এমপি হবার আগেই চুরির রাস্তা করে নিলেন নেত্রকোণা সদর-বারহাট্টার এনসিপি প্রার্থী ফাহিম
(নেত্রকোণা প্রতিনিধি)
হলফনামায় অসত্য তথ্য দেওয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। সম্পদ, আয়, মামলা কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতা–এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন বা বিকৃত করে নির্বাচনে প্রার্থীদের অংশ নেওয়ার নজির রয়েছে বহু নির্বাচনে। কিন্তু এতদিন এ ধরনের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তির স্পষ্ট বিধান না থাকায় অনেক প্রার্থীই পার পেয়ে গেছেন। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিয়েও কোনো প্রার্থী বৈধতা পেলে অভিযোগ দিতে বলেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তারই ধারবাহিকতায় দৈনিক হাল বাংলার অনুসন্ধানী সাংবাদিকগণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রার্থীদের হলফনামার সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করছেন।
নেত্রকোণা সদর-বারহাট্টা আসনের সকল প্রার্থীদের মতো ১০ দলীয় জোট ও এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ফাহিম রহমান খান পাঠান এর হলফনামায় দেখা যায় সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু ও পাথরে তৈরি গহনার বিবরণীতে তিনি লিখেন ‘৪০ ভরি স্বর্ণ (উপহার বাবদ প্রাপ্ত) যার অনুমান মূল্য ২,৮০,০০০/- টাকা। খোঁজ নিয়ে জানা যায় ফাহিম পাঠানের উপহার বাবদ এক ভরি স্বর্ণও নেই। সাধারণত বাংলাদেশে বিয়ের সময় উপহার বাবদ স্বর্ণ বা আনুসঙ্গিক জিনিসপত্র পেয়ে থাকেন। তিনি এখনও অবিবাহিত। যেখান থেকে সাংবাদিকগণের খটকা তৈরি হয় তা হলো হলফনামায় তার জন্মসাল হলো ৯০ পরবর্তী। ৯০ পরবর্তী বা বিগত ১০ বছরের মধ্যেও যদি তিনি ৪০ ভরি স্বর্ণ উপহার হিসেবে পেয়ে থাকেন তার মূল্য নিশ্চয়ই ২,৮০,০০০/- টাকা হয় না। গড় মূল্য ২০ হাজার টাকা ভরি ধরলেও এর মূল্য দাড়ায় ৮ লক্ষ টাকা। কিন্তু তিনি হলফনামায় দিয়েছেন ২,৮০,০০০/- টাকা। সরেজমিনে তার বাসা ও অন্যান্য তথ্য মতে উপহার বাবদ তার কাছে ১ ভরি স্বর্ণও নেই। তাহলে কেন তিনি লিখলেন ৪০ ভরি স্বর্ণ?
অন্যদিকে ব্যবসায়িক হিসেবে তার বার্ষিক আয় দিয়েছেন ৫ লক্ষ টাকা। অথচ সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় তার কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নাই।
১২ নং ব্যবসায়িক মূলধনের জায়গায় তিনি লিখেছেন ২০,০০,০০০/- (বিশ লক্ষ) টাকা। যেহেতু কাগজে কলমেও তার কোনো ব্যবসা নাই সেক্ষেত্রে ব্যবসায়িক মূলধন থাকার প্রশ্নই আসে না।
এ বিষয়ে ফাহিম পাঠানের প্রতিবেশী আকবর আলী বলেন, ‘আমাদের জানামতে তার কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই।’ গত ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর, বিভিন্ন অফিসে সে এবং তার ভাই ছাত্র আন্দোলনের নাম দিয়ে হয়তো সংসার চালানোর কিছু টাকা কামিয়েছেন, তবে তার ও তার পরিবারের কোনো ব্যবসা নাই।
অথচ তিনি হলফনামায় অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ দিয়েছেন ১,১৪,০৪,৬৪০/- (এক কোটি চৌদ্দ লক্ষ চার হাজার ছয়শত ৪০ টাকা। তার অস্থাবর সম্পদের হিসাবে তিনি প্রায় ১ কোটি ১২ লক্ষ টাকা বেশি লিখেছেন!
এ বিষয়ে ফাহিম পাঠানকে ফোন করলে আমাদের সাংবাদিকদের ফোনটি তিনি ধরেন নি।
তিনি কেন হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন?
বিশ্লেষকেরা মনে করেন. ‘তার কারণ হিসেবে এই প্রার্থী মাত্রাতিরিক্ত চালাক প্রকৃতির, কোনো কারণে যদি তিনি নির্বাচিত হয়ে সংসদে যান তাহলে পরবর্তীতে অবৈধ আয়কে বৈধ দেখানোর জন্যই হয়তো এই মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন ভোটারদের।

প্রার্থীদের মিথ্যাচারের পরবর্তী প্রভাব
হলফনামায় মিথ্যা তথ্য শুধু নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাই ক্ষুণ্ন করে না, ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকেও প্রভাবিত করে। একজন প্রার্থীর সম্পদ, মামলা বা আয়সংক্রান্ত তথ্য ভোটারের জানার অধিকার। এসব তথ্য গোপন হলে ভোটার প্রকৃত যোগ্যতা যাচাইয়ের সুযোগ হারান। দীর্ঘ মেয়াদে এতে জনপ্রতিনিধিত্বের প্রতি আস্থা কমে এবং নির্বাচনি ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম এ বিষয়ে বলেন, ‘হলফনামায় প্রার্থীদের মিথ্যাচার রোধে আরপিওতে এ ধরনের সংশোধনী অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রয়োগের ওপর। কারণ শুধু আইন থাকলেই হবে না, রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে না পারলে হলফনামায় তথ্য গোপনের সংস্কৃতি বদলাবে না।’ তার মতে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সংসদে নৈতিক সংকট তৈরি করেন, যা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ক্ষতিকর।
ইসির আইনি বেড়াজাল ও পরিকল্পনা
হলফনামায় তথ্য গোপনের সংস্কৃতি রোধে এবার নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন আরপিও সংশোধনের মাধ্যমে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, হলফনামায় কোনো প্রার্থীর দেওয়া তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হলে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময়ই তা বাতিল করা যাবে। এমনকি এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যে তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট এমপির পদ বাতিল করার ক্ষমতা পেয়েছে ইসি।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সব রিটার্নিং কর্মকর্তার জন্য বিস্তারিত নির্দেশ দিয়ে পরিপত্র জারি করে কমিশন। প্রার্থীদের জন্মতারিখ, বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আয়-ব্যয়, সম্পদ ও দায়, ঋণ, ফৌজদারি মামলার তথ্যসহ ১০টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলফনামায় বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করার কথা বলা হয়েছে। এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রচার ও নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশের নির্দেশও দেওয়া হয়। এ ছাড়া সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ‘কাউন্টার এফিডেভিট’ দাখিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি প্রার্থীর হলফনামার তথ্য অসত্য প্রমাণে দালিলিক কাগজপত্র উপস্থাপন করতে পারেন, তাহলে তা বাছাইয়ের সময় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
প্রার্থীদের তথ্য গোপন রোধে ইসির পরিকল্পনা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘এই বিধান প্রার্থীদের জন্য একটি বার্তা, এবার আর মিথ্যা বলে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।’ অরেক ইসি মো. আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ সম্প্রতি জানিয়েছেন, ‘হলফনামায় যদি কেউ মিথ্যা তথ্য দেয়, তাহলে সেটা তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আরপিওতে আরও সুনির্দিষ্টভাবে বিধান যুক্ত করা হয়েছে। প্রয়োজনে প্রার্থিতা বাতিল হবে, এমনকি নির্বাচিত এমপি হলেও তার পদ চলে যেতে পারে।’
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন হলফনামার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির একটি পরীক্ষা। মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে ইসির কঠোর অবস্থান যদি বাস্তবে কার্যকর হয়, তাহলে তা বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
তাহলে ‘হাল বাংলা’র অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের প্রশ্ন মিথ্যা তথ্য দেয়ার কারণে কেন সদর-বারহাট্টা আসনের এনসিপির প্রার্থী ফাহিম রহমান খান পাঠানের মনোনয়ন বাতিল হবে না!

