিরক্তিতে রাগে আমার প্রায় কান্না আসিতেছিল, বলিলাম, কেন এমন কাজ করলে ? ও বেরিয়ে যদি শাহজীকে কামড়ায় ? ইন্দ্রর লজ্জার পরিসীমা ছিল না। কহিল, ঘরের আগড়টা টেনে দিয়ে আসবে ? কিন্তুযদি পাশেই লুকিয়ে থাকে ? আমি বলিলাম, তা হ’লে বেরিয়েই ওকে কামড়াবে। ইন্দ্র রিূপায়ভাবে এদিক-ওদিক চাহিয়া বলিল, কামড়াক ্যাটাকে! বুনো-সাপ ধরে রাখেÑগাঁজাখোর শালার এতটুকু বুদ্ধি নেই। এই যে দিদি! এসো না, এসো না ঐখানে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি ঘাড় ফিরাইয়া ইন্দ্রর দিদিকে দেখিলাম। যেন ভস্মাচ্ছাদিত বহ্নি! যেন যুগ-যুগান্তরব্যাপী কঠোর তপস্য সাঙ্গ করিয়াতিনি এইমাত্র আসন হইতে উঠিয়া আসিলেন। বাঁ-কাঁকালে আঁটিবাধা কতকগুলি শুকনো কাঠ এবং ডানহাতে ফুলের সাজির মতো একখানা ডালার মধ্যে কতকগুলি শাক-সবজি। পরনে হিন্দুস্থানী মুসলমানীর মতো জামাকাপড় গেরুয়া রঙে ছোপান, কিন্তু ময়লার মলিন নয়। হাতে দুগাছি গলার চুড়ি। সিঁথায় হিন্দু-নারীর মতো সিঁদুরের আয়তি-চিহ্ন। তিনি কাঠের বেঝাটা নামাইয়া রাখিয়া আগড়টা খুলিতে খুলিতে বলিলেন, কি ? ইন্দ্র মহাব্যস্ত হইয়া বলিল, খুলো না দিদি, তোমার পায়ে পড়িÑমস্ত একটা সাপ ঘরে ঢুকেছে। তিনি আমার মুখের পানে চাহিয়া কি যেন ভাবিয়া লইলেন। তার পরে একটুখানি হাসিয়া পরিষ্কার বাঙ্গালায় বলিলেন, তাই ত! সাপুড়ের ঘরে সাপ ঢুকেছে, এ ত বড় আশ্চর্য! কি বল শ্রীকান্ত ? আমি অনিমেষ দৃষ্টিতে শুধু তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলাম।Ñকিন্তু কি করে সাপ ঢুকল ইন্দ্রনাথ ? ইন্দ্র বলিল, ঝাঁপির ভেতর থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে পড়েছে, একেবারে বুনো-সাপ।
উনি ঘুমোচ্চেন বুঝি ? ইন্দ্র রাগিয়া কহিল, গাঁজা খেয়ে একেবারে অজ্ঞান হয়ে ঘুমোচ্ছে। চেঁচিয়ে মরে গেলেও উঠবে না। তিনি আবার একটুখানি হাসিয়া বলিলেন, আর সেই সুযোগে তুমি শ্রীকান্তকে সাপ খেলানো দেখাতে গিয়েছিলে, না ? আচ্ছা এসো, আমি ধ’রে দিচ্ছি।
তুমি যেয়ো না দিদি, তোমাকে খেয়ে ফেলবে। শাহ্জীকে তুলে দাওÑআমি তোমাকে যেতে দেব না। বলিয়া ইন্দ্র ভয়ে দুই হাত প্রসারিত করিয়া পথ আগলাইয়া দাঁড়াইল। তাহার এই ব্যাকুল কণ্ঠস্বরে যে ভালোবাসা প্রকাশ পাইল তাহা তিনি টের পাইলেন। মুহূর্তের জন্য চোখ দুটি তাঁহার ছলছল করিয়া উঠিল, কিন্তু গোপন করিয়া হাসিয়া বলিলেন, এরে পাগলা, অত পুণ্যি তোর এই দিদির নেই। আমাকে খাবে নারে রেÑএখ্খুনি ধ’রে দিচ্চি দ্যাখ। বলিয়া বাঁশের মাচা হইতে কেরোসিনের ডিপা জ্বালিয়া লইয়া ঘুরে ঢুকিলেন এবং এক মিনিটের মধ্যে সাপটাকে ধরিয়া আনিয়া ঝাঁপিতে বন্ধ করিয়া ফেলিলেন। ইন্দ্র ঢিপ করিয়া তাঁহার পায়ের উপর একটা নমস্কার করিয়া পায়ের ধুলা মাথায় লইয়া বলিল, দিদি, তুমি যদি আমার আপনার দিদি হ’তে। তিনি ডান হাত বাড়াইয়া ইন্দ্রের চিবুক স্পর্শ করিলেন, এবং অঙ্গুলির প্রান্তভাগ চুম্বন করিয়া মুখ ফিরাইয়া বোধ করি অলক্ষ্যে একবার নিজের চোখদুটি মুছিয় ফেলিলেন।

পাঁচ
সমস্ত ব্যাপারটা শুনিতে শুনিতে ইন্দ্র দিদি হঠাৎ এমনি শিহরিয়া উঠিলেন যে, ইন্দ্র সেদিকে যদি কিছুমাত্র খেয়াল থাকিত, সে আশ্চর্য হয়িা যাইত। সে দেখিতে পাইল না কিন্তু আমি পাইলাম। তিনি কিছুক্ষণ নীরবে চাহিয়া থাকিয়া সস্নেহে তিরস্কারের কণ্ঠে কহিলেন, ছি দাদা, এমন কাজ আর কখখনো করো না। এ-সব ভয়ানক জানোয়ারনিয়ে কি খেলা করতে আছে ভাই ? ভাগ্যে তোমার হাতের ডালাটায় ছোবল মেরেছিল, না হলে আজ কি কাÐ হত বলত ?
আমি কি তেমনি বোকা দিদি! বলিয়া ইন্দ্র সপ্রতিভ হাসিমুখে ফস করিয়া তাহার কোঁচার কাপড়টা টানিয়াফেলিয়া কোমরে সুতা-বাঁধা কি একটা শুকনা শিকড় দেখাইয়া বলিল, এই দ্যাখো দিদি আট-ঘাট বেঁধে রেখেছি কিনা! এ না থাকলে কি আর আজ আমাকে না ছুবলে ছেড়ে দিত। শাহ্জীর কাছে এটুকু আদায় কতে কি আমাকে কম কষ্ট পেতে হয়েছে ? এ সঙ্গে থাকলে কেউ ত কামড়াতে পারেই না; আর তাই যদি বা কামড়াতোÑতাতেই বাকি! শাহজীকে টেনে তুলে তক্ষুণি বিষÑপাথরটা ধরিয়ে দিতুম। আচ্ছা, দিদি, ঐ বিষ-পাথরটায় কতক্ষণে বিষ টেনে নিতে পারে ? আধঘণ্টা ? না অতক্ষণ লাগে না, না দিদি ?
দিদি কিন্তু তেমনি নীরবে চাহিয়া রহিলেন। ইন্দ্র উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছিল, বলিল, আজ দাও না দিদি, আমাকে একটি। তোমাদের তো দুটো-তিনটে রয়েছেÑআর আমি কতদিন ঘরে চাইচি। বলিয়াসে উত্তরের জন্য প্রতিক্ষামাত্র না করিয়া স্বপ্ন অভিমানের সুরে তৎক্ষণাৎ বলিয়া উঠিল, আমাকে তোমরা যা বল আমি তাই করিÑআর তোমরা কেবল পট্টি দিয়ে আমাকে আজ নয়, কাল নয় পরশুÑযদি নাই দেবে বলে দাও না কেন ? আমি আর আসব নাÑযাও।
ইন্দ্র লক্ষ্য করিল না, কিন্তু আমি তাহার দিদির মুখের পানে চাহিয়া শে অনুভব করিলাম যে, তাঁর মুখখানি কিসের অপরিসীম ব্যথায় ও লজ্জায় যেন একেবারে কালিবর্ণ হইয়া গেল! কিন্তু পরক্ষণই জোর করিয়া একটুখানি হাসির ভাব সেই শীর্ণ ওষ্ঠাধার টানিয়া আসিয়া কহিলেন, হ্যাঁ রে ইন্দ্র, তুই কি তোর দিদির বাড়িতে শুধু সাপের মন্ত্র আর বিষÑপাথরের জন্যেই আসিস রে ?
ইন্দ্র অসঙ্কোচে বলিয়া বসিল, তবে না ত কি! নিদ্রিত শাহজীকে একবার আড়চোখে চাহিয়া দেখিয়া কহিল, কিন্তু কেবলই আমাকে ভোগা দিচ্চেÑএ তিথি নয়, ও তিথি নয়, সেই যে কবে শুধু হাতচালার মন্তরটুকু দিয়েছিল আর দিতেই চায় না। কিন্তু আজ আমি টের পেয়েছি দিদি, তুমিও কম নয়, তুমিও সব জানো। ওকে আর আমি খোশমোদ করচি নে দিদি, তোমার কাছ থেকেই সমস্ত মন্তর আদায় ক’রে নেবো। বলিয়াই আমার প্রতি চাহিয়া সহসা একটা নিশ্বাস ফেলিয়া, শাহজীকে উদ্দেশ করিয়া গভীর সম্ভ্রমের সহিত কহিল, শাহজী গাঁজা টাজা খান বটে, শ্রীকান্ত, কিন্তু তিন দিনের বাসীমড়া আধঘন্টার মধ্যে দাঁড় করিয়ে দিতে পারবেন-এত বড় ওস্তাদ উনি! হাঁ দিতি, তুমিও মড়া বাঁচানো পারো ?
দিদি কয়েক মুহূর্তে চুপ করিয়া চাহিয়া থাকিয়া সহসা খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিলেন! সে কি মধুর হাসি! অমন করিয়া হাসিতে আমি আজ পর্যন্ত কম লোককেই দেখিয়াছি। কিন্তু সে যেন নিবিড় মেঘবরা আকাশের বিদ্যুৎ-দীপ্তির মত পরক্ষণেই অন্ধকারে মিলাইয়া গেল।
কিন্তু ইন্দ্র সেদিক দিয়াই গেল না। বরঞ্চ একেবারে পাইয়া বসিল। সেও হাসিয়া কহিল, আমি জানি, তুমি সব জানো। কিন্তু আমাকে একটি একটি করে তোমাকে সব বিদ্যে দিতে হবে, তাবলে দিচ্চি! আমি যতদিন বাঁচব, তোমাদের এক্কেবারে গোলাম হয়ে থাকব। তুমি কটা মড়া বাঁচিয়েচ দিদি ?
দিদি কহিলেন, আমিত মড়া বাঁচাতে জানিনে ইন্দ্রনাথ।
ইন্দ্র বিশ্বাস করিল না। বলিঃল, ইস! জান না বৈ কি! দেবে না, তাই বল। আমার দিকে চাহিয়া কহিল, কড়িচালা ককনো দেখেচিস শ্রীকান্ত ? দুটি কড়ি মন্তর পড়ে ছেড়ে দিলে তারা উড়ে গিয়ে যেখানে সাপ আছে, তার কপালে দিয়ে কামড়ে ধরে সাপটাকে দশ ডদিনের পথ থেকে টেনে এনে হাজির করে দেয়। এমনি মন্তরের জোর! আচ্ছা দিদি, ঘর-বন্ধন, ধুলো-পড়া এ-সব জান ত ? আর যদি না জানবে ত অমন সাপটাকে ধরে দিলে কি করে ? বলিয়া সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দিদির মুখের পানে চাহিয়া রহিল।
দিদি অনেকক্ষণ নিঃশব্দে নতমুখে বসিয়া মনে কি যেন চিন্তাক রিয়া লইলেন; শেষে মুখ তুলিয়া ধীরে ধীরে বলিলেন, ইন্দ্র, তোর দিদির এ-সব কানাকড়ির বিদ্যেও নেই। কিন্তু কেন নেই, সে যদি তোরা বিশ্বাস করিস ভাই, তা হ’লে আজ তোদের কাছে আমি সমস্ত ভেঙ্গে ব’লে আমার বুকখানা হালকা করে িেল। বল তোরা ্মার সব কথা আজ বিশ্বাস করবি ? বলিতে বলিতেই তাঁহার শেষের কথাগুলি কেমন একরকম যেন ভারী হইয়া উঠিল।
আমি নিজে এতক্ষণ প্রায় প্রায় কোনকথাই কহি নাই। এইবার সর্বাগ্রে জোর করিয়া বলিয়া উঠিলাম, আমি তোমার সব কথা বিশ্বাস করব দিদি! সবÑযা বলবে সমস্ত। একটি কথাও অবিশ্বাস করব না।
তিনি আমার প্রতি চাহিয়া একটুখানি হাসিয়া বলিলেন, বিশ্বাস করবে বৈ কি ভাই! তোমরা যে ভদ্রলোকের ছেলে। যারা ইতর, তারাই শুধু অজানা অচেনা লোকের কথায় সন্দেহ ভয়ে পিছিয়ে দাঁড়ায়। তা ছাড়া আমি ত কখনও মিথ্যে কথা কইনে ভাই! বলিয়া তিনি আর একবার আমার প্রতি চাহিয়া স্নানভাবে একটুখানি হাসিলেন।
তখন সন্ধ্যার ঝাপসা কাটিয়া গিয়া আকাশে চাঁদ উঠিয়াছিল এবং তাহারই অস্ফুট কিরণরেখা গাছের ঘনবিন্যস্ত ডাল ও পাতার ফাঁক দিয়া নীচের গাঢ় অন্ধকারে ঝরিয়া পড়িতেছিল।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকিয়া, দিদি হঠাৎ বলিয়া উঠিলেন, ইন্দ্রনাথ, মনে করেছিলুম, আজই আমার সমস্ত খতা তোমাদের জানিয়ে দেব! কিন্তু ভেবে দেখছি, এখন ও সে সময় আসে নি। আমার এই কথাটুকু আজ শুধু বিশ্বাস কোরো ভাই, আমাদের আগাগোড়া সমস্তই ফাঁকি। আর তুমি মিথ্যে আশা নিয়ে শাহজীর পিছনে পিছনে ঘুরে বেড়িয়ো না। আমরা তন্ত্রমন্ত্র কিছুই জানিনে, মড়াও বাঁচাতে পারিনে; কড়ি চেলে সাপ ধরে আনতেও পারিনে। আর কেউ পারে কি না, জানিনে, কিন্তু আমাদের কোন ক্ষমতাই নেই।
কি জানি কনে আমি এই অত্যল্প কালের পরিচয়েই তাঁহার প্রত্যেক কথাটি অসংশয়ে বিশ্বাস করিলাম; কিন্তু এতদিনের ঘনিষ্ঠ পরিচয়েও ইন্দ্র পারিল না। সে ক্রুব্ধ হইয়া কহিল, যদি পার না, তবে সাপ ধরলে কি ক’রে ?
দিদি বললেন, ওটা শুধু হাতের কৌশল ইন্দ্র, কোন মন্ত্রের জোরে নয়। সাপের মন্ত্র আমরা জানিনে।
ইন্দ্র বলিল, যদি জান না, তবে তোমরা দুজনে জোচ্চুরি ক’রে ঠকিয়ে আমার কাছ থেকে এতটাকা নিয়েচ কেন ?
দিতি তৎক্ষণাৎ জবাব দিতে পারিলেন না; বোধ করি বা নিজেকে একটুখানি সামলাইয়া লইতে লাগিলেন। ইন্দ্র পুনরায় কর্কশকণ্ঠে কহিল, ঠগ জোচ্চোর সবÑআচ্ছা আমি দেখাচ্ছি তোমাদের মজা।
অদূরেই একটা কেরোসিনের ডিপা জ্বলিতেছিল। আমি তাহারই আলোকে দেখিতে পাইলাম, দিদির মুখখানি একেবারে যেন মড়ার মতো সাদা হইয়া গেল। সভয়ে সসঙ্কোচে বলিলেন, আমরা যে সাপুড়েÑভাই, ঠকানোই যে আমাদের ব্যবসা।
ব্যবসা বার ক’রে দিচ্চিÑচলরে শ্রীকান্ত, জোচ্চোর শালাদের ছায়া মাড়াতে নেই। হারামজাদা বজ্জাত ব্যাটারা। বলিয়া ইন্দ্র সহসা আমার হাত ধরিয়া সজোরে একটা টান দিয়া খাড়া হইয়া উঠিল, এবং মুহূর্ত বিলম্ব না করিয়া আমাকে টানিয়া লইয়া চলিল।
ইন্দ্রকে দোষ দিতে পারি না, কারণ তাহার অনেক দিনের অনেক বড় আশা একেবারে চোখের পলকে ভূমিসাৎ হইয়া গেল, কিন্তু আমার দুই চোখ যে দিদির সেই দুটি চোখের পানে চাহিয়া আর চোখ ফিরাইতে পারিল না। জোর করিয়া ইন্দ্রের হাত ছাড়াইয়া লইয়া পাঁচটি টাকা রাখিয়া দিয়া বলিলাম, তোমার জন্যে এনেছিলাম দিদিÑএই নাও। তুই জানিস শ্রীকান্ত ? এরা না খেয়ে শুকিয়ে মরুক, সেই আমি চাই।
আমি তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিলাম, না ইন্দ্র, দাওÑআমি দিদির নাম করে এনেচিÑ
ওঃÑভারী দিদি! বলিয়া সে আমাকে টানিয়া বেড়ার কাছে আনিয়া ফেলিল।
এতক্ষণে গোলমালে শাহজীর নেশার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। সে, কেয়া হুয়া, কেয়া হুয়া ? বলিয়া উঠিয়া বসিল।
ইন্দ্র আমাকে ছাড়িয়া দিয়া তাহার কাছে সরিয়া আসিয়া বলিল, ডাকু শালা। রাস্তায় তোমাকে দেখতে পেলে চাবকে তোমার পিঠের চামড়া তুলে দেব। কেয়া হুয়া ? বদমাস ব্যাটা কিচ্চু জানে নাÑআর বলে বেড়ায় মন্তরের জোরে মড়া বাঁচাই! কখনো পথে দেখা হ’লে এবার ভাল ক’রে বাঁচাব তোমাকে! বলিয়া সে এমনি একটা অশিষ্ট ইঙ্গিত করিল যে শাহজী চমকাইয়া উঠিল।
তাহার এক নেশার ঘোর, তাহাতে অকস্মাৎ এই অভাবনীয় কাÐ! সেই যে সাধুভাষায় বলে ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ হইয়া বসিয়া থাকা, ঠিক সেইভাবে ফ্যালফ্যাল করিয়া চাহিয়া বসিয়া রহিল।
ইন্দ্র আমাকে লইয়া যখন দ্বারের বাহিরে আসিয়া পড়িল, তখন সে বোধ করি কতকটা প্রকৃতিস্থ হইয়া পরিষ্কার বাঙ্গলা করিয়া ডাকিল, শোন ইন্দ্রনাথ কি হয়েচে বল ত ? আমি তাহাকে এই প্রথম বাঙ্গালা বলিতে শুনিলাম।
ইন্দ্র ফিরিয়া আসিয়া বলিল, তুমি কিছু জান নাÑকেন মিছামিছি আমাকে ধোঁকা দিয়ে এত দিন এত টাকা নিয়েচ, তার জবাব দাও।
সে কহিল, জানিনে তোমাকে কে বলল ?
ইন্দ্র তৎক্ষণাৎ ঐ স্তব্ধ নতমুখী দিদির দিকে একটা হাত বাড়াইয়া বলিল, ওই বললে, তোমার কানাকড়ির বিদ্যে নাই। বিদ্যে আছে শুধু জোচ্চুরি করবার আর লোক ঠকাবার। এই তোমাদের ব্যবসা। মিথ্যাবাদী চোর।
শাহজীর চোখ-দুটা ধক করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। সে যে কি ভীষণ প্রকৃতির লোক, সে পরিচয় তখনও জানিতাম না। শুধু তাহার সেই চোখের দৃষ্টিতে আমার গায়ে কাঁটা দিয়া উঠিল। লোকটা তাহার এলোমেলো জটাটা বাঁধিতে বাঁধিতে উঠিয়া দাঁড়াইয়া সমুখে আসিয়া কহিল, বলেচিস তুই ?
দিদি তেমনি নতমুখে নিরুত্তরে বসিয়া রাহিলেন। ইন্দ্র আমাকে একটা ঠেলা দিয়া বলিল, রাত্তির হচ্ছেÑচল না। রাত্রি হইতেছে সত্য, কিন্তু আমার পাযে আর নড়ে না। কিন্তু ইন্দ্র সেদিকে ভ্রæক্ষেপও করিল না, আমাকে প্রায় জোর করিয়াই টানিয়া লইয়া চলিল।
কয়েক পদ অগ্রসর হইতেই শাহজীর কণ্ঠস্বর আবার কানে আসিলÑকেন বললি ?
প্রশ্ন শুনিলাম বটে, কিন্তু প্রত্যুস্তর শুনিতে পাইলাম না। আমরা আরও কয়েক পদ অগ্রসর হইতেই অকস্মাৎ চারদিকের সেই নিবিড় অন্ধকারের বুক চিরিয়া এবং তীব্র আর্তস্বর পিছনের আঁধার কুটীর হইতে ছুটিয়া আসিয়া আমাদের কানে বিঁধিল এবং চক্ষের পলক না ফেলিতেই ইন্দ্র সেই শব্দ অনুসরণ করিয়া অদৃশ হইয়া গেল। কিন্তু আমার অদৃষ্টে অন্যরূপ ঘটিল। সুমুখেই একটা শিয়াকুল গাছের মস্ত ঝাড় ছিল; আমি সবেগে গিয়া তাহারই উপরে পড়িলাম। কাঁটার সর্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত হইয়া গেল। সে যাক, কিন্তু নিজেকে মুক্ত করিয়া লইতেই প্রায় দশ মিনিট কাটিয়া গেল। এ কাঁটা ছাড়াই ত সে কাঁটার কাপড় বাধে; সে কাঁটা ছাড়াই ত আর একটা কাঁটায় কাপড় আটকায়। এমনি করয়া অনেক কষ্টে, অনেক বিরম্বে যখন কোনমতে শাহজীর বাড়ির প্রাঙ্গণের ধারে গিয়া পড়িলাম, তখন দেখি, সেই প্রাঙ্গণেরই একপ্রান্তে দিদি মূর্ছিত হইয়া পড়িয়া আছেন এবং আর একপ্রান্তে গুরুশিষ্যের রীতিমতো মল্লযুদ্ধ ব্যাধিয়া গিয়াছে। পাশেই একটা তীক্ষèধার বর্শা পড়িয়া আছে।
শাহজী লোকটি অত্যন্ত বলবান। কিন্তু ইন্দ্র যে তাহার অপেক্ষাও কত বেশি শক্তিশালী, এ সংবাদ তাহার জানা ছিল না। থাকিলে বোধ হয় সে এত বড় দুঃসাহসের পরিচয় দিত না। দেখিতে দেখিতে ইন্দ্র তাহাকে চিত করিয়া ফেলিয়া তাহার বুকের উপর বসিয়া গলা টিপিয়া ধরিল। সে এমনি টিপুনি যে, আমি বাধা না দিলে হয়ত সে যাত্রা শাহজীর সাপুড়ে যাত্রাটাই শেষ হইয়া যাইত।
বিস্তর-টানা হেঁচড়ার পর যখন উভয়কে পৃথক করিলাম, তখন ইন্দ্রের অবস্থা দেখিয়া ভয়ে কাঁদিয়া ফেলিলাম। অন্ধকারে প্রথমে নজরে পড়ে নাই যে তাহার সমস্ত কাপড়-জামা রক্তে ভাসিয়া যাইতেছে। ইন্দ্র হাঁপাইতে হাঁপাইতে কহিল, শালা গাঁজাখোর আমাকে সাপ-মারা বর্শা দিয়া খোঁজা মেরেছেÑএই দ্যাখ। জামার আস্তিন তুলিয়া দেখাইল, বাহুতে প্রায় দুই-তিন ইঞ্চি পরিমাণ ক্ষত এবং তাহা দিয়া অজস্র রক্তস্রাব হইতেছে।
ইন্দ্র কহিল, কাঁদিস নেÑএই কাপড়টা দিয়ে খুব টেনে বেঁধে দেÑএই খবরদার! ঠিক অমনি ব’সে থাকো। উঠলেই গলায় পাদিয়ে তোমার জিভ টেনে বার করবÑহারামজাদা শুয়ার। নে, তুই টেনে বাঁধÑদেরি করিস নে। বলিয়া সে চড়মড় করিয়া তাহার কোঁচার খানিকটা টানিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিল। আমি কম্পিতহস্তে ক্ষতটা বাঁধিতে লাগিলাম এবং শাহজী অদূরে বসিয়া মুহূর্ষু বিষাক্ত সর্পের দৃষ্টি দিয়া নিঃশব্দে চাহিয়া দেখিতে লাগিল।
ইন্দ্র কহিল, না, তোমাকে বিশ্বাস নেই, তুমি খুন করতে পার। আমি তোমার হাত বাঁধব। বলিয়া তাহারই গেরুয়া রঙে ছোপানো পাগড়ি দিয়া টানিয়া টানিয়া তাহার দুই হাত জড় করিয়া বাঁধিয়া ফেলিল। সে বাধা দিল না, প্রতিবাদ করিল না, একটা কথা পর্যন্ত কহিল না।
যে লাঠিটার আঘাতে দিদি অচৈতন্য হইয়া পড়িয়াছিল সেটা তুলিয়া লইয়া একপাশে রাখিয়া ইন্দ্র কহিল, কি নেমকহারাম শয়তান এই ব্যাটা। বাবার কত টাকা যে চুরি ক’রে একে দিয়েছি, আরও কত হয়ত দিতাম, যদি দিদি না আমাকে মাথার দিব্যি দিয়ে নিষেধ করত। আর স্বচ্ছন্দে ও ঐ বল্লমটা আমাকে ছুড়ে মেরে বসল। শ্রীকান্ত নজর রাখ, যেন না ওঠেÑআমি দিদির চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিই।
জলের ঝাপটা দিয়া বাতাস করিতে করিতে কহিল, যেদিন থেকে দিদি বললে, ‘ইন্দ্রনাথ, তোমার রোজগারের টাকা হ’লে নিতাম, কিন্তু এ নিয়ে আমাদের ইহকাল পরকাল মাটি করব না’, সেই দিন থেকে ঐ শয়তান ব্যাটা দিকিকে কত মার মেরেচে, তার হিসেব-নিকেশ নেই। তবু দিদি ওকে কাঠ কুড়িয়ে ঘুঁটে বেচে খাওয়াচ্ছে, গাঁজার পয়সা দিচ্ছেÑতবুও কিছুতে ওর হয় না। কিন্তু আমি ওকে পুলিশে দিয়ে তবে ছাড়বÑনা হ’লে দিদিকে ও খুন ক’রে ফেলবে, ও খুন করতে পারে।
আমার মনে হইল, লোকটা যেন এই কথায় শিহরিয়া মুখ তুলিয়া চাহিয়াই তৎক্ষণাৎ মুখখানা নত করিয়া ফেলিল। সে একটি নিমেষমাত্র। কিন্তু অপরাধীর নিবিড় আশঙ্কা তাতে এমনি পরিস্ফুট হইতে দেখিয়াছিলাম যে, আমি আজিও তাহার তখনকার সেই চেহারাটা স্পষ্ট মনে করিতে পারি।
আমি বেশ জানি, এই যে কাহিনী আজ লিপিবদ্ধ করিলাম, তাহাকে সত্য বলিয়া গ্রহণ করিতে লোকে দ্বিধা ত করিবেই, পরন্তু উদ্ভট কল্পনা বলিয়া উপহাস করিতে হয়ত ইতস্তত করিবে না। তথাপি এতটা জানিয়াও যে লিখিলাম, ইহাই অভিজ্ঞতার সত্যকার মূল্য। কারণ সত্যের উপরে না দাঁড়াইতে পারিলে কোনমতেই এই সকল কথা মুখ দিয়া বাহর করা যায় না। প্রতি পদেই ভয় হইতে থাকে, লোকে হাসিয়া উড়াইয়া দিবে। জগতে বাস্তব ঘটনা যে কল্পনাকেও বহুদূরে অতিক্রম করিয়া যায়, এ কৈফিয়ত নিজের কোনো জোরই দেয় না, বরঞ্চ হাতের কলমটাকে প্রতি-হাতেই টানিয়া টানিয়া ধরিতে থাকে।
যাক সে কথা। দিদি যখন চোখ চাহিয়া উঠিয়া বসিলেন, তখন রাত্রি বোধকরি দ্বিপ্রহর! তাঁহার বিহŸল ভাবটা ঘুচাইতে আরও ঘণ্টাখানেক কাটিয়া গেল। তারপরে আমার মুখে সমস্ত বিবরণ শুনিয়া ধীরে ধীরে উঠিয়া গিয়া শাহজীর বন্ধন মুক্ত করিয়া দিয়া বলিলেন, যাও শোও গে।
লোকটা ঘরে চলিয়া গেরে তিনি ইন্দ্রকে কাছে ডাকিয়া, তাহার ডান হাতটা নিজের মাথার উপর টানিয়া লইয়া বলিলেন, ইন্দ্র, এই আমার মাথায় হাত দিয়া শপথ কর ভাই, আর কখনো এ বাড়িতে আসিস নে। আমাদের যা হবার হোক, তুই আর আমাদের কোন সংবাদ রাখিস নে।
ইন্দ্র প্রথমটা অবাক হইয়া রহিল। কিন্তু পরক্ষণেই আগুনের মত জ্বলিয়া উঠিয়া বলিল, তা বটে! এমন না’হলে কলিকাল-বলচে কেন ? কিন্তু কি নেমকহারাম তোমরা দু’জন!Ñআয় শ্রীকান্ত, আর না।
দিদি চুপ করিয়া রহিলেনÑএকটি অভিযোগেরও প্রতিবাদ করিলেন না। কেন যে করিলেন না তাহা পরে যত বেশি বুঝিয়া থাকি নাকেন তখন বুঝি নাই। তথাপি আম অলক্ষ্যে নিঃশব্দে সেই টাকা-পাঁচটি খুঁটির কাছে রাখিয়া দিয়া ইন্দ্রের অনুসরণ করলাম। ইন্দ্র প্রাঙ্গণের বাহরে আসিয়া চেঁচাইয়া বলিল, হিঁদুর মেয়ে হয়ে যে মোচলমানের সঙ্গে বেরিয়ে আসে, তার আবার ধর্মকর্ম! চুলোয় যাওÑআর আম খোঁজ করব না, খবরও নেব নাÑহারামজাদা নচ্ছার! বলিয়া দ্রæত পদে নবপথ অতিক্রম করিয়া চলিয়া গেল।
দু’জনে নৌকায় আসিয়া বসিলে ইন্দ্র নিঃশব্দে বাহিতে লাগল, এবং মাঝে মাঝে হাত তুলিয়া চোখ মুছিতে লাগিল। সে যে কাঁদিতেছে, তাহা স্পষ্ট বুঝিয়া আর কোনো প্রশ্ন করিলাম না।
শ্মশানের সেই পথ দিয়াই ফিরিয়া আসিলাম এবং সেই পথ দিয়াই এখনও চলিয়াছি, কিন্তু কেন জানি না, আজ আমার ভয়ে কথাও মনে আসিল না। বোধ করি, মন আমার এমন বিহŸল আচ্ছন্ন হইয়াছিল যে এত রাত্রে কেমন করিয়া বাড়ি ঢুকিব এবয় ঢুকিলেও যে কি দশা হইবে, সে চিন্তাও মনে স্থান পাইল না।
প্রায় শেষরাত্রে নৌকা আসিয়া খাটে লাগিল। আমাকে নামাইয়া দিয়া ইন্দ্র কহিল, বাড়ি যা শ্রীকান্ত! তুই বড় অপয়া! তোকে সঙ্গে নিলেই একটা-না-একটা ফ্যাসাদ বাদে। আজ থেকে তোকে আর আমি কো কাজে ডাকব নাÑতুইও আর আমার সামনে আসিস নে। যা! বলিয়া সে গভীর জলে নৌকা ঠেলিয়া দিয়া দেখিতে দেখিতে বাঁকের মুখে অদৃশ্য হইয়া গেল। আমি বিস্মিত ব্যথিত, স্তব্ধ হইয়া নির্জন নদীতীরে একাকী দাঁড়াইয়া রহিলাম।
ছয়
নিস্তবদ্ধ গভীর রাত্রে মা-গঙ্গার উপকূলে ইন্দ্র যখন আমাকে নিতান্ত অকারণে একাকী ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেল, তখন কান্না আর সামলাইতে পারিলাম না। তাহাকে সে ভালবাসিয়াছিলাম, সে তাহার কোন মূল্যই দিল না। পরের বাড়ির যে কঠিন শাসনপাশ উপেক্ষা করিয়া তাহার সঙ্গে গিয়াছিলাম, তাহার এতটুকু মর্যাদা রাখিল না। উপরন্তু অপয়া অকর্মণ্য বলিয়া একান্ত অসহায় অবস্থায় বিদায় দিয়া স্বচ্ছন্দে চলিয়া গেল। তাহার এই ডনিষ্ঠুরতা আমাকে যে কত বিঁধিয়াছিল, তাহা বলিবার চেষ্টাও করা ও বাহুল্যূ। তারপরে অনেকদিন সেও আর সন্ধান করিল না, আমিও না। দৈবাৎ পথেঘাটে যদি কখনও দেখা হইয়াছে, এমন করিয়া মুখ ফিরাইয়া আমি চলিয়া গিয়াছি, যেন তাহাকে দেখিতে পাই নাই। কিন্তু আমার এই ‘ যেন’টা আমাকেই শুধু সারাদিন তুষের আগুনে দগ্ধ করিত, তাহার কতটুকু ক্ষতি করিতে পারিত। ছেলেমহলে সে একজন মস্ত লোক। ফুটবল ক্রিকেটর দলে কর্তা, জিমন্যাসটিক আখড়ার মাস্টার। তাহার কত অনুচর, কত ভক্ত। আমি ত তাহার তুলনায় কিছুই নয়। তবে কেনই বা দুদিনের পরিচয়ে আমাকে সে বন্ধু বলিয়া ডাকিল, কেনই বা বিসর্জন দিল! কিন্তু সে যখন দিল, তখন আমিও টানাটানি করিয়া বাঁধিতে গেলাম না। আমার বেশ মনে পড়ে, আমাদের সঙ্গী-সাথীরা যখন ইন্দ্রের উল্লেখ করিয়া তাহার সম্বন্ধে নানাবিধ অদ্ভুত আশ্চর্য গল্প শুরু করিয়া দিত, আমি চুপ করিয়া শুনিতাম। একটা কথার দ্বারাও কখনো ইহা প্রকাশ করি নাই, সেআমাকে চিনে, ও ছোট’র বন্ধুত্ব সচারাচ এমইি দাঁড়ায়। বোধ করি ভাগ্যবশে পরবর্তী জীবনে অনেক বড় বন্ধুর সংস্পর্শে আসিব বলিয়াই ভগবান দয়া করিয়া এইসহজ জ্ঞানটা আমাকে দিয়াছিলেন যে, কখনও কোন কারণে যেন অবস্থানকে ছাড়াইয়া বন্ধুত্বের মূল্য ধার্য করিতে না যাই। গেলেই যে দেখিতে দেখিতে ‘বন্ধু’ প্রভু হইয়া দাঁড়ান এবং সাধের বন্ধুত্বপাশ দাসত্বের বেড়ি হইয়া ‘ ছোট’র পায়ে বাজে, এই দিব্যজ্ঞানটি এত সহজে এমন সত্য করিয়াই শিখিয়াছিলাম বলিয়া লাঞ্জনর হাত হইতে চিরদিনের মত নিষ্কৃতি পাইয়া বাঁচিয়াছি।
তিন-চারমাস কাটিয়াছে। উভয়েই উভয়কে ত্যাগ করিয়াছিÑতা বেদনা এক পক্ষের যত নিদারুণই হোকÑকেহ কাহারও খোঁজ করি না।
দত্তদের বাড়িতে কালিপূজা উপলক্ষে পাড়ার সখের থিয়েটারের স্টেজ বাধা হইতেছে। ‘ মেঘনাবধ’ হইবে। ইতিপূর্বে পাড়াগাঁয়ে যাত্রা অনেকবার দেখিয়াছি, কিন্তু থিয়েটার বেশি চোকে দেখে নাই। সারাদিন আমার নাওয়া-খাওয়াও নাই, বিশ্রামও নাই। স্টেজ-বাঁধায় সাহায্য করিতে পারিয়া একেবার কৃতার্থ হইয়া গিয়াছি। শুধু তাই নয়। যিনি রাম সাজিবেন, স্বয়ং তিনি সেদিন আমাকে একটা দড়ি ধরিতে বলিয়াছিলেন। সুতরাং ভারী আশা করিয়াছিলাম, রাত্রে ছেলেরা যখন কানাতের ছেঁড়া দিয়া গ্রীনরুমের মধ্যে উঁকি মারিতে গিয়া লাঠির খোঁচা খাইবে, আমি তখন শ্রীরামের কৃপায়বাঁচিয়া যাইব। হয়ত বা আমাকে দেখিলে আক-আধবার ভিতরে যাইতেও দিবেন। কিন্তু হায় রে দুর্ভাগ্য! সমস্ত দিন যে প্রাণপাত পরিশ্রম করিলাম, সন্ধ্যার পর আর তাহার কোন পুরস্কারই পাইলাম না। ঘণ্টার পর ঘন্টা গ্রীনরুমের দ্বারের সন্নিকটে দাঁড়াইয়া রহিলাম। রামচন্দ্র কতবার আসিলেন, গেলেন, আমাকে কিন্তু চিনিতে পারিলেন না। একবার জিজ্ঞাসা করিলেন না, আমি অমন করিয়া দাঁড়াইয়া কেন ? অকৃতজ্ঞ রাম! দড়ি ধরার প্রয়োজনও কি তাঁহার একেবারেই শেষ হইয়া গেছে!
রাত্রি দশটার পর থিয়েটারের পয়লা ‘ বেল’ হইয়া গেরে নিতান্ত ক্ষুণœমনে সমস্ত ব্যাপারটা উপরেই হতশ্রদ্ধ হইয়া সমুখে আসিয়া একটা জায়গা দখল করিয়া বসিলাম কিন্তু অল্পকালের মধ্যেই সমস্ত অভিমান ভুলিয়া গেলাম। সেকি প্লে! জীবনে অনেক প্লে দেখিয়াছি বটে, কিন্তু তেমনি আর দেখিলাম না। মেঘনাদ স্বয়ং এক বিপর্যয় কাÐ! তাঁহার ছয় হাত উঁচু দেহ। পেটের ঘেরটা চার-সাড়ে চার হাত। সবাই বলিত, মরিলে গরুর গাড়ি ছাড়া উপায় নই। অনেক দিনের কথা। আমার সমস্ত ঘটনা মনে নাই। কিন্তু এটা মনে আছে, তিনি সেদিন যে বিক্রম প্রকাশ করিয়াছিলেন, আমাদের দেশের হারাণ পলসাঁই ভীম সাজিয়া মস্ত একটা ডাল ঘাড়ে করিয়া দাঁত কিড়মিড় করিয়াও তেমনি করিতে পারিতেন না।
ড্রপসিন উঠিয়াছে। বোধকরি বা তিনি ল²ণই হইবেনÑঅল্প স্বল্প বীরত্ব প্রকাশ করিতেছেন। এমনি সময়ে সেই মেঘনাদ কোথা হইতে একেবারে লাফ দিয়া সমুখে আসিয়া পড়িল। সমস্ত স্টেজটা মড়মড় করিয়া কাঁপিয়া দুলিয়া উঠিলÑফুটলাইটের গোটা পাঁচ ছয় ল্যাম্প উলটাইয়া নিবিয়া গেল।, এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার নিজের পেট-বাধা জরির কোমরবন্ধটা পটচাস করিয়া ছিঁড়িয়া পড়িল। একটা হইচই পড়িয়া গেল! তাঁহাকে বসিয়অ পড়িবার জন্য কেহ বা সভয় চীৎকারের অনুনয় করিয়া উঠিল, কেহ বা সিন ফেলিয়া দিবার জন্য চেঁচাইতে লাগিলÑকিন্তু বাহাদুর মেঘনাদ! কাহারও কোন কথায় বিচলিত হইলেন না। বাঁ হাতের ধনুক ফেলিয়া দিয়া, পেন্টুলানের মুট চাপিয়া ধরিয়া ডান হাতের শুধু তীর দিয়াই যুদ্ধ করিতে লাগিলেন।
ধন্য বীর! ধন্য বীরত্ব! অনেক অনেক প্রকার যুদ্ধ দেখিয়াছে মানি, কিন্তু ধনুক নাই, বাঁ হাতের অবস্থাও যুদ্ধক্ষেত্রে অনুকূল নয়Ñশুধু ডান হাত এবং শুধু তীর দিয়া ক্রমাগত যুদ্ধ কে কবে দেখিয়াছে! অবশেষে তাহাতেই জিত। বিপক্ষকে সে যাত্রা পলাইয়া আত্মরক্ষা করিতে হইল।
আনন্দের সীমা নাইÑমগ্ন হইয়া দেখিতেছি এবং অপরূপ লড়াইয়ের জন্য মনে মনে তাঁহার শতকোটি প্রশংসা করিতেছি, এমন সময়ে পিঠের উপর একটা আঙ্গুলের চাপ পড়িল। মুখ ফিরাইয়া দেখি ইন্দ্র। চুপিচুপি কহিল, আয় শ্রীকান্ত, দিদি একবার তোকে ডাকচেন। তড়িৎস্পৃষ্টের মত সোজা খাড়া হইয়া বসিলাম। কোথায় তিনি ?
বেরিয়ে আয় নাÑবলচি। পথে আসিয়া সে শুধু কহিল, আমার সঙ্গে আয়। বলিয়া চলিতে লাগিল।
গঙ্গার ঘাটে পৌঁছিয়া দেখিলাম, তাহার নৌকা বাঁধা আছেÑনিঃশব্দে উভয়ে চড়িয়া বসিলাম, ইন্দ্র বাঁধন খুলিয়া দিল।
আবার সেই সমস্ত অন্ধকার বনের পথ বাহিয়া দুজনে শাহজীর কুটিরে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। তখন বোধ করি, রাত্রি আর বেশি নাই।
দিদি মৃদুকণ্ঠে ঘটনাটি সংক্ষেপে বিবৃত করিলেন। আজ দুপুরবেলা কাহার বাটীতে সাপ ধরিবার বায়না থাকে। সেখানে ঐ সাপটিকে ধরিয়া যাহা বকশিশ পায় তাহাতে কোথা হইতে তাড়ি খাইয়া মাতাল হইয়া সন্ধ্যার প্রাক্কালে বাড়ি ফিরিয়া দিদির পুনঃপুনঃ নিষেধ সত্তে¡ও সাপ খেলাইতে উদ্যত হয়। খেলাইয়াও ছিল। কিন্তু অবশেষে খেলা সাঙ্গ করিয়া তাহার লেজ ধরিয়া হাঁড়িতে পুরবার সময় মদের ঝোঁক মুখের কাছে মুখ আনিয়া চুমকুড়ি দিয়া আদর করিতে গেলে, সেও আদর করিয়া শাহজীর গলার উপর তীব্র চুম্বন দিয়াছে।
দিদি তাঁহার মলিন অঞ্চল-প্রান্তে চোখ মুছিয়া আমাকে লক্ষ করিয়া বলিলেন, শ্রীকান্ত, তখনই কিন্তু তাঁর চৈতন্য হ’ল যে, সময় আর বেশি নাই। বললেন, আয় দুজনে একসঙ্গেই যাই, ব’লে পা দিয়া সাপটায় মাথা চেপে ধ’রে দুই হাত দিয়ে তাকে টেনে টেনে ঐ অতবড় ক’রে ফেলে দিলেন। তার পরে দুজনেরই খেলা সাঙ্গ হ’ল বলিয়া তিনি হাত দিয়া অত্যন্ত সন্তর্পণে শাহজীর মুখাবরণ উন্মোন করিয়া গভীর স্নেহে তাহার সুনীল ওষ্ঠাধরে ওষ্ঠ স্পর্শ করিয়া বলিলেন, যাক, ভালোই হল ইন্দ্রনাথ! ভগবানকে আমি এতটুকু দোষ দিইনে।
আমরা উভয়েই নির্বাক হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। সে কণ্ঠস্বর যে কি মর্মান্তিক বেদনা, কি প্রার্থনা, কি সুনিবিড় অভিমান প্রকাশ পাইল, তাহা যে শুনিয়াছে, তাহার সাধ্য নাই যে জীবন বিস্মৃত হয়। কিন্তু কিসের জন্য এই অভিমান ? প্রার্থনাই বা কাহার জন্য ?
একটুখানি স্থির থাকিয়া বলিলেন, তোমরা ছেলেমানুষ, কিন্তু তোমরা দুটি ছাড়া ত আমার আর কেউ নেই ভাই, তাই এই ভিক্ষে করি, এঁর একটু তোমরা উপায় ক’রে দিয়ে যাও। আঙ্গুল দিয়া কুটীরের দক্ষিণ দিকের জঙ্গলটা নির্দেশ করিয়া বলিলেন, ওইখানে জায়গা আছে, ইন্দ্রনাথ, আমি অনেকদিন ভেবেচি, যদি আমার মরণ হয়, ওইখানেই যে শুয়ে থাকতে পাই! সকাল হ’লে সেই জায়গাটুকুতে এঁকে শুইয়ে রেখো ভাই, অনেক কষ্টই এ-জীবনে ভোগ ক’রে গেছেনÑতবু একটু শান্তি পারেন।
ইন্দ্র প্রশ্ন করিল, শাহজীকে কি করব দিতে হবে ?
দিদি বলিরৈন, মুসলমান যখন, তখন দতে হবে বৈ কি ভাই! ইন্দ্র পুনরায় প্রশ্ন করিল, দিদি তুমিও কি মুসলমান ?
দিদি বলিলেন, হাঁ, মুসলমান বৈ কি।
উত্তর শুনিয়া ইন্দ্র কেমন যেন সঙ্কুচিত কুণ্ঠিত হইয়া পড়িল। বেশ দেখিতে পাইলাম এ জবাব সে আশা করে নাই। দিদিকে সে বাস্তবিকই ভালবাসিয়াছিল। তাই বোধ করি, মনের মধ্যে একটাগোপন আশা পোষণ করিয়া রাখিয়াছিল, তাহার দিদি তাহারেদরই একজন। আমার কিন্তু বিশ্বাস হইল না। তাঁহার নিজের মুখের স্বীকারোক্তি সত্তে¡ও কোনমতেই ভাবিতে পারিলাম না যে, তিনি হিন্দুকন্যা নহেন।
বাকী রাতটুকু কাটিয়া গেলে, ইন্দ্র সেই নির্দিষ্ট স্থানে কবর খুঁড়িয়া আসিল এবং তিনজনে আমরা ধরাধরি করিয়া শাহজীর মৃতদেহটা সমাহিত করিলাম। গঙ্গার ঠিকউপরের কাঁকরের একটুখানি পাড় ভাঙ্গায়া ঠিকযেন কাহারও শেষ-শয্যা বিছাইবার জন্যই এই স্থানটুকু প্রস্তুত হইয়াছিল। কুড়ি-পঁচিশ হাত নীচেই জাহ্নবী মায়ের প্রবাহÑমাথার উপরে বন্যলতার আচ্ছাদন। প্রিয়বস্তুকে সযতেœ লুকাইয়া রাখিবার স্থান বটে! বড় ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনজনে পাশাপাশি উপবেশন করিলামÑআর একজন আমাদরে কোলের কাছে মৃত্তিকাতলে চিরনিদ্রায় অভিভূত হইয়া ঘুমাইয়া রহিল। তখনো সূর্যোদয় হয় নাইÑনীচের মন্দ্রস্রোতা ভাগীরথীর কুলুকুলু শব্দ কানে আসিয়া পৌঁছিতে লাগিলÑমাথার উপরে আশেপাশে বনের পাখিরা প্রভাতী গাহিতে লাগিল। কাল যে ছিল, আজ সে নাই। কাল প্রভাতে কে ভাবিয়াছিল, আজ এমনি করিয়া আমাদের নিশাবসান হইবে। কে জানিত, একজনের শেষ মুহূর্ত এত কাছেই ঘনাইয়া উঠিয়াছিল!
হঠাৎ দিদি সেই গোরের উপর লুটাইয়া পড়িয়া বিদীর্ণকণ্ঠে কাঁদিয়া উঠিলেন, মা গঙ্গা, আমাকেও পায়ে স্থান দাও মা আমার যে আর কোথাও জায়গা নেই। তাঁহর এই প্রার্থনা, এই নিবেদন যে বিরূপ মর্মান্তিক সত্য, তাহা তখনও তেমন বুঝিতে পার নাই, যেমন দুদিন পরে পারিয়াছিলাম। ইন্দ্র একবার আমার মুখের পানে চোখ তুলিল, তার পরে উঠিয়া গিয়া সেই আর্ত নারীর ভূ-লুণ্ঠিত মাথাটি নিজের কোলের উপর তুলিয়া লইয়া, তাঁহারই মত আর্তস্বরে বলিয়া উঠিল, দিদি, আমার কছে তুমি চলÑআমার মা এখনো বেঁচে আছেন, তিনি তোমাকে ফেলবেন নাÑকোলে টেনে নেবেন। তাঁর বড় মায়ার শরীর, একবার শুধু তাঁর কাছে গিয়ে তুমি দাঁড়াবে চল। তুমি হিন্দুর মেয়ে দিদি, কিছুতেই মুসলমানী নও।
দিদি কথা কহিলেন না। মূর্ছিতের মত কিছুক্ষণ তেমনিভাবে পড়িয়া থাকিয়া শেষে উঠিয়া বসিলেন। তার পরে উঠিয়া আসিয়া তিনজনে গঙ্গাস্নান করিলাম। দিদি হাতের নোয়া জরে ফেলিয়া দিলেন গলার চুড়ি ভাঙ্গিয়া ফেলিলেন। মাটি দিয়া সিঁথির সিন্দুর তুলিয়া ফেলিয়া সদ্য-বিধবার সাজে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার কুটীরে ফিরিয়া আসিলেন।
এতদিন পরে আজ তিনি প্রথম বলিলেন, যে শাহ্জী তাঁহার স্বামী ছিলেন। ইন্দ্র কিন্তু কথাটা ঠিকমত মনের মধ্যে গ্রহণ করিতে পারিল না। সন্দিগ্ধকণ্ঠে প্রশ্ন করিল, কিন্তু তুমি যে হিন্দুর মেয়ে দিদি।
দিদি বলিলেন, হাঁ বামুনের মেয়ে। তিনিও ব্রাহ্মণ ছিলেন।
ইন্দ্র ক্ষণকাল অবাক হইয়া থাকিয়া কহিল, জাত দিলেন কেন ?
দিদি বলিলেন, সে কথা ঠিক জানিনে ভাই, কিন্তু তিনি যখন দিরেন, তখন আমারও সেই সঙ্গে জাহ গেল। স্ত্রী সহধর্মিণী বৈ ত নয়। নইলে আমি নিজে হ’তে জাতও দিই নিÑকোন দিন কোন অনাচারও করি নি।
ইন্দ্র গাঢ় স্বরে কহিল, সে আমি দেখেচি দিদিÑসেই জন্যেই আমার যখন-তখন এই কথাই মনে হয়েচেÑআমাকে মাপ কোরো দিদি, তুমি কি ক’রে এর মধ্যে আছÑতোমার কেমন ক’রে এমন দুর্মতি হয়েছিল! কিন্তু এখন আমি আর কোনো কথা শুনব না, আমাদের বাড়িতে তোমাকে যেতেই হবে। এখনি চল।
দিদি অনেকক্ষণ পর্যন্ত নীরবে কি যেন চিন্তা করিয়া লইলেন, পরে মুখ তুলিয়া ধীরে ধীরে বলিলেন, এখন আমি কোথাও যেতে পারিনে ইন্দ্রনাথ।
কেন পার না দিদি ?
দিদি বলিলেন, আমি জানি, তিনি কিছু দেনা রেখে গেছেন। সেগুলি শোধ না দেওয়া পর্যন্ত ত কোথাও নড়তে পারিনে।
ইন্দ্র হঠাৎ ক্রুব্ধ হইয়া উঠিলÑসে আমিও জানি! তাড়ির দোকানে, গাঁজার দেকানে তার দেনা; কিন্তু তোমার তাতে কি? কার সাধ্যি তোমার কাছে টাকা চাইতে পারে ? তুমি চল আমার সঙ্গে, কে তোমাকে আটকায় দেখি একবার।
অত দুঃখেও দিদি একটুখানি হাসিলেন। বলিলেন, ওরে পাগলা, যে আমাকে আটক ক’রে রাখবে, সে যে আমার নিজেরই ধর্ম। স্বামীর ঋণ যে আমার নিজেরই ঋণ। সে পাওনাদরকে তুমি কি ক’রে বাধা দেবে ভাই! তা হয় না, আজ তোমরা বাড়ি যাওÑআমার অল্পস্বল্প যা কিছু আছে বিক্রি ক’রে ধার শোধ দেওয়ার চেষ্টা করি। কাল-পরশু একদিন এসো।
আমি এতক্ষণ প্রায় চুপ করিয়াই ছিলাম। এইবার একথা কহিলাম, বলিলাম, দিদি, আমার কাছে বাড়ি’তে আরও চার-পাঁচটা টাকা আছেÑনিয়ে আসব ? কতাটা শেষ না হইতেই তিনি উঠিয়া দাঁড়াইয়া আমাকে ছোট ছেলেটির মত একেবারে বুকের কাছে টানিয়া লইলা, আমার কাপালের উপর তাঁহার ওষ্ঠাধর স্পশ করিয়া মুখের পানে চাহিয়া বলিলেন, না দাদা, আর এনে কাজ নেই! তুমি সেই যে টাকা পাঁচটি রেখে গিয়েছিলে, তোমার সে দয়া আমি মরণ পর্যন্ত মনে রাখব ভাই। আর্শীবাদ ক’রে যাই, তোমার বুকের ভিতর বসে ভগবান চিরদিন যেন অমনি ক’রে দুঃখীর জন্যে চোখের জল ফেলেন। বলিতে বলিতেই তাঁহার দু’চোখ দিয়া ঝরঝর করিয়া জল ঝরিয়া পড়িতে লাগিল।
বেলা আটটাÑনয়টার সময় আমরা বাটী ফিরিতে উদ্যত হইলে, সেদিন তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা পর্যন্ত আসিলেন। যাবার সময় ইন্দ্রের একটা হাত ধরিয়া বলিলেন, ইন্দ্রনাথ শ্রীকান্তকে আশীর্বাদ করলুম বটে, কিন্তু তোমাকে আশীর্বাদ করি, সে সাহস আমার হয় না। তুমি মানুষের আশীর্বাদের বাইরে। তবে ভগবানের শ্রীচরণে তোমাকে মে মনে আজ সঁপে দিলুম। তিনি তোমাকে যেন আপনার ক’রে নেন।
ইন্দ্রকে তিনি চিনিতে পারিয়াছিলেন। তাঁহার বাধা দেওয়া সত্তে¡ও ইন্দ্র জোর করিয়া তাঁহার দুই পায়ের ধূলা মাথায় লইয়া তাঁহার প্রণাম করিল। কাঁদ-কাঁদ হইা বলিল, দিদি, এ জঙ্গলে তোমাকে আর দেখতে পাব না।
দিদি জবাব দিলেন না। সহসা মুখ ফিরাইয়া চোখ মুছিতে মুছিতে সেই বনপথ ধরিয়া তাঁহার শোকাচ্ছন্ন শূন্য কুটীরে ফিরিয়া গেলেন। যতক্ষণ দেখা গেল, তাঁহাকে দাঁড়াইয়া দেখিলাম। কিন্তু একটিবারও আর তিনি ফিরিয়া চাহিলেন নাÑতেমনি মাথা নত করিয়া একভাবে দৃষ্টির বাহিরে মিলাইয়া গেলেন। অথচ কেন যে তিনি ফিরিয়া চাহিলেন নাÑতাহা দুজনেই মনে মনে অনুভব করিলাম।
তিনদিন পরে স্কুলের ছুটির পর বাহির হইয়াই দেখি, ইন্দ্র গেটের বাহিরে দাঁড়াইয়া আছে। তাহার মুখ অত্যন্ত শুষ্ক, পায়ে জুতা নাইÑহাঁটু পর্যন্ত ধূলায় ভরা। এই অত্যন্ত দীন চেহারা দেখিয়া ভয় পাইয়া গেলাম। বড়লোকের ছেলে, বাহিরে সে একটু বিশেষ বাবু। এই অত্যন্ত দীন চেহারা দেখিয়া ভয় পাইয়া গেলাম। বড়লোকের ছেলে, বাহিরে সে একটু বিশেষ বাবু। এমন অবস্থা তাহার আমি ত দেখি নাইÑবোধ করি আর কেহও দেখে নাই। ইশারা করিয়া মাঠের দিকে আমাকে ডাকিয়া লইয়া গিয়া ইন্দ্র বলিল, দিদি নেইÑকোথায় চ’লে গেছেন। আমার মুখের প্রতিও আর সে চাহিয়া দেখিল না। কহিল, কাল থেকে কত জায়গায় খুঁজেচি, কিন্তু দেখা পেলাম না। তোকে একখানা চিঠি লিখে রেখে গেছেন, এই নে, বলিয়া একখানা ভাঁজ করা হলদে রঙের কাগজ আমার হাতে গুঁজিয়া দিয়াই সে আর একদিকে দ্রæতপদে চলিয়া গেল। বোধ করি, হৃদয় তাহার এতই পীড়িত এতই শোকাতুর হইয়াছিল যে, কাহারও সঙ্গে বা কাজারও সহিত আলোচনা তাহার সাধ্যাতীত হইয়া উঠিয়াছিল।
সেইখানে আমি ধপ করয়া বসিয়া পড়িয়া ভাঁজ খুলিয়া কাগজখানি চোখের সামনে মেলিয়া ধরিলাম। চিঠিতে যাহা লেখা ছিল, এতকল পরে তাহার সমস্ত কথা যদিচ মে নাই, তথাপি অনেক কথাই স্মরণ করিতে পারি। চিঠিতে লেখা ছিল, শ্রীকান্ত যাইবার সময় আমি তোমাদের আশীর্বাদ করিতেছি। শুধু আজ নয়, যতদিন বাঁচিব, ততদিন তোমাদের আশীর্বাদ করিব। কিন্তু আমার জন্য তোমরা দুঃখ করিয়ো না। ইন্দ্রনাথ আমাকে খুঁজিয়া বেড়াইবে, সে জানি। কিন্তু তুমি তাহাকে বুঝাইয়া-সুঝাইয়া নিরস্ত করিয়ো। আমার সমস্তকথা যে আজইতোমরা বুঝিতে পারিবে, তাহা নয়! কিন্তু বড় হইলে একদিন বুঝিবে সেই আশায় এই পত্র লিখিয়া গেলাম। কিন্তু নজের কথা নিজের মুখেই ত তোমাদের কাছে বলিয়া যইতে পারিতাম! অথচ কেন যে বলি নাইÑবলি বলি করিয়াও কেন চুপ করিয়া গিয়াছি; সেই কথাাই আজ না বলিতে পারিলে আর বলা হইতে না। আমার কথাÑশুধু আমরই কথা নয় ভাই, সে আমার স্বামীর কথা। আবার তাও ভাল কথা নয়। এ জন্মের পাপ যে আমার কত, তাহা ঠিক জানি না; কিন্তু পূর্বজন্মের সঞ্চিত পাপের যে আমার সীমা-পরিসীমা নাই, তাহাতে ত কোন সংশয় নাই। তাই যখনই বলিতে চাহিয়াছি, তখনই মনে হইয়াছে, স্ত্রী হইয়া নিজের মুখে স্বামীর নিন্দা-গøানি করিয়া সে পাপের বোঝা আর ভারাক্রান্ত করিব না। কিন্তু এখন তিনি পরলোকে গিয়াছেন। আর গিয়াছেন বলিয়াই যে বলিতে আর দোষ নাই, সে মনে করি না। অথচ কেন জানি না, আমার এই অন্তহীন দুঃখের কথাগুলো তোমাদের না জানইয়াও কোনমতেই বিদায় লইতে পারিতেছি না। শ্রীকান্ত, তোমার এই দুঃখিনীি দিদির নাম অন্নদা। স্বামীর নাম কেন গোপান করিয়া গেলাম, তাহার কারণÑএই লেখাটুকুর শেষ পর্যন্ত পড়িলেই বুঝিতে পারিবে। আমার বাবা বড়লোক। তাঁর ছেলে ছিল না। আমরা দুটি বোন। সেইজন্য বাবা দরিদ্রের গৃহ হইতে স্বামীকে আনাইয়া নিজের কাছে রাখিয়া লেখাপড়া শিখাইয়া মানুষ করিতে চাহিয়াছিলেন। তাঁহাকে লেখাপড়া শিকাইতে পারিয়াছিলেনÑকিন্তু মানুষ করিতে পারেন নাই। আমার বড় বোন বিধবা হইয়া বাড়িতেই ছিলেনÑইঁহাকে হত্যা করিয়া স্বামী নিরুদ্দেশ হন। এ দুষ্কর্ম কেন করিয়াছিলেন, তাহার হেতু তুমি ছেলেমানুষ আজ না বুঝিতে পারিলেও একদিন বুঝিবে। সে যাই হোক বল ত শ্রীকান্ত এ দুঃখ কত বড় ? এ লজ্জা কি মর্মান্তিক! তবুও তোমার দিদি সব সহিয়াছিল। কিন্তু স্বামী হইয়া যে অবমানের আগুন তিনি তাঁর স্ত্রীর বুকের মধ্যে জ্বালিয়া দিয়া গিয়াছিলেন, সে জ্বালা আজওতোমার দিদির থামে নাই। যাক সে কথা! তার পরে সাত বৎসর পরে আবার দেখা াই। যেমন বেশে তোমরা তাঁকে দেখিয়াছিলে, তেমনি বেশে আমাদের বাটীর সম্মুখে তিনি সাপ খেলাইতেছিলেন। তাঁকে আর কেহ চিনিতে পারে নাই কিন্তু আমি পারিয়াছিলাম। আমার চক্ষুকে তিনি ফাঁকি দিতে পারেন না।ি শুনি, এ দুঃসাহসের কাজ নাকি তিনি আমার জন্যই করিয়াছিলেন। কিন্তু সে মিছে কথা। তবুও একদিন গভীর রাত্রে, খিড়কির দ্বার খুলিয়া আমার স্বামীর জন্যই গৃহত্যাগ করিয়াছিলাম। কিন্তু সবাই শুনিল, সবাই জানিল, অন্নদা কুলত্যাগ করিয়া গিয়াছে। এ কলঙ্কের বোঝা আমাকে চিরদিনই বহিয়া বেড়াইতে হইবে। কোন উপায় নাই। কারণ স্বামী জীবিত থাকিতে আত্মপ্রকাশ করিতে পারি নাই। পিতাকে চিনিতাম, তিনি কোন মতেই তাঁর সন্তানঘাতীকে ক্ষমা করিতেন না। কিন্তু আজ যদিও আর সে ভয় নাইÑআজ গিয়া তাঁকে বলিতে পারি, কিন্তু এ গল্প এতদিন পরে কে বিশ্বাস করিবে ? সুতরাং পিতৃগৃহে আমার আর স্থান নাইÑ তা ছাড়া আমি আবার মুসলমানী।
এখানে স্বামীর ঋণ যাহা ছিল, পরিশোধ করিয়াছি। আমার কাছে লুকানো দুটি ােনার মাকড়ি ছিল, তাহাই বেচিয়াছি। তমি যে পাঁচটি টাকা একদিন রাখিয়া গিয়াছিলে, তাহা খরচ করি নাই। আমাদের বড় রাস্তার মোড়ের উপর যে মুদীর দোকান আছে, তাহার কর্তার কাছে রাখিয়া দিয়াছিÑচাহিলেই পাইবে। মনে দুঃখ করিয়ো না বাই। টাকা কয়টি ফিরাইয়া দিলাম বটে। কিন্তু তোমর এই কচি বুকটুকু আমি বকে পুরিয়া লইয়া গেলাম। আর এইট যেখানেই থাকুক, ভালোই থাকিবে; কেননা দুঃখ সহিয়া সহিয়া এখন কোনো দুঃখই আর তার গায়ে লাগে না। তাকে কিছুতেই আর ব্যথা দিতে পারে না। আমার ভাই দটি, তোমাদের আমি কি বলিয়া যে আশীর্বাদ করিব খুঁজিয়া পাই না। তবে শুধু এই বলিয়া যাইÑভগবান পতিব্রতার যদি মুখ রাখেন, তোমাদের বন্ধুত্বটি যেন চিরদিন তিনি অক্ষয় করেন।
তোমার দিদিÑঅন্নদা।
সাত
আজ একাকী গিয়া মুদীর কাছে দাঁড়াইলাম। পরিচয় পাইয়া মুদী একটি ছোট ন্যাকড়া বাহির করিয়া গেরো খুলিয়া দুটি সোনার মাকড়ি এবং পাঁচটি টাকা বাহির করিল। টাকা কয়টি আমার হাতে দিয়া কহিল, বহু মাকড়ী-দুইটি একুশ টাকায় বিক্রী করিয়া শাহজীর সমস্ত ঋণ পরিশোধ করিয়া চলিয়া গিয়াছেন। কিন্তু কোথায় গিয়াছেন, তাহা জানি না। এই বলিয়া সে কাহার কত ঋণ মুখে মুকে একটা হিসাব দিয়া কহিল, যাবার সময় বহুর হাতে-সাড়ে-পাঁচ আনা পয়সা ছিল। অর্থাৎ বাইশটি মাত্র পয়সা অবলম্বন করিয়া এই নিরূপায় নিরাশ্রয় রমণী সংসারের দুধুর্গম পথে একাকী যাত্রা করিয়াছেন। পাচে তাঁহার সেই স্নেহাস্পদ বারক দুটি তাঁহাকে আশ্রয় দিবার ব্যর্থ প্রযাসে উপায়হীন বেদনায় ব্যথিত হইয়া এই ভয়ে নিঃশব্দে অলক্ষ্যে বাহির হইয়া গিয়াছেনÑকোথায় কাহাকেও জানিতে পর্যন্ত দেন নাই। না দিন, কিন্তু আমার টাকাÑপাঁচটি নিলেন না। অথচ নিয়েছেন মনে করিয়া আমি আনন্দে গর্বে কতদিন কত াাশ কুসুম সৃষ্টি করিয়াছিলামÑআজ সব আমার শূন্যে মিলাইয়া গেল। অমিানে চোখ ফাটিয়া জল আসিল। তাহাই এই বুড়ার কাছে লুকাইবার জন্য দ্রæতপদে চলিয়া গেলাম। বার বার বলিতে লাগিলাম, ইন্দ্রের কাছে তিনি কতই লইয়াছেন, কিন্তু আমার কাছে কিছুই লইলেন নÑযাইবার সময় না বলিয়া ফিরাইয়া দিয়া গেলেন।
কিন্তু এখন আর আমার মনে সে অভিমান নাই। বড় হইয়া বুঝিয়াছি, আমি এমন কি সুকৃতি করিয়াছি যে, তাহাকে দান করিতে পাইব! সেই জ্বলন্ত শিখায় যাহা আমি দিব, তাহাই বুঝিয়া পড়িয়া ছাই হইয়া যাইবে বলিয়াই দিদি আমার দান প্রত্যাহার করিয়াছিলেন। কিন্তু ইন্দ্র! ইন্দ্র আর আমি কি এক ধাতুর প্রস্তুত যে, সে যেখানে দান করবে, আমি সেখানে হাত বাড়াইব! তা ছাড়া ইহাও ত বুঝিতে পারি, দিদি কাহার মুখ চাহিয়া সেই ইন্দ্রের কাছেও হাত পাতিয়াছিলেন। যাক সে কথা।
তারপরে অনেক জায়গা ঘুরিয়াছি। কিন্তু এই দুটো পোড়া চোখে আর কখনও তাঁহার দেখা পাই নাই। না পাই, কিন্তু অন্তরের মধ্যে সেই প্রসন্ন হাসি মুখখানি চিরদিন তেমনিই দেখিতে পাই। তাঁহার চরিত্রের কথা স্মরণ করিয়া যখনই মাথা নোয়াইয়া প্রণাম করি, তখন এই একটা কথা আমারকেবল মনে হয়, ভগবান! এ তোমার কি বিচার! আমাদের এই সতী সাবিত্রীর দেশে স্বামীর জন্য সহধির্মণীকে অপরিসীম দুঃখ দিয়া সতীর মাহাত্ম্য তুমি উজ্জ্বল হইতে উজ্জ্বলতর করিয়া সংসারকে দেখাইয়াছ, তাহা জানি। তাঁহাদের সমস্ত দুঃখ দৈন্যকে চিরস্মরণীয় কীর্তিতে রূপান্তরিত করিয়া জগতের সমস্ত নারীজাতিকে কর্তব্যের ধ্রæবপথে আকর্ষণ করিতেছÑ তোমার সে ইচ্ছাও বুঝিতে পারি, কিন্তু আমার এমন দিদিরি ভাগ্যে এতবড় বিড়ম্বনা নির্দেশ করিয়া দিলেকেন, কিসের জন্য এতবড় সতীর কপালে অসতীর গভীর কালো ছাপ মারিয়া চিরদিনের জন্য তাঁকে তুমি সংসারে র্নিাসিত করিয়া দিলে, কি না তুমি তার নিলে ? তাঁর জাতি নিলে, ধর্ম নিলে,Ñসমাজ, সংসার সম্ভ্রম সমস্তই নিলে। দুঃখ যদ দিয়াছ, আমি ত আজো তাহার সাক্ষী রহিয়াছি। এতেও দুঃখ করি না, জগদ্দীশ্বর! কিন্তু যার আসন গীতা, সাবিত্রী, সতীর সঙ্গেই, তাঁকে তাঁর বাপ, মা আত্মীয়-স্বজন, শত্রæ-মিত্র জানিয়া রাখিয়া কি বলিয়া ? কুলটা বলিয়া, বেশ্যা বলিয়া! ইহাতে তোমারই বা কি লাভ ? সংসারই বা পাইল কি ?
হায় রে, কোথায় তাঁহার এই-সব আত্মীয়-স্বজন শত্রæ মিত্রÑএ যদি একবার জানিতে পারিতাম! সে দেশ যেখানে যত দূরেই হউক, এ দেশের বাহিরে হইলেও হয়ত একদিন গয়া হাজর হইয়া বলিয়া আসিতামÑএই তোমাদের অন্নদা! এই তার অক্ষয় কহিনী! তোমাদের মেয়েটিকে কুলত্যাগিনী বলিয়া জানিয়া রাখিয়া, সকালবেলায় একবার তাঁর নামটাই লইওÑঅনেক দুষ্কৃতির হাত এড়াইতে পারিবে।
তবে আমি একটা সত্য বস্তু লাভ করিয়াছি। পূর্বেও একবার বলিয়াছি, নারীর কলঙ্ক আমি সহজে প্রত্যয় করিতে পারি না। আমার দিদিকে মনে পড়ে। যদি তাঁর ভাগ্যেও এতবড় দুর্নাম ঘটিতে পারে, তখন সংসারে পারে না কি ? এক আমি, আর সেই-সমস্ত কালের সমস্ত পাপ পুণে্েযর সাক্ষী তিনি ছাড়া, জগতে আর কেহ কি আছে যে, অন্নদাকে একটুখানি, স্নেহের সঙ্গে স্মরণ করিবে। তাই ভাবি, না জানিয়া নারী কলঙ্গে অবিশ্বাস করিয়া সংসারে বরঞ্চ ঠকাও ভাল, কিন্তু বিশ্বাস করিয়া পাপের ভাগী হওয়ার লাভ নাই।
তারপর অনেক দিন ইন্দ্রকে আর দেখি নাই। গঙ্গার তীরে বেড়াইতে গেলেই দেখি, তাহার ডিঙি কুলে বাঁধা। জরে ভিজিতেছে, রৌদ্রে াটিতেছে। শুধু আর একটি দিনমাত্র আমরা উভয়ে সেই নৌকায় চড়িয়াছিলাম। সেই শেষ। তারপর সেও আর চড়ে নাই, আমিও না। সেদিন অখÐ স্বার্থপরতার যে উৎকট দৃষ্টান্ত দেখিতে পাইয়াছিাম, তাহা সহজে ভুলিতে পারি নাই, সে কথাটাই বলিব।
সেদিন কনকনে শীতের সন্ধ্যা। আগের দিন খুব এক পশলা বৃষ্টিপাত হওয়ায়, শীতটা যেন ছুঁচের মত গায়ে বিঁধিতেছিল। আকাশে পূর্ণচন্দ্র। চারিদিকে জোৎস্নায় যেন ভাসিয়া যাইতেচে। হঠাৎ ইন্দ্র আসিয়া হাজির। কহিলÑথিয়েটার হবে যাবি! থিয়েটারের নামে একেবারেই লাফইয়া উঠিলাম। ইন্দ্র কহিল, তবে কাপড় পরে শীগগির আমাদের বাড়িয়েআয়। পাঁচ মিনিটের মধ্যে একখানা ব্যাপার টানিয়া লইয়া ছুটিয়া বাহির হইলাম। সেখানে যাইতে হইলে ট্রেনে যাইতে হয়। ভাবিলাম, আদের বাড়ির গাড়ি করিয়া স্টেশনে যাইতে হইবেÑতাই তাড়াতাড়ি।
ইন্দ্র কহিল তা নয়। আমরা ডিঙিযে যাব। আমি নিরুৎসাহ হইয়া পড়িলাম। কারণ গঙ্গায় উজান ঠেলিয়া যাইতে হইলে বহু বিলম্ব হওয়াই সম্ভব। হয়ত বা সময়ে উপস্থিত হইতে পারা যাইবে না। ইন্দ্র কহিল, ভয় নেই, জোর হইলে বহু বিলম্ব হওয়াই সম্ভব। হয়ত বা সময়ে উপস্থিত হইতে পারা যাইবে না। ইন্দ্র কহিল, ভয় নেই, জোর হাওয়া আছে, দেরি হবে না। আমার নতুনদা কলকাতা থেকে এসেছেন, তিনি গঙ্গা দিয়ে যেতে চান।
যাক দাঁড় বাঁধিয়া পাল খাটাইয়াঠিক হইয়া বসিয়াছিÑঅকে বিলম্বে ইন্দ্রর নতুনদা আসিয়া ঘাটে পৌঁছিলেন। চকচকে পাম্প সু, আগাগোড়া ওভারকোটে মোড়া, গলায় গলাবন্ধ হাতে দস্তানা, মাথায় টুপিÑপশ্চিমের শীতের বিরুদ্ধে তাঁহার সতর্কতার অন্ত নাই। আমাদের সাধের ডিঙিটাকে তিনি অত্যন্ত ‘যাচ্ছেতাই; বলিয়া কঠোর মত প্রকাশ করিয়া ইন্দ্রের কাঁধে ভর দিয়া আমার হাত ধরিয়া, অনেক কষ্টে, অনেক সাবধানে নৌকার মাঝখানে জাঁকিয়া বসিলেন।
তোর নাম কিরে ?
ভয়ে ভয়ে বলিলাম, শ্রীকান্ত।
তিনি দাঁত খিঁচাইয়াই বলিলেন, আবার শ্রীÑকান্তÑ! শুধু কান্ত! নে, তামাক সাজ। ইন্দ্র হুঁকো কলকে রাখলি কোথায় ? ছোড়টাকে দেÑতামাক সাজুক!
ওরে বাবা! মানুষ চাকরকেও ত এমন বিকট ভ্িগ করিয়া আদেশ না! ইন্দ্র অপ্রভিত হইয়া কহিল, শ্রীকান্ত, তুই এসে একটু হাল ধর, আমি তামাক সাজচি।
আমি তাহার জবাব না দিয়া তামাক সাজিয়া লাগিয়া গেলাম। কারণ, তিনি ইন্দ্রর মাসতুত ভাই, কলিকাতার অধিবাসী এবং সম্প্রতি এল.এ পাস করিয়াছেন। কিন্তু মনটা আমার বিগড়াইয়া গেল। তামাক সাজিয়া হুঁকা হাতে দিতে, তিনি প্রসন্নমুখে টানিতেটানিতে প্রশ্ন করিলেন, তুই থাকিস কোথায় রে কান্ত ? তোর গায়ে ওটা কালোপানা কি রে ? র্যাপার ? আহা, র্যাপারের কি শ্রী। তেলের গন্ধে ভূত পালায়। ফুটচেÑপেতে দে দেখি, বসি।
আমি দিচ্চি নতুনদ। আমার শীত করচে নাÑএই নাও, বলিয়াইন্দ্র নিজের গায়ের আলোয়ানটা তাড়াতাড়ি ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিল। তিনি সেটা জড়ো করিয়া লইয়া বেশ করিয়া বসিয়া সুখে তামাক টানিতে লাগিলেন।
শীতের গঙ্গা। অধিক প্রশস্ত নয়। আধঘণ্টার মধ্যেই ডিঙি ওপারে গিয়া ভিড়িল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই বাতাস পড়িয়া গেল। ইন্দ্র ব্যাকুল হইয়া কহিল, এ যে ভারি মুশকিল হ’ল, হওয়া প’ড়ে গেল। আর ত পাল চলবে না।
নতুনদা জবাব দিলেন, এই ছোঁড়াটাকে দে না, দাঁড় টানুক। কলিকাতাবাসী নতুনদার অভিজ্ঞতায় ইন্দ্র ঈষৎ ¤øান হাসিয়া কহিল, দাঁড়! কারুর সাধ্যি নেই নতুনদা, এই রেত ঠেলে এজান বয়েযায়। আমাদের ফিরতে হবে।
প্রস্তাব শুনিয়া নতুনদা এক মুহূর্তে একেবারে অগ্নিশর্মা হইয়া উঠিলেন। তবে আনলি কেন হতভাগা! যেমন ক’রে হোক তোকে পৌঁছে দিতেই হবে। আমার থিয়েটারে হারমোনিয়াম বাজাতেই হবেÑতারা বিশেষ ক’রে ধরেচে। ইন্দ্র কহিল, তাদের বাজাবার লোক আছে নতুনদা। তুমি না গেলেও আটকাবে না।
না! আটকাবে না? এই মেড়োর দেশের ছেলেরা বাজাবে হারমোনিয়াম। চল্, যেমন ক’রে ারিস নিয়ে চল বলিয়া তিনি যেরূপ মুখভঙ্গি করিলেন, তাহাতে আমার গা জ্বলিয়া গেল। ইহার বাজনা পরে শুনিয়াছিলাম; কিন্তু সে কথায় আর প্রয়োজন নাই।
ইন্দ্রর অবস্থা-সঙ্কট অনুভব করিয়া আমি আস্তে আস্তে কহিলাম, ইন্দ্র, গুণ টেনে নিযে গেলে হয় না? কথাটা শেষ হইতে না হইতেই আমি চমকাইয়া উঠিলাম। তিনি এমনি দাঁত মুখ ভ্যাংচাইয়া উঠিলে যে,সে মুখখানি আমিও আজও মনে করিতে পারি। বলিলেন, তবে যাও না, টানো গে না হে। জানোয়ারের মতো ব’সে থাকা হচ্ছে কেন ?
তারপরে একবার ইন্দ্র, একবার আমি গুণ টানিয়া অগ্রসর হইতে লাগিলাম। কখনো বা উঁচু পাড়ের উপর দিয়া কখনো বা নীচে নামিয়া এবং সময়ে সময়ে সেই বলফের মতো ঠান্ডা জলের ধার ঘেঁষিয়া অত্যন্ত কষ্ট করিয়া চলিতে হইল। আবার তারই মাঝে বাবুর তামাক সাজার জন্য নৌকা থামাইতে হইল। অথচ বাবুটি ঠায় বসিয়া রহিলেনÑএতটুকু সাহায্য করিলেন ন। ইন্দ্র একবার তাঁহাকে হালা ধরিতে বলায় জবাব দিলেন, তিনি দস্তানা খুলে এই ঠান্ডায় নিমোনিয়া করিতে পারিবেন না। ইন্দ্র বলিতে গেল, না খুলেÑ
হ্যাঁ দামী দস্তানাটা মাটি করে ফেলি আর কি! নেÑযা করছিস কর।
বস্তুতঃ আমি এমন স্বার্থপর, অসজ্জন ব্যক্তি জীবনে অল্পই দেখিয়াছি। তাঁরই একটা অপদার্থ খেয়াল চরিতার্থ করিবার জন্য আমাদের এতক্লেশ সমস্ত চোখে দেখিয়াও তিনি এতটুকু বিচলিত হইলেন না। অথচ আমরা বয়সে তাঁহার অপেক্ষ কতই বা ছোট ছিলাম! পাছে এতটুকু ঠান্ডা রাগিয়া তাঁহার অসুখ করে, পাছে একফোঁটা জল লাগিয়া দামী ওভারকোট খারাপ হইয়া যায়, পাছে নড়িলে চড়িলে কোনরূপ ব্যাঘাত হয়, এই ভয়েই আড়ষ্ট হইয়া বসিয়া রহিলেন, এবং অবিশ্রাম চেঁচামেচি করিয়া হুকুম করিতে লাগিলেন।
আরও বিপদ গঙ্গার রুচিকর হাওয়ায় বাবুর ক্ষুধার উদ্রেক হইল এবং দেখিতে দেখিতে সে ক্ষুধা অবিশ্রান্ত বকুনির চোখে একেবারে ভীষণ হইয়া উঠিল। এদিক চলিতে রাত্রিও প্রায় দশটা হইয়া গেছেÑথিয়েটারে পৌঁছিতে রাত্রি দুটা বাজিয়া যাইবে শুনিয়া, বাবু প্রায় ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিলেন। রাত্রি যখন এগারোটা, তখন কলিকাতার বাবু কাবু হইয়া বলিলেন, হ্যাঁ রে, ইন্দ্র, এদিকে খোট্টামোট্টার বস্তি-টস্তি নে। মুড়ি-টুড়ি পাওয়া যায় না ?
ইন্দ্র কহিল, সামনেই একটা বেশ বড় বস্তি নতুনদা। সব জিনিস পাওয়া যায়।
তবে লাগা লাগাÑওরে ছোঁড়াÑঐÑটান না একুট জোরেÑভাত খাসনে ? ইন্দ্র বল না তোর ওই ওটাকে একটু জোর করে টেনে নিয়ে চলুক।
ইন্দ্র কিংবা আমি কেহই জবাব দিলাম না। যেমন চলিতেছিলাম, তেমনি ভাবেই অনতিকাল পরে একটা গ্রামে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। এখাে পাড়টা ঢালু ও বিস্তৃত হইয়া জলে মিশিয়াছিল। ডিঙি জোর করিয়া ধাক্কা দিয়া সঙ্কীর্ণ জরে তুলিয়া দিয়া আমরা দুজনে হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিলাম।
বাবু কহিরেন হাত-পা একটু খেলানো চাই। নাবা দরকার। অতএব ইন্দ্র তাহাকে কাঁধে করয়া নামাইয়া আনিল। তিনি জ্যোৎস্নার আলোকে গঙ্গার শুভ্র সৈকতে পদচারণা করিতে লাগিলেন। আমরা দুজনে তাঁহার ক্ষধাশান্তির উদ্দেশ্যে গ্রামের ভিতরে যাত্রা করিলাম। যদিচ বুঝিয়াছিলাম, একতরাত্রে এই দরিদ্র ক্ষুদ্র পল্লীতে আহার্য সংগ্রহ করা সহজ ব্যাপার নয়, তথাপি চেষ্টা না করিয়াও ত নিস্তার ছিল না। অথচ তাঁর একাকী থাকিতেও ইচ্ছা নাই। সে ইচ্ছা প্রকাশ করিতেই, ইন্দ্র তৎক্ষণাৎ আহŸান করিয়া কহিল, চল না নতুনদা, একলা তোমার ভয় করবেÑআমাদের সঙ্গে একটু বেড়িয়ে আসবে। এখানে চোর-টোর নেই, ডিঙি কেউ নেবে নাÑচল।
নতুনদা মুখখানা বিকৃত করিয়া বলিলেন, ভয়! আমরা দর্জিপাড়ার ছেলে, যমকে ভয় করিনে তা জানিস! কিন্তু তা ব’লে ছোটলোকদের ফরৎঃু পাড়ার মধ্যেও আমরা যাইনে। ব্যাটাদের গায়ের গন্ধ নামে গেলেও আমাদের ব্যামো হয়। অথচ তাহার মনোগত অভিপ্রায়Ñআমি তাঁহার পাহারায় নিযুক্ত থাকি এবং তামাক সাজি।
কিন্তু আমি তাঁর ব্যবহারে মে মনে এতবিরক্ত হইয়াছিলাম যে, ইন্দ্র আভাস দিলেও, আমি কিছুতেই একাকী এই লোকটার সংসর্গে থাকিতে রাজী হইলাম না। ইন্দ্রর সঙ্গে প্রস্থান করিলাম।
দর্জিপাড়ার বাবু হাততালি দিয়া গান ধরিয়া দিলেন ঠুন-ঠুন পেয়ালাÑ
আমরা অনেকদূর পর্যন্ত তাঁহা সেই মেয়েলি নাকীসুরে সঙ্গীতচর্চা শুনিতে শুনিতে গেলাম। ইন্দ্র েিজও তাহার ভ্রাতার ব্যবহারে মনে মনে অতিশয় লজ্জিত ও ক্ষুব্ধ হইয়াছিল। ধীরে ধীরে কহিল, এরা কলকতার লোক কি না, জল-হাওয়া আাদের মত সহ্য করতে পারে না। Ñবুঝলি না শ্রীকান্ত!
আমি বলিলাম, হুঁ।
ইন্দ্র তখন তাঁহার অসাধারণ বিদ্যাবুদ্ধির পরিচয়Ñবোধ করি আমার শ্রদ্ধা আকর্ষ করিবার জন্যইÑদিতে দিতে চলিল। তিনি অচিরেই বি.এ পাস রিয়া ডেপুটি হইবেন, কথা প্রসঙ্গে তাহাও কহিল। যাই হোক, এতদি পরে, এখন তিনি কোথাকার ডেপুটি কিংবা আদৌ সে কাজ পাইয়াছেন কি না, সে সংবাদ জানি না। কিন্তু মনে হয় যেন পাইয়াছেন, না হইলে বাঙ্গালী ডেপুটির মাঝে মাঝে এত সুখ্যাতি শুনিতে পাই কি করিয়া ? তখন তাহার প্রথম যৌবন। শুনি, জীবনের এই সময়ার নাকি হৃদয়ের প্রশস্ততা, সমবেদনার ব্যাপকতা যেমন বৃদ্ধি পায়, এমন, আর কোন কালে নয়। অথচ ঘণ্টাকয়েকের সংসর্গেই যে নমুনা তিনি দেখাইয়াছিলেন, এতকালের ব্যবধানেও তাহা ভুলিতে পারা গেল না। তবে ভাগ্যে এমন-সব নমুনা কদাচিৎ চোখে পড়ে; না হইলে বহু পূর্বেই সংসারটা রীতিমত একটা পুলিশ থানায় রিণত হইয়া যাইত। কিন্তু যাক সে কথা।
কিন্তু ভগবানও যে তাঁহার উপর ক্রুব্ধ হইয়াছিলেন, সে খবরটা পাঠককে দেওয়া আবশ্যক। এ অঞ্চলে পথ ঘাট, দোকানপত্র সমস্তইিন্দ্রর জানা ছিল। সে গিয়া মুদীর দোকানে উপস্থিত হইল। কিন্তু দোকান বন্ধ এবং দোকানী শীতের ভয়ে দরজা জানালা ুদ্ধ করিয়া গভীর নিদ্রায় মগ্ন। এই গভীরতা যে কিরূপ অতলস্পর্শী সে কথা যাহার জানা নাই, তাহাকে লিকিয়া বুঝানো যায় না। ইহারা অ¤øরোগী নির্ষ্কমা জমিদারও নয়, বহু ভারাক্রান্ত কন্যাদায়গ্রস্ত বাঙ্গালী গৃহস্থও নয়। সুতরাং ঘুমাইতে জানে। দিনের বেলা খাটিয়া-খুটিয়া রাত্রিতে একবার ‘চারপাই’ আশ্রয় করিলে, ঘরে আগুন না দিয়া শুধুমাত্র চেঁচামেচি ও দোর নাড়ানাড়ি করিয়া জাগইয়া দিব, এমন প্রতিজ্ঞা যদি স্বয়ং সত্যবাদী অর্জুন জয়দ্রথ-বধের পরিবর্তে করিয়া বসিতেন, তবে তাঁহাকে মিথ্যা-প্রতিজ্ঞা পাপে দগ্ধহইয়া মরিতে হইত তাহা শপথ করিয়া বলিতে পারা যায়।
তখন উভয়ে বাহিরে দাঁড়াইয়া তারস্বরে চীৎকার করিয়া, এবং যত প্রকর ফন্দি মানুষের মাথায় আসিতে পারে, তাহার সবগুলি একে একে চেষ্টা করিয়া, আধঘণ্টা পরে রিক্ত হস্তে ফিরিয়া আসিলাম। কিন্তু ঘাট যে জনশূন্য! জ্যোৎস্নালোকে যতদূর দৃষ্টি চলে, ততদূর যে শূন্য! ‘দর্জিপাড়া’র চিহ্নমাত্র কোথাও নাই। ডিঙি যেমন ছিল, তেমন রহিয়াছেÑইনি গেলেন কোথায় ? দু’জনে প্রাণপণে চীৎকার করিলামÑনতুনদা, ও নতুনদা! কিন্তু কোথায় কে! ব্যাকুল আহŸান শুধু বাম ও দক্ষিণের সু-উচ্চ পাড়ে ধাক্কা খাইয়া অস্পষ্ট হইয়া বারংবার ফিরিয়া আসিল। এ অঞ্চলে মাঝে মাঝে শীতকালে বাঘের জনশ্রæতিও শোনা যাইত। গৃহস্থ কৃষকেরা দলবদ্ধ ‘হুড়োরে’র জ্বালায় সময়ে সময়ে ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিত। সহসা ইন্দ্র সেই কথাই বলিয়া বসিল, বাঘে নিলে না ত রে! ভয়ে সর্বাঙ্গ কাঁটা দিয়া উঠিলÑসে কি কথা! ইতিপূর্বে তাঁহার নিরতিশয় অভদ্র ব্যবহারে আমি অত্যন্ত কুপিত হওয়া উঠিয়াছিলাম সত্য, কিন্তু এত বড় অভিশাপ ত দিই নাই!
সহসা উভয়েরই চোকে পড়িল, কিছু দূরে বালুর উপর কি একটা বস্তু চাঁদের আলোয় চকচক করিতেছে। কাছে গিয়া দেখি, তাঁরই সেই বহুমূল্য পাম্প সু’র একপাটি। ইন্দ্র সেই ভিজা বালির উপরেই একেবারে শুইয়া পড়িলÑশ্রীকান্ত রে! আমার মাসিমাও এসেছেন যে! আমি আর বাড় ফিরে যাব না। তখন ধীরে ধীরে সমস্ত বিষয়টাই পরিস্ফুট হইয়া উঠিতেই লাগিল। আমরা যখন মুদীর দোকানে দাঁড়াইয়া তাহাকে জাগ্রত করিবার ব্যর্থ প্রয়াস পাইতেছিলাম, তখন এই দিকের কুকুরগুলোও যে সমবেত আর্তচীৎকারে আমাদিগকে এই দুর্ঘটনার সংবাদটাই গোচর করিবার ব্যর্থপ্রয়াস পাইতেছিল, তাহা জলের মত চোখে পড়িল। তখনও দূরে তাহাদরে ডাক শুনা যাইতেছিল। সুতরা আর সংশয়মাত্র রহিল না যে নেকড়েগুলো তাঁহাকে টানিয়া লইয়া গিয়া সেখানে ভোজন করিতেছে, তাহারই আশেপাশে দাঁড়াইয়া সেগুলো এখনও চেঁচাইয়া মরিতেছে।
অকস্মাৎ ইন্দ্র সোজা উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল, আমি যাব। আমি সময়ে তাহার হাত চাপিয়া ধরিলামÑতুমি পাগল হয়েচ ভাই! ইন্দ্র তাহার জবাব দিল না। ডিঙিতে ফিরিয়া গিয়া লগিটা তুলিয়া লইয়া কাঁধে ফেলিল। একটা বড় ছুরি পকেট হইতে বাহির করিযা বাঁ হাতে লইয়া কহিল, তুই থাক শ্রীকান্ত; আমি না এলে ফিরে গিয়ে বাড়িতে খবর দিসÑআমি চললুম।
তাহার মুখ অত্যন্ত পাণ্ডুর, কিন্তু চোখদুটো জ্বলিতে লাগিল। তাহাকে আমি চিনিয়াছিলাম। এ তাহার নিরর্থক শূন্য আস্ফলন নয় যে,হাত ধরিয়া দুটো ভয়ের কথা বলিলেই মিথ্যা দম্ভ মিথ্যায় মিলাইয়া যাইবে। আমি নিশ্চয় জানিতাম, কোনমতেই তাহাকে নিরস্ত করা যাইবে না, সে যাইবেই। ভয়ের সহিত যে চির-অপরিচিত, তাহাকে আমিই বা কেমন করিয়া, কি বলিয়া বাধা দিব। যখন সে নিতান্তই চলিয়া যায়, তখন আর থাকিতে পারিলাম নাÑআমিও যা’হোকÑএকা হাতে করিয়া অনুসরণ করিতে উদ্যত হইলাম। এইবার ্ন্দ্র মখ ফিরাইয়া আমার একটা হাত ধরিয়া ফেলিল। বলিল, তুই ক্ষেপেচিস শ্রীকান্ত ? তোর দোষ কি ? তুই কেন যাবি ?
তাহার কণ্ঠস্বর শুনিয়া এক মুহূর্তেই আমার চোখে জল আসিয়া পড়িল। কোন মতে গোপন করিয়া বলিলাম, তোমারই বা দোষ কি ইন্দ্র ? তুমিই বা কেন যাবে ?
প্রতুত্তরে ইন্দ্র আমার হাতে বাঁশটা টানিয়া নৌকায় ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিয়া কহিল, আমারও দোষ নাই ভাই, আমিও নতুনদাকে আনতে চাইনি। কিন্তু একলা ফিরে যেতেও পারব না, আমাকে যেতেই হবে।
কিন্তু আমারও ত যাওয়া চাই। কারণ পূর্বেই একবার বলিয়াছি, আমি নিজেও নিতান্ত ভীরু ছিলাম না। অতএব বাঁশটা পুনরায় সংগ্রহ করিয়া লইয়া দাঁড়াইলাম, এবং আর বাদবিতণআ না করিয়া উভয়েই ধীরে ধীরে অগ্রসর হইলাম। ইন্দ্র কহিল, বালির ওপর দৌড়ানো যায় নাÑখবরদার, সে চেষ্টা চেষ্টা করিস নেÑজলে গিয়ে পড়বি।
সমুখে একটা বালির ঢিপি ছিল। সেইটা অতিক্রম করিয়াই দেখা গেল, অনেক দূরে জলের ধার ঘেঁষিয়া দাঁড়াইয়া পাঁচ-সাতটা কুকুর চীৎকার করিতেছে। যতদূর দেখা গেল, একপাল কুকুর ছাড়া বাঘ ত দূরের কথা, একটা শৃগালও নাই! সন্তপর্ণে আরও কতকটা অগ্রসর হইতেই মনে হইল, তাহারা কি একটা কালোপানা বস্তু জলে ফেলিয়া পাহারা দিআ আছে। ইন্দ্র চীৎকার করিয়া ডাকিল, নতুনদা!
নতুনদা একগলা জলে দাঁড়াইয়া অব্যক্তস্বরে কাঁদিয়া উঠিলেনÑএই যে আমি!
দুজনে প্রাণপণে ছুটিয়া গেলাম; কুকুরগুলা সরিয়া দাঁড়াইল, এবং ইন্দ্র ঝাঁপাইয়া পড়িয়া আকণ্ঠনিমজ্জিত মূর্ছিতপ্রায় তাহার দর্জিপাড়ার মাসতুত ভাইকে টানিয়া তীরে তুলিল। তখনও তাঁহার একটা পায়ে বহুমূল্য পাম্প সু গয়ে ওভারকেটা, হতে দস্তানা, গলায় গলাবন্ধ এবং মাথায় টুপিÑভিজিয়া ফুলিয়া ঢোল হইয়া উঠিয়াছে। আমরা গেলে সেই যে তিনি হাততালি দিয়া ‘ঠুনঠুন পেয়ালা’ ধরিয়াছিলেন, খুব সম্ভব, সেই সঙ্গীতচর্চাতেই আকৃষ্ট হইয়া গ্রামের কুকুরগুলো দল বাঁধিয়া উপস্থিত হইয়াছিল এবং এই অশ্রæপূর্ব গীত এবং অদৃষ্টপূর্ব পোশাকের ছটায় বিভ্রান্ত হইয়া এই মহামান্য ব্যক্তিটিকে তাড়া করিযাছিল। এতটা আসিয়াও আত্মরক্ষার কোন উপায় খুঁজিয়া না পাইয়া, অবশেষে তিনি জলে ঝাঁপ দিয়া পড়িয়াছিলেন; এবং এই দুর্দান্ত শীতের রাতে তুষারশীতল জলে আকণ্ঠময় থাকিয়া এই অর্ধঘণ্টাকাল ব্যাপিয়া পূর্বকৃত পাপের প্রায়শ্চিত্তে করিতেছিলেন। কিন্তু প্রায়শ্চিত্তের ঘোর কাটাইয়া তাঁহাকে চাঙ্গা করিয়া তলিতেও সে রাত্রে আমাগিকে কম মেহনত করিতে হয় নাই। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য এই যে বাবু, ডাঙ্গায় উঠিয়াই প্রথম কথা কহিলেন, আমার একপাটি পাম্প ?
সেটা ওখানে পড়িয়া আছেÑসংবাদ দিতেই, তিনি সমস্ত দুঃখ ক্লেশ বিস্মৃত হইয়া, তাহা অবিলম্বে হস্তগত করিবার জন্য সোজা খাড়া হইয়া উঠিলেন। তার পরে কোটের জন্য, মোজার জন্য, দস্তনার জন্য একে একে পুনঃপুন শোক প্রকাশ করিতে লাগিলেন; এবং সে রাত্রে যতক্ষণ পর্যন্ত না ফিরিয়া গিয়া নিজেদের ঘাটে পৌঁছিতে পারিলাম, ততক্ষণ পর্যন্ত কেবল এই বলিয়া আমাদের তিরস্কার করিতে লাগিলেনÑকেন আমরা নির্বোধের মত সে-সব তাঁহার গা হইতে তাড়াতাড়ি খুলিতে গিয়াছিলাম। না খুলিলে ত ধুলাবালি লাগিয়া এমন করিয়া মাটি হইতে পারিত না। আমরা খোট্টার দেশের লোক, আমরা চাষার সামিল, আমরা এ-সব কখনো চোখখে দেখি নাইÑএই সমস্ত অবিশ্রান্ত বকিতে বকিতে গেলেন। যে দেহটাকেও তিনি বিস্মৃত হইলেন। উপলক্ষ্য যে আসল বস্তুকেও কেমন করিয়া বহুগুণে অতিক্রম করিয়া যায়, তাহা এই-সব লোকের সংসর্গে না আসিলে, এমন করিয়া চোখে পড়ে না।
রাত্রি দুটার পর আমাদের ডিঙি আসিয়া ঘাটে ভিড়িল। আমার যে র্যাপারখানির বিকট গন্ধে কলিকাতার বাবু ইতিপূর্বে মূর্ছিত হইতেছিলেন সেইখানি গায়ে দিয়া, তাহার অবিশ্রাম নিন্দা করিতে করিতেÑপা মুছিতেও ঘৃণা হয়, তাহা পুনঃপুন শুনাইতে শুনাইতে ইন্দ্রের খানি পরিধান করিয়া তিনি সে যাত্রা আত্মরক্ষা করিয়া বাটী গেলেন। যাই হোক, তিনি যে দয়া করিয়া ব্যাঘ্রকবলিত না হইয়া সশরীরে প্রত্যাবর্তন করিয়াছিলেন, তাঁহার এই অনুগ্রহের আনন্দেই আমরা পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছিলাম। এত উপদ্রব-অত্যাচার হাসিমুখে সহ্য করিয়া আজ নৌকা চড়ার পরিসমাপ্তি করিয়া, এই দুর্জয় শীতের রাত্রে কোঁচার খুটমাত্র অবলম্বন করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে বাটী ফিরিয়া গেলাম।
আট
লিখিতে বসিয়া আমি অনেক সময়ই আশ্চর্য ভাবি, এই-সব এলোমেলো ঘটনা আমার মনের মধ্যে এমন করিয়া পরিপাটিভাবে সাজাইয়া রাখিয়াছিল কে ? যেমন করিয়া বলি, তেমন করিয়া ত তাহারা একটির পর একটি শৃঙ্খলিত হইয়া ঘটে নাই। আবার তাই কি সেই শহরের সকল গ্রন্থিগুরোই বজায় আছে ? তাও তা নাই। কত হারাইয়া গিয়াছে টের পাই, কিন্তু তবু ত শিকল ছিঁড়িয়া যায় না! কে তবে নূতন করিয়া এ-সব জোড়া দিয়া রাখে ?
আরও একটা বিস্ময়ের বস্তু আছে। পÐিতেরা বলেন, বড়দের চাপে ছোটরা গুঁড়াইয়া যায়। কিন্তু তাই যদি হয়, তবে জীবনের প্রধান ও মুখ্য ঘটনাগুলিই ত কেবল মনে থাকিবার কথা। কিনতু তা ও ত দেখি না! ছেলেবেলার কথা- প্রসঙ্গে হঠাৎ একসময় দেখিতে পাই, স্মৃতির মন্দিরে অনেক তুচ্ছ ক্ষুদ্র ঘটনাও কেমন করিয়া না জানি বেশ বড় হইয়া জাঁকিয়া বসিয়া গিয়াছে, এবং বড়রা ছোট হইয়া কবে কোথায় ঝরিয়া পড়িয়া গেছে। অতএব বলবার সময়ও ঠিক তাহা ঘটে। তুচ্ছ বড় হইয়া দেখা দেয়, বড় মনেও পড়ে না। অথচ কেন যে এমন হয়, সে কৈফিয়ত আমি পাঠককে দিতে পারিব না, শুধু যা ঘটে তাই জানাইয়া দিলাম।
এমনি একটা তুচ্ছ বিষয় যে মনের মধ্যে এতদিন নীরবে, এমন সঙ্গোপনে এতবড় হইয়া উঠিয়াছিল, আজ তাহার সন্ধান পাইয়া আমি নিজেও বড় বিস্মিত হইয়া গেছি। সেইটাই আজ াঠককে বলিব। অথচ জিনিসটি ঠিক কি, তাহার সমস্ত পরিচয়টা না দেওয়া পর্যন্ত, চেহারা কিছুতেই ঝরিয়া পড়িয়া গেছে। অতএব বলিবর সময়েও ঠিক তাহা ঘটে। তুচ্ছ বড় হইয়া দেখা দেয়, বড় মনেও পড়ে না। অথচ কেন যে এমন হয়, সে কৈফিয়ত আমি পাঠককে দিতে পারিব না, শুধু যা ঘটে তাই জানাইয়া দিলাম।
এমনি একটা তুচ্ছ বিষয় যে মনের মধ্যে এতদিন নীরবে, এমন সঙ্গোপনে এতবড় হইয়া উঠিয়াছিল, আজ তাহার সন্ধান পাইয়া আমি নিজেও বড় বিস্মিত হইয়া গেছি! সেইটাই আজ পাঠককে বলিব। অথচ জিনিসটি ঠিক কি, তাহার সমস্ত পরিচয়টা না দেওয়া পর্যন্ত, বেহারাটা কিছুতেই পরিষ্কার হইবে না। কারণ, গোড়াতেই যদি বলিÑসে একটা প্রেমের ইতিহাসÑমিথ্যাভাসণের পাপ তাহাতে হইবে না বটে, কিন্তু ব্যাপারটা নিজের চেষ্টায় যতটা বড় হইয়া উঠিয়াছে, আমার ভাষাটা হয়ত তাহাকেও ডিঙ্গাইয়া যাইবে। সুতরাং অত্যন্ত সতর্ক হইয়া বলা আবশ্যক।
সে বহুকাল পরের কথা। দিদির স্মৃতিাও ঝাপসা হইয়া গেছে। যাঁর মুখখানি মনে করিলেই, কি জানি কেন প্রথম যৌবনের উচ্ছৃঙ্খলতা আপনি মাথা হেঁট করিয়া দাঁড়াইত, সে দিদিকে আর তখন তেমন করিয়া মনে পড়িত না। এ সেই সময়ের কথা। এক রাজার ছেলের নিমন্ত্রণে তাঁহার শিকার পার্টিতে গিয়া উপস্থিত হইয়াছি। এঁর সঙ্গে অনেকদিন স্কুলে পড়িয়াছি, গোপনে অনেক আঁক কষিয়া দিয়াছিÑতাই তখন ভারি ভাব ছিল। তার রে এন্ট্রান্স ক্লাস হইতে ছাড়াছাড়ি। রাজার ছেলেদের স্মৃতি শক্তি কম, তাও জানি। কিন্তু উনি যে মনে করিয়া চিঠিপত্র লিখিতে শুরু করিবেন, ভাবি নাই। মাঝে হঠাৎ একদিন দেখা। তখন সবে সাবালক হইযাছেন। অনেক জমানো টাকা হাতে পড়িয়াছে এবং তার পরে ইত্যাদি ইত্যাদি। রাজার ছেরে কানে গিয়াছেÑঅতিরঞ্চিত হইয়াই গিয়াছেÑরাইফেল চালাইতে আমার জুড়ি নাই, এবং আরও এত প্রকারের গুনগ্রামে ইতিমধ্যে মÐিত হইয়া উঠিয়াছে যে, একমাত্র সাবালক রাজপুত্রের অন্তরঙ্গ বন্ধু হইবার আমি উপযুক্ত। তবে কিনা, আত্মীয়-বন্ধু-বান্ধবেরা আপনর লোকের সুখ্যাতিটা একটু বাড়াইয়াই করে, না হইলে সত্য সত্যই যে অতখানি বিদ্যা অমন বেশি পরিমাণে ওই বয়সটাতেও অজৃন করিতে পারিয়াছিলাম, সে অহঙ্কার করা আমার শোভা পায় না, অন্ততঃ একটু বিনয় থাকা ভাল। কিন্তু যাক সে কথা। শাস্ত্রকারেরা বলেন, রাজা-রাজড়ার সাদর আহŸান কখনো উপেক্ষা করিবে না। হিঁদুর ছেলে, শাস্ত্র অমান্য করিতেও ত আর পারি না। কাজেই গেলাম। স্টেশন হইতে দশ-বারো ক্রোশ পথ গজপৃষ্ঠে গিয়া দেখি হাঁ, রাজপুত্রের সাবালকের লক্ষণ বটে! গোপা-পাঁচেক তাঁবু পড়িয়াছে। একটা তাঁর নিজস্ব, একটা বন্ধুদের, একটা ভৃত্যদের, একটায় খাব বন্দোবস্ত। আর একটা অমনি একটু দূরেÑসেটা ভাগ করিয়া জন-দুই বাইজী ও তাঁহাদের সাঙ্গোপাঙ্গদের আড্ডা।
তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়াছে। রাজপুত্রের খাসকামরায় অনেকক্ষণ হইতেই যে সঙ্গীতের বৈঠক বসিয়াছে, তাহা প্রবেশমাত্রই টের পাইলাম। রাজপুত্র অত্যন্ত সামাদরে আমাকে গ্রহণ করিলেন। এমন কি আদরের আতিশয্যে দাঁড়াইবার আয়োজন করিয়া, তিনি তাকিয়ায় ঠেস দিয়া শুইয়া পড়িলেন। বন্ধু-বান্ধবেরা বিহŸল কালকণ্ঠে সংবর্ধনা করিতে লাগিলেন। আমি সম্পূর্ণ অপরিচিত। কিন্তু সেটা, তাঁহাদের যে অবস্থা, তাহাতে অপরিচয়ের জন্য বাধে না।
এই বাইজীটি পাটনা হইতে অনেক টাকার শর্তে দুই সপ্তাহের জন্য আসিয়াছেন। এইকানে রাজকুমার যে বিবেচনা এবং সে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়াছে, সে কথা স্বীকার করিতেই হইবে। বাইজী সুশ্রী, অতিশয় সুকণ্ঠী এবং গান গাহিতে জানে।
আমি প্রবেশ করিতেই গানটা থামিয়া গিয়াছিল। তার পর সময়োজিত বাক্যালাপ ও আদব-কায়দা সমাপন করিতে কিছুক্ষণ গেল। রাজপুত্র অনুগ্রহ করিয়া আমাকে গান ফরমাস করিতে অনুরোধ করিলেন। রাজাজ্ঞা শুনিয়া প্রথমটা অত্যন্ত কুণ্ঠিত হইয়া উঠিলাম, কিন্তু অল্প কিছুক্ষণেই বুঝিলাম, এই সঙ্গীতের মজলিসে আমিই যা হোক একটা ঝাপসা দেখি, আর সবাই ছুঁচোর মত কানা।
বাইজী প্রফুল্ল হইয়া উঠিলেন। পয়সার লোভে অনেক কাজই পারা যায় জানি। কিন্তু এই নিরেটের দরবারে বীণা-বাজানো বাস্তবিকই এতক্ষণ তাহার একটা সুকঠিন কাজ হইতেছিল। এইবার একজন সমঝদার পাইয়া সে যেন বাঁচিয়া গেল। তার পরে গভীর রাত্রি পর্যন্ত সে যেন শুধু মাত্র আমার জন্যই তাহার সমস্ত শিক্ষা, সমস্ত সৌন্দর্য ও কণ্ঠের মাধুর্য দিয়া আমার চারিদিকের এই সমস্ত কদর্য মদোন্মাত্ততা ডুবাইয়া অবশেষে স্তব্ধ হইয়া আসিল।
বাইজী পাটনার লোকÑনাম পিয়ারী। সে রাত্রে আমাকে সে যেমন করিয়া সমস্ত প্রাণ দিয়া গান শুনাইয়াছিল, বোধ করি এমন আর সে কখনও শুনায় নাই। মুগ্ধ হইয়া গিয়াছিলাম। গান থামিলে আমার মুখ দিয়া শুধু বাহির হইলÑবেশ।
পিয়ারী মুখ নীচু করিয়া হাসিল। তারপর দুই হাত কপালে ঠেকাইয়া প্রণাম করিলÑসেলাম করিল ন। মজলিস রাত্রির মত শেষ হইয়াছিল।তখণ দলের মধ্যে কেহ সুপ্ত, কেহ তন্দ্রাভিভূতÑঅধিকাংশই অচৈতন্য। নিজের তাঁবুতে যাইবার জন্য বইজী যখন দলবল লইয়া বাহির হইতেছিল, আমি তখন আনন্দের আতিশয্যে হিন্দী করিয়া বলিয়া ফেলিলাম, বাইজী, আমর বড় সৌভাগ্য যে, তোমার গান দু-সপ্তাহ ধ’রে প্রত্যহ শুনতে পাব।
বাইজী প্রথমটা থমকিয়া দাঁড়াইল। পরক্ষণেই একটুখানি কাছে সরিয়া আসিয়া অত্যন্ত মৃদুকণ্ঠে পরিষ্কার বাঙ্গালা করিয়া কহিল, টাকা নিয়েছি, আমাকে ত গাইতেই হবে, কিন্তু আপনি এই পনর-ষোল দিন ধ’রে এঁর মোসাহেবি করবেন ? যান, কালকেই বাড়ি চ’লে যান।
কথা শুনিয়া আমি হতবুদ্ধি, কাঠ হইয়া গেলাম এবং কি জবাব দিব, তাহা ভাবিয়া ঠিক করিবার পূর্বেই বাইজী বাহির হইয়া গেল। সকলে সোরগোল করিযা কুমারজী শিকারে বহির হইলেন। মদ্য-মাংসের আয়োজনটাই সবচেয়ে বেশি। সঙেগ্ জন দশেক শিকারিী অনুচার। বন্দুক পনরটা, তার মধ্যে ছয়টা রাইফেল। স্থান-একটা আধশুকনো নদীর উভয় তীরে। এপারে গ্রাম, ওপারে বালুর চর। এপারে ক্রোশ ব্যাপিয়া বড় বড় শিমুলগাছ, ওপারে বালুর উপরে স্থানে স্থানে কাশ ও কুশের ঝোপ। এইখান এই পনরটা বন্দুক লইয়া শিকার করিতে হইবে। শিমুল গাছে-গাছে ঘুঘু গোটাকয়েক দেখিলাম, মরা নদীর বাঁকের কাছটায় দুটো চকাচকি ভাসিতেছে বলিয়াই মনে হইল।
কে কোন দিকে যাইবেন, অত্যন্ত উৎসাহের সহিত পরামর্শ করিতে করিতেই সবাই দু-এক পাত্র টানিয়া লইয়া দেহ ও মন বীরের মত করিয়া লইলেন। আমি বন্দুক রাখিয়া দিলাম। একে বাইজীর খোঁচা খাইয়া রাত্রি হইতেই মনটা বিকল হইয়াছিল, তাহাতে শিকারের ক্ষেত্র দেখিয়া সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া গেল।
কুমার প্রশ্ন করিলেন, কি হে শ্রীকান্ত, তুমি যে বড় চুপচাপ ? ওকি, বন্দুক রেখে দিলে যে।
আম পাখি মারি না।
সে কি হে ? কেন, কেন ?
আমি গোঁফ ওটবার পর থেকে আর ছররা দেওয়া বন্দুক ছুঁড়িনিÑও আমি ভুলে গেছি।
কুমারসাহেব হাসিয়াই খুন। কিন্তু সে হাসির কতটা দ্রব্যগুণে, সেকথা অবশ্য আলাদা।
সূরযুর চোখ-মুখ আরক্ত হইয়া উঠিল। তিনিই এ দলের প্রধান শিকারী এবং রাজপুত্রের প্রিয় পার্শ্বচর। তাঁহার অব্যর্থ লক্ষ্যের খ্যাতি আমি আসিয়াই শুনিয়াছিলাম। রুষ্ট হইয়া কহিলেন, চিড়িয়া শিকারমে কুছ সরম হ্যায়! যাক আমি তাঁবুতে ফিরিলামÑকুমারসাহেব, আমার শরীরটা ভাল নেই,Ñবলিয়া ফিরিলাম। ইহাতে কে হাসিল, কে চোখ ঘুরাইল, কে মুখ ভ্যাঙাইল, তাহা চাহিয়াও দেখিলাম না।তখন সবেমাত্র তাঁবুতে ফিরিয়া ফরাসের উপর চিৎ হইয়া পড়িয়াছি এবং আর এক পেয়ালা চা আদেশ করিয়া একটা সিগারেট ধরাইয়াছি, বেয়ারা আসিয়া সম্ভ্রমে জানাইল, বাইজী একবার সাক্ষাৎ করিতে চায়। ঠিক এইটি আশাও করিতেছিলাম, আশঙ্কাও করিতেছিলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম, কেন সাক্ষাৎ করিতে চায় ?
তা’ জানিনে।
তুমি কে ?
আমি বাইজীর খানসামা।
তুমি বাঙ্গালী ?
আজ্ঞে হাঁÑপারমাণিক। নাম রতন।
বাইজী হিন্দু ?
রতন হাসিয়া বলিল, নইলে থাকব কেন বাবু ?
আমাকে সঙ্গে করিয়া আসিয়া তাঁবুর দরজা দেখাইয়া দিয়া রতন সরিয়া গেল। পর্দা তুলিয়া ভিতরে ঢুকিয়া দেখিলাম, বাইজী একাকিনী প্রতীক্ষা করিয়া বসিয়া আছে। কাল রাত্রে পেশোয়াজ ওড়ানায় ঠিক চিনিতে পারি নাই, আজ দেখিয়াই টের পাইলাম, বাইজীযেই হোক, বাঙ্গালীর মেয়ে বটে। একখÐ মূল্যবান কার্পেটের উপর গরদের শাড়ি পরিয়া বাইজী বসিয়া আছে। ভিজা এলোচুল পিঠের উপর ছড়ানো, হাতের কাছে পানের সাজ-সরঞ্জাম, সমুকে গুড়াগুড়িতে তামাক সাজা। আমাকে দেখিয়া গাত্রোত্থান করিয়া হাসিমুখে আসনটা দেখাইয়া দিয়া কহিল, বোসো। তোমার সমুখে তাকামটা খাবো না আরÑওরে রতন, গুড়গুড়িটা নিয়ে যা। ও কি দাঁড়িয়ে রইলে কেন, বোসো না ?
রতন হাসিয়া গুড়গুড়ি লইয়া গেল। বাইজী কহিলÑতুমি তামাক খাও জানি; কিন্তু দেব কিসে অন্য জাযগায় যা কর, তা কর। কিন্তু আমি জেনেশুনে আমার গুড়গড়িটা ত আর তোমাকে দিতে পারিনে! আচ্ছা, চরুট আনিয়ে দিচ্ছিÑওরে ওÑ
থাক থাক, চুরুটে কাজ নেই পকেটেই আছে।
আছে ? বেশ তা হ’লে ঠাÐা হয়ে একটু বোসো; ঢের কথা আছে। ভগবান কখন যে কার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেন, তা কেউ বলতে পারে না। স্বপ্নের অগোচর। শিকারে গিয়েছিলে, হঠাৎ ফিরে এলে যে ?
ভালো লাগলো না।
না লাগবারই কথা। কি নিষ্ঠুর এই পুরুষমানুষ জাতটা। অনর্থক জীবহত্যা ক’রে কি আমোদ পায়, তা তারাই জানে বাবা ভাল আছেন ?
বাবা মারা গেছেন।
মারা গেছেন! মা ?
তিনি আগেই গেছেন।
ও’Ñতাইতেই, বলিয়া বাইজী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া আমার মুখপানে চাহিয়া রহিল। একবার মনে হইল তাহার চোখ দুটি যেন ছলছল করিয়া উঠিল। কিন্তু সে হয়ত আমার মনের ভুল। পরক্ষণেই যখন সে কথা কহিল, তখন আর ভুল করিল না যে, এই মুখরা নারীর চটুল ও পরিহাস-লঘু কণ্ঠস্বর সত্য সত্যই মৃদু ও আর্দ্র হইয়া গিয়াছে। কহিল, তা হ’লে যতœটতœ করবার আর কেউ নেই বল। পিসিমার ওখানেই আছ ত ? নএল আর থকবেই বা কোথায় ? বিয়ে হয়নি সে ত দেখতেই পাচ্ছি। পড়াশুন করচ ? না, তাও ঐ সঙ্গে শেষ করে দিয়েচ ?
এতকষণ পর্যন্ত ইহার কৌতূহল এবং প্রশ্নমালা আমি যথাসাধ্য সহ্য করিয়া গিয়াছি। কিন্তু এই শেষ কথাটা কেমন যেন হঠাৎ অসহ্য হইয়া উঠিল। বিরক্ত এবং রক্ষকণ্ঠে বলিয়া উঠিলাম, আচ্ছা, কে তুমি ? তোমাকে জীবনে কখনো দেখেচি ব’লেও ত মনে হয় না। আমার সম্বন্ধে এতকথা তুমি জানতে চাইছই বা কেন ? আর জেনেই বা তোমার লাভ কি ?
বাইজী রাগ করিল না, হাসিল; কহিল, লাভ-ক্ষতিই কি সংসারে সব ? মায়া, মমতা, ভালোবাসাটা কি কিছু নয় ? আমার নাম পিয়ারী, কিন্তু, আমার মুখ দেখেও যখন চিনতে পারলে না, তখন ছেলেবেলার ডাকনাম শুনেই কি আমাকে চিনতে পারবে ? তা ছাড়া আমি তোমাদেরÑও গ্রামের মেয়েও নই।
আচ্ছা, তোমাদের বাড়ি কোথায় বল ?
না, সে আমি বলব না।
তবে তোমার বাবার নাম কি বল ?
বাইজী জিভ কাটিয়া কহিল, তিনি স্বর্গে গেছেন। ছি-ছি, তাঁর নাম কি আর এমুখে উচ্চরণ করতে পারি ?
আমি অধীর হইয়া উঠিলাম। বলিলাম, তা যদি না পারো, আমাকে চিনলে কি, ক’রে সে কথা বোধ হয় উচ্চারণ করতে দোষ হবে না ?
পিয়ারী আমার মনের ভাব লক্ষ্য করিয়া আবার মুখ টিপিয়া হাসিল। কহিল, না, তাতে দোষ নাই। কিন্তু সে কি তুমি বিশ্বাস করতে পারবে ?
বলেই দেখ না।
পিয়ারী কহিল, তোমাকে চিনেছিলাম ঠাকুর, দুবুর্দ্ধির তাড়ায়Ñআর কিসে ? তুমি যত চোখের জল আমার ফেলেছিলে, ভাগ্যি সূয্যিদেব তা শুকিয়ে নিয়েচেন, নইলে চোখের জলের একটা পুকুর হয়ে থাকত। লি বিশ্বাস করতে পারো কি ?
সত্য বিশ্বাস করিতে পারিলাম না। কিন্তু সে আমারই ভুল। তখন কিছুতেই মনে পড়িল না যে, পিয়ারীর ঠোঁটের গঠনই এইরূপÑযেন সবকথাই সে তামাশা করিয়া বলিতেছে, এবং মে মনে হাসিতেছে। আমি চুপ করিয়া রহিলাম। সেও কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া এবার সত্যসত্যই হাসিয়া উঠিল। কিন্তু এতক্ষে কেমন করিয়া জানি না, আমার সহসা মনে হইল সে নিজের লজ্জিত অবস্থা যেন সামলাইয়া ফেলিল। সহাস্যে কহিল, না ঠাকুর, তোমাকে যত বোকা ভেবেছিলাম, তুমি তা নও। এ যে আমার একটা বলার ভঙ্গি, তা তুমি ঠিক ধরেচ। কিন্তু তাও বলি, তোমার চেয়ে অনেক বুদ্ধিমানও আমার এই কথাটায় অবিশ্বাস করতে পারে নি। তা এতই যদি বুদ্ধিমান, মোসাহেবী ব্যবসাটা ধরা হ’ল কেন ? এই চাকরিটা তোমাদের মত মাুষ দিয়ে হয় না। যাও, চটপট স’রে পড়
ক্রোধে সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া গেল; কিন্তু প্রকাশ পাইতে দিলাম ন। সহজভাবে বলিলাম, চাকরি যতদিন হয়, ততদিনই ভাল। বসে না থাকি বেগার খানিÑজান ত ? আচ্ছা, এখন উঠি। বাইরের লোক হয়ত বা কিছু মনে করে বসবে
পিয়ারী কহিল, করলে সে ত তোমার সৌভাগ্য ঠাকুর! এ কি একটা আপসোসের কথা ?
উত্তর না দিয়া যখন আমি দ্বারের কাছে আসিয়া পড়িয়াছি তখন সে অকস্মাৎ হাসির লহর তুলিয়া বলিয়া উঠিল, কিন্তু দেখ ভাই, আমার সেই চোখের জলের গল্পটা যেন ভুলে যেয়ো না। বন্ধু-মহলে, কুমারসাহেবের দরবারে প্রকাশ করলেÑচাই কি তোমার নসিবটাই হয়ত ফিরে যেতে পারে।
আমি নিরুত্তরে বাহির হইয়া পড়িলাম। কিন্তু এই নির্লজ্জার হাসি এবং কদর্য পরিহাস আমার সর্বাঙ্গ ব্যাপিয়া যেন বিছার কামড়ের মত জ্বলিতে লাগিল।
স্বস্থানে আসিয়া এক পেয়ালা চা খাইয়া চুরুট ধরাইয়া মাথা যথাসম্ভব ঠান্ডা করিয়া ভাবিতে লাগিলামÑকে এ ? আমার পাঁচবছর বয়সের ঘটনা পর্যন্ত, আমি স্পষ্ট মনে করিতে পারি। কিন্তু অতীতের মধ্যে যতদূর দৃষ্টি যায়, ততদূর পর্যন্ত তন্ন তন্ন করিয়া দেখিলাম, কোথাও এই পিয়ারীকে খুঁজিয়া পাইলাম না। অথচ এআমাকে বেশ চিনে। পিসিমার কথা পর্যন্ত জানে। আমি যে দরিদ্র, ইহাও তাহার অবিদিত নহে। সুতরাং আর কোন অভিসন্ধি থাকিতেই পারে না। অথচ যেমন করিয়া পারে, আমাকে সে এখান হইতে তাড়াইতে চায। কিন্তু কিসের জন্য ? আমার থাকা-না থাকায় ইহার কি ? তখন কথায় কথায় বলিয়াছিল, সংসারে লাভ ক্ষতিই কি সমস্ত ? ভালবাসা-টাসা কিছু নাই ? আমি যাহাকে কখনো চোখেও দেখি নাই, তাহার মুখের এই কথাা মনে করিয়া আমার হাসি পাইল। কিন্তু সমস্ত কথাবার্তা ছাপাইয়া তাহার শেষ বিদ্রƒপটাও আমাকে যেন অবিশ্রান্ত মর্মান্তিক করিয়া বিঁধিতে লাগিল।
সন্ধ্যার সময় শিকারীর দল ফিরিয়া আসিল। চাকরের মুখে শুনিলাম আটটা ঘুঘুপাখি মারিয়া মারিয়া আনা হইয়াছে। কুমার ডাকিয়া পাঠাইলেন, অসুস্থতার ছুতা করিয়া বিছানায় পড়িয়াই রহিলাম; এবং এইভাবেই অনেক রাত্রি পর্যন্ত পিয়ারীর গান এবং মাতালের বাহবা শুনিতে পাইলাম।

